অভিনেতা থেকে জননেতা ফখরুল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

Print

‘ব্যারিস্টার হতে পারলাম না’-মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জন্ম ১ আগস্ট, ১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁয়ে। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১১ সাল থেকে টানা পাঁচ বছর তিনি দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা ফখরুল মূলত বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন, যে পদে তিনি দলের ৫ম জাতীয় সম্মেলনে মনোনীত হন। ২০১১ সালের মার্চে দলের মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। মির্জা ফখরুল এর আগে কৃষি, পর্যটন ও বেসরকারি বিমান চলাচল বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পিতা মির্জা রুহুল আমিন একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন, যিনি ওই অঞ্চলের একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি সফল নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেন এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলছে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মনোনীত হন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুই মেয়ের জনক। তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তার বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে এই প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

সম্প্রতি তার সাথে খোলামেলা কথোপকথনে মিলিত হলে ওঠে আসে তার বর্ণিল জীবনের নানান অধ্যায়-

আপনার শৈশবকাল নিয়ে যদি কিছু বলতেন?

মির্জা ফখরুল: আমার জন্ম ঠাকুরগাঁওয়ে। ১৯৪৮ সালে। তারপর আমি ঠাকুরগাঁওয়েই স্কুল পাস করেছি। এসএসসি পরীক্ষা ঠাকুরগাঁওয়েই দিয়েছি। ঠাকুরগাঁওয়েই আমার শৈশব কেটেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তখন খুব ছোট্ট শহর ছিল। চমৎকার স্কুল ছিল। সেই সময়টুকুু খুব ভালো একটা সময় কেটেছে বলে আমি মনে করি। পড়াশোনা করতাম। স্কুলে ভালো রেজাল্টও হত। বাবা খুব শক্ত বাবা ছিলেন। খুব টাফ ফাদার। পড়াশোনার দিকে তিনি খুব বেশি খেয়াল নিতেন। সেই সময় খেলাধুলাও করেছি। বাসার পাশে মাঠ ছিল। সেখানে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি খুব বেশি খেলাধুলার মধ্যে ছিলাম। একইসঙ্গে কিছু নাটক করার ব্যাপার ছিল। অভিনয় করার ব্যাপার ছিল। স্কুলেও অভিনয় করেছি। পরবর্তীকালেও কিছুদিন অভিনয়ের সাথে যুক্ত ছিলাম। অভিনয়টা আমার কাছে অনেক ভালো লাগতো। অভিনয়ের সময় ভাবতাম বড় অভিনেতা হবো। শৈশব খুব ভালোভাবেই কেটেছে।
আমাদের পরিবারটাই একটি রাজনৈতিক পরিবার। বাবা রাজনীতি করতেন। চাচা রাজনীতি করতেন। আমার বড় মামা তিনিও রাজনীতি করতেন। দিনাজপুর জেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। সেভাবেই রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও বড় হয়েছি।

আপনার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছে কোন বিদ্যালয় থেকে?
মির্জা ফখরুল: ঠাকুরগাঁও হাইস্কুল। এখন যেটা ঠাকুরগাঁও জেলা হাইস্কুল বলে। তখন জেলা স্কুল ছিল না। সরকারি স্কুল ছিল না। তখন এটাকে বলা হত ঠাকুরগাঁও মরজিলেটর হাইস্কুল। ওই অঞ্চলের ভালো স্কুল ছিল। হেডমাস্টার ছিলেন খুব নামকরা।

ছোটবেলার মজার যদি কোনো স্মৃতি থাকে?
মির্জা ফখরুল: অনেক স্মৃতি আছে। মনে রাখার মত একেবারে দাগ কেটে যাওয়ার মত স্মৃতি; সেই সময়ে আমার যতদূর মনে পড়ে আমি তখন খুব ছোট, ৫৪ সালের নির্বাচনের সময় আমি আমার চাচার নির্বাচন করেছিলাম। সেই সময়টা আমার কিছুটা মনে আছে যে, তিনি প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন, থাকতেন ক্যাম্পেইন করতেন। এটাই একটা রাজনৈতিক স্মৃতি ওই সময়ের জন্যে। ওই ধরনের মজার স্মৃতি বলতে এখন আর এ বয়সে মনে করা খুব কঠিন।

ছোটবেলায় কি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন?
মির্জা ফখরুল: এই স্বপ্নগুলো এসেছে যখন আমি হাইস্কুলে পড়ি। বিভিন্ন মনীষীদের বইপত্র পড়ে, তাদের জীবনী পড়ে আমার খুব ইচ্ছা ছিল আমি ব্যারিস্টার হবো। রাজনীতি করার মানসিকতাও তখন থেকেই গড়ে উঠেছিল। তবে আমার অনেক ইচ্ছা ছিল ব্যারিস্টার হওয়ার, কিন্তু সেটা হওয়া হয়নি। আমি ১৯৭২ সালের ১৮ মে দিনাজপুর সরকারি কলেজে যোগদান করি লেকচারার হিসেবে। এরপর আমি ঢাকা কলেজে যাই ১৯৭৩ সালে। আমার শিক্ষকতা জীবন দিনাজপুরেই শুরু হয়েছিল।
আমি রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত হই ১৯৮৮ সালে। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে পৌরসভা নির্বাচন করি প্রথমে। চেয়ারম্যান পদে। তখন থেকেই আমার রাজনৈতিক জীবন শুরু।

আপনি শিক্ষকতা, রাজনীতি, অডিট অফিসার হিসেবেও কর্মরত ছিলেন, যদি অভিজ্ঞতার কথা বলতেন?
মির্জা ফখরুল: আমার চাকরিজীবনটা একটু বৈচিত্রময়। আমি শিক্ষকতা করেছি দীর্ঘদিন। প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কাজ করেছি বছর খানেক। তারপর অডিট অফিসার হিসেবে কাজ করেছি। তারপর তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবেও কাজ করেছি। একইসঙ্গে দিনাজপুর কলেজ, ঢাকা কলেজ এবং দিনাজপুর কলেজে শিক্ষকতা করেছি। আমার পেশা জীবনের এই অভিজ্ঞতা।

ছাত্রজীবনের কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে আপনার?
মির্জা ফখরুল: আমাদের সময়টা তখন খুব ইভেন্টফুল ছিল। ষাটের দশক ছিল ছাত্র রাজনীতিতে একটা গোল্ডেন এয়ার। এবং তখন ছাত্র রাজনীতি যারা করতেন; তারা খুবই মেধাবী ছিলেন। সব সংগঠনগুলোর ছাত্ররাই ছিল খুব ব্রিলিয়ান্ট। বিশেষ করে আমি য্ইে সংগঠনটিতে ছিলাম ছাত্র ইউনিয়ন; সেখানে মেধাবীদেরই নেতৃত্ব ছিল সেই সময়ে। তাদের সহচার্র্যে আসার ফলে আমার নিজেরও একটা মানসিকতা তৈরি হয়েছে। ‘৬৯ গণ আন্দোলন যেটা ১১ দফা সেটা ছিল সবচেয়ে ইভেন্টফুল। তখন আমরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও বহু কাজ করেছি সেই সময়। এগুলোই আমার সেই সময়কার ইভেন্টফুল ঘটনা।

আপনার পরিবার রাজনৈতিক পরিবার, তো আপনার দুই মেয়ে কি রাজনীতিতে আসতে পারে?

মির্জা ফখরুল: আমার দুই মেয়ে ওরা লেখাপড়াই করেছে। বড় মেয়ে পিএইচডি করে অস্ট্রিলিয়াতে সরকারি কাজ করে। আর ছোট মেয়ে ঢাকাতে একটি স্কুলে কাজ করে। তো এদের সম্ভাবনা খুব কম। রাজনীতি তো আর হঠাৎ করে এসে করা যায় না। ওইভাবে তৈরি হতে হয়। যদিও আমার বড় মেয়ের একটু ঝোঁক আছে রাজনীতিতে। ও মাঝে মাঝে লেখালেখি করে। হলিক্রসে যখন পড়তো তখন ডিভেট করতো। কয়েকবার পুরস্কারও পেয়েছে। সরাসরি রাজনীতিতে আসার সুযোগটা তার কম।শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে আসার বিশেষ কি কোনো কারণ ছিল?
মির্জা ফখরুল: আমার ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির প্রতি একটা ঝোঁক ছিল। রাজনীতি করবো। পারিবারিক একটা পরিবেশ ছিল রাজনীতি করার। বাবা যেহেতু রাজনীতি করতেন, চাচাও করতেন। বলা যায় যে, আমার চাচারা একেকজন একেক জায়গায়। আমার চাচা ছিলেন কমিউনিস্ট। আমার বাবা ছিলেন তখন মুসলিম লীগে। আমার আরেক চাচা করতেন গণতান্ত্রিক পার্টি। তাই তখন থেকেই রাজনীতি করার ইচ্ছা ছিল।

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে যদি কিছু বলতেন?
মির্জা ফখরুল: বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বর্তমানে অত্যন্ত সংকটময়। আমার কাছে মনে হয় যে, এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে গণতান্ত্রিক পরিবেশটা; একদম সংকীর্ণ হয়ে গেছে। যেটা আমরা কেউ আশা করিনি যে, বাংলাদেশে এ রকম একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। ভিন্ন মতের মানুষেরা কথা বলতে পারবে না। তাদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হতে হবে। আমি মনে করি যে, এটা একটা বড় সমস্যা। বড় সংকট। গণতন্ত্রের যে চর্চা দরকার ছিল সেটা আজ নেই। সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশটাই সংকীর্ণ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান?
মির্জা ফখরুল: বাংলাদেশকে তো সবচেয়ে উপরে দেখতে চাই। সবদিক থেকেই। কিছুটা বাংলাদেশ এগিয়েও গেছে। সেই সাড়ে ৭ কোটি মানুষের যখন ২০ লাখ টন খাদ্য খাটতি ছিল কিন্তু এখন প্রায় ১৮ কোটি মানুষ, তবে খাদ্য খাটতি নেই বললেই চলে। এখন মানুষের আয় বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রে সুযোগ বেড়েছে। আস্তে আস্তে বাড়ছে কিন্তু যেটাকে সুশাসন বলি আমরা সেই সুশাসন আমরা পাইনি। পাচ্ছি না। সঠিক রাস্তায় চলে যেতে পারছি না। কতগুলো প্রতিষ্ঠান আমরা তৈরি করতে পারিনি। গণতন্ত্রের জন্য সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করা খুব দরকার। যেমন স্বাধীন বিচার বিভাগ তৈরি করা দরকার। প্রশাসনের সুশাসনের ক্ষমতা থাকা দরকার। সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটা পার্লামেন্ট দরকার- সেইগুলো আমরা তৈরি করতে পারছি না। এটা আমাদের রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা বলে আমি মনে করি। এখানকার মানুষ অনেক পরিশ্রমী এবং পজেটিভ। ইয়াং জেনারেশন অত্যন্ত ক্রিয়েটিভ। সঠিক নেতৃত্ব নিয়ে যদি আগানো যায় তাহলে বাংলাদেশ সত্যি সত্যি অনেকদূর এগিয়ে যাবে।

বিএনপিকে নিয়ে কি স্বপ্ন দেখেন?
মির্জা ফখরুল: যখন থেকে রাজনীতি শুরু করেছি; সেই তখন থেকেই বিএনপিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। বিএনপি একটি আদর্শ রাজনৈতিক দল হবে। বিএনপির মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা হবে। তার নিজস্ব বলয়ের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন সৃষ্টি করবে। সৃজনশীলতা থাকবে। দেশের যেন সার্বিক উন্নয়ন হয় অর্থনীতি থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র সবকিছু যেন উন্নয়নের দিকে যেতে পারে, তার জন্যে বিএনপি চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মানুষের মধ্যে বিএনপির জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি হয় এভাবেই দেখতে চাই।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 221 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ