অনেক হজযাত্রীর সৌদি যাওয়া অনিশ্চিত

Print

হজযাত্রীদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। দেশে এজেন্সিগুলোর প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক হজযাত্রী এ বছর হজে যেতে পারছেন না। আবার হজে যাওয়ার পরও সৌদিতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়ছেন। এ দিকে এখনো অনেক হজযাত্রীর বিমানের টিকিট কাটা বাকি রয়েছে, যাদের হজে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
হজ অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজে যাচ্ছেন। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত ১ লাখ ৬ হাজার হজযাত্রী সৌদি আরব পৌঁছেছেন। ফলে এখনো ২১ হাজার হজযাত্রী সৌদি আরব যাওয়া বাকি রয়েছে। আগামীকাল ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমানের এবং ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সৌদি এয়ারলাইন্সের ফাইট রয়েছে। এ দু-তিন দিন বাকি হজযাত্রী পরিবহন করতে হিমশিম খাচ্ছে দু’টি এয়ারলাইন্স।

এ দিকে ভিসা হওয়ার পরও এখনো অনেক হজযাত্রীর টিকিট কাটেনি হজ এজেন্সিগুলো। হজ অফিসে গত ২২ আগস্ট পর্যন্ত এক হিসাবে জানা যায়, প্রায় ১২ হাজার হজযাত্রীর বিমান টিকিট কাটেনি এজেন্সিগুলো। এর মধ্যে ৫৭টি এজেন্সির ১০ হাজার ১১ জন হজযাত্রীর মধ্যে মাত্র এক হাজার ২০৭ জনের টিকিট কাটে। আর ১৭টি এজেন্সির তিন হাজার হজযাত্রীর জন্য কোনো টিকিটই কাটেনি।
এ কারণে গত বুধবার এসব এজেন্সিকে হজ অফিসে তলব করা হয়। তবে অনেক হজ এজেন্সিই হজ অফিসের ডাকে সাড়া দেয়নি। এ কারণে গতকাল বৃহস্পতিবারও হজ অফিস এসব এজেন্সিকে কড়া বার্তা পাঠায়।
এতে এজেন্সিগুলোকে ভিসাপ্রাপ্ত সব হজযাত্রীকে টিকিট নিশ্চিত করে জরুরি ভিত্তিতে সৌদি আরব পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে হজ অফিস।
এ দিকে ভিসা হওয়ার পরও টিকিট না কাটায় দিনের পর দিন ঘুরেও হজে যেতে না পারায় কান্নার রোল পড়েছে হজ ক্যাম্পে। চুক্তি অনুযায়ী সব টাকা পরিশোধের পরও তাদের ঘুরতে হচ্ছে এজেন্সি ও দালালদের দ্বারে দ্বারে। জমি বিক্রি করে জীবনের শেষ ইচ্ছা স্ত্রীকে নিয়ে পবিত্র হজ করতে চেয়েছিলেন পাবনার আব্দুস সালাম। শেষ মুহূর্তে এজেন্সি অতিরিক্ত টাকা দাবি করছে। কিন্তু তা পরিশোধ করতে না পারায় তাকে টিকিট দেয়া হয়নি। মিস ফালাহ ট্র্যাভেলস থেকে নিবন্ধন করা এ হজযাত্রী কান্নাজড়িতকণ্ঠে বলেন, এজেন্সির দালাল আবু হানিফকে বারবার ফোন দিলেও রিসিভ করছে না।
সাতক্ষীরার বয়োবৃদ্ধ হায়দার আলী বলেন, ২০১৫ সালে টাকা পরিশোধ করে দুই বছর পর ভিসা পান। টিকিটের অপেক্ষায় এক সপ্তাহ ধরে হজ ক্যাম্পে রয়েছেন। কিন্তু তার হাতে এখনো বিমানের টিকিট দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, এজেন্সি আরো ৫০ হাজার টাকা দাবি করছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এত টাকা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না জানালে এজেন্সি তাকে টিকিট দিচ্ছে না। এভাবে অনেক হজযাত্রীরই টিকিট না পাওয়ায় হজে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হজ অফিসে বারবার যোগাযোগ করেও তাদের কোনো সুরাহা হচ্ছে না। কিছু এজেন্সির অনিয়মের কথা স্বীকার করে হজ পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ভিসাপ্রাপ্ত সবাইকে হজে পাঠাতে যাতে কোনো গড়িমসি না হয় সে জন্য বারবার তাগাদা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকে টিকিট কেটেছেন। অনেকে কিছু হজযাত্রী সৌদি আরবেও পাঠিয়েছেন বলে হজ পরিচালক জানান।
বেসরকারি হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হাবের মহাসচিব শাহদাত হোসাইন তসলিম নয়া দিগন্তকে বলেন, দালাল এবং ব্যাংকের নানা হয়রানির কারণে সঠিক সময় টিকিট পাচ্ছে না হজযাত্রীরা। তবে গত দুই দিনে অনেক এজেন্সিই টিকিট করে হজযাত্রীদের সৌদি আরবে পাঠিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সৌদিতে ভোগান্তির শিকার বাংলাদেশী হজযাত্রীরা : দেশে ফাইট বাতিলে বিড়ম্বনার শিকার হয়ে সৌদি আরবে গিয়েও হজ এজেন্সিগুলোর অব্যবস্থাপনা ও নানা ধরনের দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশী হজযাত্রীরা। খাবার, দেরিতে বাড়িভাড়া করা, চুক্তিহীন বাড়িতে গাদাগাদি করে হজযাত্রীদের রাখা, দেরিতে মোয়াল্লেম নেয়া, হজযাত্রীদের খোঁজখবর না নেয়া, লাগেজ সরবরাহসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশী এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে।
ফেনীর হজযাত্রী নূর নবী বলেন, এজেন্সি আমাদের হারাম শরিফের কাছে রুম দেয়ার কথা বললেও দিয়েছে দুই কিলোমিটার দূরে। এ ছাড়া এক রুমে তিনজন করে থাকার ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও আছি ছয়জন করে। ভালো খাবারের কথা থাকলেও খাবার দেয়া হয়।
বেসরকারি হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সাথে জড়িত রয়েছে ৬৩৫টি এজেন্সি। তাদের অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে সৌদি হজ কর্তৃপ। সৌদি হজসংক্রান্ত শূরা কমিটির সদস্য ওমর সিরাজ আকবর বলেন, বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ১৫টি বেসরকারি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশন ও সৌদি হজ কর্তৃপ। সতর্ক করা হয়েছে আরো ২০টি বেসরকারি হজ এজেন্সিকে। তবে ওই এজেন্সিগুলোর নাম এবং কোন এজেন্সির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানা যায়নি। পবিত্র হজ শেষে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করবে বলে জানিয়েছে সৌদি হজ কর্তৃপ।
জেদ্দা বিমানবন্দরে ৭ ঘণ্টা অপো : নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সৌদি যাওয়ার পরও জেদ্দা বিমানবন্দরে হজযাত্রীদের সাত ঘণ্টা অপো করতে হচ্ছে। ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পাঁচ ঘণ্টা ও মক্কার উদ্দেশে বাসে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট প্লাজাতে এক থেকে দুই ঘণ্টা অপো করতে হচ্ছে। জেদ্দায় নিয়োগপ্রাপ্ত মওসুমি হজ অফিসার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেইন গত বুধবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ থেকে আগত হজযাত্রীদের জেদ্দা হজ টার্মিনালের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। চিঠিতে তিনি জানান, জেদ্দা কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হজ টার্মিনালে এখন হজযাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। সারা পৃথিবী থেকে হজযাত্রী নিয়ে একের পর এক ফাইট অবতরণ করছে। নির্দিষ্টসংখ্যক ইমিগ্রেশন পয়েন্ট দিয়ে অসংখ্য হজযাত্রীর ইমিগ্রেশন করতে হচ্ছে। ফলে হজযাত্রীদের ফাইট থেকে অবতরণ করার পর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শুরু করতে গড়ে পাঁচ ঘণ্টা অপো করতে হচ্ছে। ইমিগ্রেশন লাইনে অপো করতে হচ্ছে আরো এক ঘণ্টা। তিনি আরো জানান, ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার পর মক্কার উদ্দেশে বাসে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট প্লাজায় আরো এক-দুই ঘণ্টা অপো করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে জেদ্দা এয়ারপোর্টে প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা হজযাত্রীদের অপো করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় হজযাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপোর প্রয়োজনীয় মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।
মওসুমি হজ অফিসার বলেন, জেদ্দা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার আগে টাকা থাকলেও কিছু কিনে খাওয়ার সুযোগ নেই। তাই হজযাত্রীরা আসার সময় শুকনো খাবার যেমন বিস্কুট, চিঁড়া ও মুড়ি সাথে নিয়ে আসতে পারেন। হ্যান্ডব্যাগে প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখারও পরামর্শও দেন তিনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 178 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ