অপরাধ জগতের ‘সম্রাট’ শাহজাহান

Print
ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি কলোনি এখন ‘শাহজাহান কলোনি’, মাদক ‘রাজ্যে’র নাটাইও তার হাতে
আতাউর রহমান
রাজধানীর কদমতলী-শ্যামপুর এলাকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বিল্লাল হোসেন ওরফে ডাকাত বিল্লালের কথা নিশ্চয় সবার মনে আছে। এই বিল্লাল কার আশ্রয়ে বেড়ে উঠেছে কিংবা তার অনুপস্থিতে ওই এলাকার মাদক সাম্রাজ্য নেপথ্যে কে নিয়ন্ত্রণ করে তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে হতবাক হতে হয়েছে। পলাতক বিল্লালের অনুপস্থিতিতে তার মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন একজন জনপ্রতিনিধি। তার নাম আলী হোসেন শাহজাহান। বয়স ৫০ বছর। শ্যামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তিনি মেম্বার। এলাকাটি সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মূলত ওই ইউনিয়ন পরিষদের এখন আর কোনো কার্যক্রম নেই। এ অবস্থায় জনপ্রতিনিধি আলী হোসেন শাহজাহান শ্যামপুর-কদমতলী এলাকার সিংহভাগজুড়ে তার ‘অপরাধের রাজ্য’ খুলে বসেছেন।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরেজমিন শ্যামপুর-কদমতলী এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলী হোসেন শাহজাহান ‘ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি কলোনি’ এবং সেখানকার রেললাইনের দু’পাশের জায়গা দখল করে নিজের নামেই গড়ে তুলেছেন একটি কলোনি। ওই কলোনিতে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন এবং পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজেই হয়ে উঠেছেন অঘোষিত ডেসকো ও ওয়াসার ‘বড় কর্মকর্তা’। বিদ্যুৎ ও ওয়াসার ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই এলাকায় বার বার অভিযানে গিয়ে শাহজাহানের দাপটের কাছে হার মেনেছেন। নিজের কলোনি এবং আশপাশের এলাকায় মাদক বাণিজ্যের নাটাইও তার হাতে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ধূর্ত প্রকৃতির শাহজাহান বরাবরই থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে বা তার ‘অপরাধ রাজ্যে’ পুলিশ অভিযান চালালে সব দোষ গিয়ে পড়ে তার কলোনির ভাড়াটিয়ার ওপর। এরপর দোষ চাপানো ভাড়াটিয়াকে মারধর করে এলাকা ছাড়া করেন। আবার প্রতিপক্ষকে ‘শায়েস্তা’ করতে কিংবা নিজের মাদক সাম্রাজ্যে পুলিশের অভিযান ঠেকাতে কৌশলে সাধারণ কাউকে মাদক দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে ‘নিরপরাধ সাজেন’ পুলিশের কাছে।

শ্যামপুর-কদমতলী এলাকার পুরনো কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাহজাহান এক সময় বুড়িগঙ্গায় লঞ্চে ও নৌযানে নিজের গ্রুপ নিয়ে ডাকাতি করতেন। এখন তিনি ‘ডাঙায়’ ওঠে দখল আর মাদক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এক সময় ছিলেন জাসদ গণবাহিনীর সক্রিয় কর্মী। এখন কোনো দলে বা পদে না থাকলেও পরিচয় দেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা হিসেবে। ওই পরিচয়ে নিরাপদে থেকে যাচ্ছেন শাহজাহান। জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের শ্যামপুর-কদমতীল একজন শীর্ষ নেতার ‘আশীর্বাদ’ রয়েছে তার ওপর। যার জন্য প্রায় এক যুগ ধরে নানা অপরাধে জড়িয়েও কোনো মামলার আসামি হতে হয়নি তাকে। যদিও এর আগে অনেক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আলী হোসেন শাহজাহানের সঙ্গে কথা বলতে তার ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরির কলোনির বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তিনি মোবাইল ফোনে বলেছেন, তিনি রাজনীতি করেন। নানা মানুষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেই পারে। রাজনীতি করতে গিয়ে অনেকেই তার শত্রু হয়েছেন। পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বিল্লালের হয়ে ওই এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে শাহজাহান বলেন, তার কলোনিতে বিল্লালের কিছু লোক থাকে। তিনি বিল্লালকে কোনো দিন দেখেননি। বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ ডাকাতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, মানুষ তো কত কিছুই বলবে। তিনি গণবাহিনীর সদস্য ছিলেন না বলে দাবি করেন।

ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি কলোনি এখন ‘শাহজাহান কলোনি’:পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে দক্ষিণে শ্যামপুর-ফতুল্লা সড়ক ধরে এগোতে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে বিশাল এলাকাজুড়ে ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি এলাকা। আর প্রায় ১৭ বিঘা এলাকাজুড়ে রয়েছে ওই ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের জন্য কলোনি। যা এক সময় ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি কলোনি বলে পরিচিত ছিল। তবে এখন সেই কলোনির অঘোষিত নাম ‘শাহজাহানের কলোনি’। কীভাবে কলোনির নাম পাল্টে গেল সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, এক যুগ আগে ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যায়। এর পরই ধীরে ধীরে দখল হতে থাকে সেখানের বিশাল জায়গা। ওই ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের থাকার জায়গায় নজর পড়ে শাহজাহানের। গত কয়েক বছরে ওই কলোনির গরিব শ্রমিকদের বের করে দিয়ে পুরো এলাকাই নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। পুরনো ঘরের দখল ছাড়াও কলোনির খালি জায়গাতেও নতুন করে ঘর তোলেন। তবে কলোনি ও আশপাশের এলাকায় এখনও ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরির বেশ কিছু লোক বসবাস করেন। ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নাম কলোনি হলেও আসলে পুরো এলাকাটি বস্তির মতো। এর বাসিন্দারা বেশিরভাগই শ্যামপুর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কলকারখানার নিম্ন আয়ের শ্রমিক। ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরির সামনের সড়কের উল্টো দিকে ওয়াসা পুকুরপাড় দিয়ে যাওয়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইনের পাশেও শতাধিক ঘর তুলেছেন শাহজাহান।

ওই কলোনির কয়েকজন পুরনো বাসিন্দা জানান, কলোনিতে এখন ঘর রয়েছে দুই শতাধিক। ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কলোনির ঘরগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এলাকাটি শাহজাহানের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর সেখানে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন এবং পানির সংযোগ দেওয়া হয়। এজন্য ঘরপ্রতি বিদ্যুৎ বাবদ প্রতি মাসে ৪০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। কোনো ঘরে ফ্রিজ থাকলে এ চাঁদার সঙ্গে আরও ৫০০ টাকা যোগ করা হয়। ওই এলাকায় ওয়াসার পানি সরবরাহ না থাকলেও তিনি অবৈধভাবে কয়েকটি নলকূপ বসিয়েছেন। ঘরপ্রতি মাসে ৩০০ টাকা নিয়ে পানি সরবরাহ করেন। ওই এলাকায় বাসা ভাড়া প্রতি মাসে এক থেকে দুই হাজার টাকা। বাসা ভাড়া, অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ থেকে তার মাসিক চাঁদাবাজি অন্তত ৬ লাখ টাকা। এসবের বাইরে তার বড় আয় মাদক ব্যবসা।

ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি দখলের বিষয়ে আলী হোসেন শাহজাহান বলেন, ম্যাচ ফ্যাক্টরির পুরনো শ্রমিক নেতা হিসেবে তিনিসহ আরও কয়েকজন কলোনিটি দেখভাল করেন। চাঁদাবাজি করেন না। তবে ৬টি পানির পাম্প বসিয়ে খরচ হিসেবে কিছু টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন।

মাদক ‘রাজ্যে’র নাটাই তার হাতে :সূত্রগুলো জানায়, ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরির কলোনি বা রেললাইনের জায়গায় ঘর তুলে চাঁদাবাজি করা শাহজাহানের বড় টার্গেট নয়। কদমতলীর ওই দুটি এলাকা ঘিরে ‘মাদক রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন তিনি। ওই এলাকায় নিজের লোকজন দিয়ে মাদক ব্যবসা করে টাকা কামাচ্ছেন দুই হাতে। শুধু ওই দুটি এলাকা নয়, কদমতলীর বড় একটি এলাকাজুড়ে মাদকের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে। ওয়াসা পুকুর এলাকার মাদকের ‘পাইকারি হাটে’ও রয়েছে শাহজাহানের নিয়ন্ত্রণ। এসব অবৈধ কাজে সরাসরি নিজে থাকেন না শাহজাহান। তার হয়ে ঢাকা ম্যাচ কলোনি ও রেললাইনের দু’পাশে গড়ে ওঠা বস্তির মাদক নিয়ন্ত্রণ করে সিরাজ ও মুরগি মুজিবর নামে দু’জন। আর বেশ ক’জন নারীসহ অন্তত ১০ জন কাজ করেন মাঠ পর্যায়ে।

ওই দুটি এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, টেকনাফ থেকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের বড় চালান আসে শাহজাহানের কলোনিতে। এসব চালান শাহজাহানের লোকজন ঢাকার বিভিন্ন এলাকা এবং মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ জেলাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেন।

মাদক ব্যবসা সম্পর্কে শাহজাহান বলেন, তিনি নিজেই মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে আছেন। এজন্য মাদক ব্যবসায়ীরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উল্টাপাল্টা বলছেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 197 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ