অভিযাত্রিকের অভিযাত্রা

Print
স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের সংগঠন অভিযাত্রিক। হাসপাতালে আসা দরিদ্র রোগীর স্বজনদের বিনামূল্যে রাতে থাকার জন্য আশ্রয়ণের কাজ করছে এ সংগঠন। পাশাপাশি পথশিশুদের শিক্ষার প্রসারেও কাজ করছে অভিযাত্রিক। ২০১০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠন নিয়ে লিখেছেন নাদিম মজিদ
untitled-4_171898

২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক দুপুর। আহমেদ ইমতিয়াজ জামি তখন সেন্ট যোসেফে ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্র। পান্থপথ থেকে মিরপুরের বাসায় ফেরার জন্য বাসে ওঠে। সিটে বসতেই দেখে একটি ছোট্ট ছেলে হাতে পেপার নিয়ে বাসে উঠেছে। বয়স বড়জোর ৭ বছর। বিক্রির জন্য হাঁকডাক করতে করতে এক সময় পেপারসহ বাসের মেঝেতে পড়ে যায়। পেপারগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। আবার উঠে দাঁড়ায়। এবং পেপার বিক্রি করতে থাকে। মিরপুর সাড়ে এগারোতে বাস থামলে জামির সঙ্গে ছেলেটিও নেমে যায়। ছেলেটির সঙ্গে পরিচিত হলে জানতে পারে, তার নাম রাশেদ। পাশেই বাবার দোকান। এত ছোট ছেলেকে কেন পেপার বিক্রি করতে পাঠাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, পরিবারের অবস্থা ভালো নয়। টাকার অভাবে দোকানে মালপত্রও নিতে পারি না। সে যে টাকা আয় করে, তা আমাদের পরিবার চালাতে উপকারে লাগে। রাশেদের বাবার সঙ্গে কথা বলে জামি নিশ্চিত হয়, টং দোকানে মালপত্র কিনে দিলে বিক্রি ভালো হবে। ছেলেকে আর পেপার বিক্রি করতে পাঠাবেন না।

বাবার ঠিকানা নিয়ে জামি ফিরে আসে সেদিন। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে। ১০ জন বন্ধু মিলে এক হাজার টাকার ব্যবস্থা করে। সে টাকা দিয়ে একটি টংঘরে মালপত্রের ব্যবস্থা করে দেয়। শর্ত হিসেবে বলে, কোনো সুদ দিতে হবে না। ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে হবে এবং প্রতি সপ্তাহে ১০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

এরপর আরও বড় পরিসরে কাজের ইচ্ছা জেগেছিল তাদের। শিশুদের নিয়ে কাজের আগ্রহ থেকে গিয়েছিল মিরপুরে অবস্থিত শিশু হাসপাতালে। খুঁজে বের করে আল হাদি এবং জুনায়েদ নামে দু’জন গরিব শিশুকে। আল হাদির মূত্রথলির ইউরেটাস ছিল না। জুনায়েদের হার্নিয়া অপারেশন প্রয়োজন। তাদের অপারেশনের জন্য ৪৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। কিন্তু পরিবারের সে সামর্থ্য নেই। অর্থ সংগ্রহরে জন্য ৬৭ স্বেচ্ছাসেবী এক শুক্রবারে ঘুরে ঘুরে মিরপুরের ১০টি মসজিদে যান। ইমাম সাহেবদের সঙ্গে কথা হয়েছিল আগেই। তারা নামাজের আগে ঘোষণা করেছি তরুণদের এ উদ্যোগের কথা। নামাজের পরে তারা পেয়েছিলেন ৪৫ হাজার টাকা। সব টাকা হাসপাতালের ডাক্তারদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

২০১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মিরপুরে সাড়ে এগারোতে চালু হয় অভিযাত্রিক স্কুল। প্রথম দিকে ছাত্র পেতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হচ্ছিল। অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের শিক্ষা বিভাগের প্রধান খাদিজা-তুল-কুবরা সারাহ বলেন, ‘আমরা ফ্রিতে পড়ানো শুরু করি। কিন্তু ছাত্রছাত্রী পাচ্ছিলাম না। আমরা বিভিন্ন বস্তিতে যাই। শিশুদের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলি। তাদের বুঝিয়ে আমাদের স্কুলে তাদের ছেলে-মেয়েদের পাঠাতে বলি। শুরু করার সময় ছাত্র ছিল ২০ জন। এখন আমরা শিশু, প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর পাঠদান করিয়ে থাকি। সপ্তাহে চারদিন বিকেল ৩টা-৫টা পর্যন্ত ক্লাস হয়ে থাকে। বই এবং শিক্ষাসামগ্রী দিয়ে থাকি তাদের। বিকেলে খাওয়ার জন্য ফলমূল, কেক, বিস্কুট প্রভৃতি দিই। শীতকালে শীতবস্ত্র, ঈদের সময় পোশাক এবং বই আনা-নেওয়ার জন্য ব্যাগ দিয়ে থাকি।’

শিশুদের বাবা-মায়ের সঙ্গেও স্বেচ্ছাসেবকরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। বাবা-মায়ের হাতে পরীক্ষার ফল তুলে দেন। বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেন।

চলতি বছর এপ্রিলে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন স্কুল চালু করে লাউকাঠিতে। সেখানকার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের পড়ানো হয়। শিশু শ্রেণীতে ৪০ জন শিশু পড়ছে। সে গুচ্ছগ্রামে নদীভাঙা ৩০০ পরিবার বসবাস করলেও এখনও কোনো স্কুল গড়ে ওঠেনি।

ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে দরিদ্র রোগীদের আত্মীয়-স্বজন রাতে থাকা নিয়ে বিপাকে পড়ে। তাদের থাকার সুবিধার্থে গত বছর অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন চালু করে নীলাচল আশ্রয়ণ প্রকল্প। ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট প্ল্যানিং বিভাগের হেড সাদ বিন সাত্তার জানান, ‘এ প্রকল্পের আওতায় শ্যামলীতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন রোগীর সঙ্গে আসা ৩০ জন স্বজন বিনামূল্যে এ ফ্ল্যাটে থাকতে পারেন। রোগী সুস্থ হলে তারা নিজেদের এলাকায় ফিরে যান।’

এ বছর বরিশালের ডিএইচ টাওয়ারেও চালু হয় নীলাচল আশ্রয়ণ। এখানে ৪০ জন স্বজন রাতে থাকার সুবিধা পান।

২০১১ সাল থেকে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন পরিচালনা করে আসছে বিশেষ প্রজেক্ট স্মাইল কর্মসূচি। ঈদের আগে বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটাতে তারা দিনব্যাপী এ প্রোগ্রাম করে থাকে। জামাকাপড়, খেলনা, সেমাই দিয়ে থাকে বাচ্চাদের। ২০১১ সালে মিরপুর ডে কেয়ার সেন্টার, ২০১২ সালে মিরপুর শিশু হাসপাতাল, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের শিশুদের নিয়ে এ প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়। ম্যাজিক, নাটক, গান, নাচ, আবৃত্তি, গেম শোসহ আরও অনেক আয়োজন থাকে এ অনুষ্ঠানে। থাকে সবার জন্য জামাকাপড়, খেলনা এবং সেমাই বিতরণ পর্ব।

এ ছাড়া প্রতি বছর শীতবস্ত্র বিতরণ, ফ্রি হেলথ ক্যাম্প, ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং, একসঙ্গে শিশু-অভিভাবকসহ ইফতার, হেলথ অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রামের আয়োজন করে থাকে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন। এ সংগঠনে কাজ করছে ৬০০ স্বেচ্ছাসেবী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, পটুয়াখালী এবং খাগড়াছড়িভিত্তিক কাজ করছে এ সংগঠন। সংগঠনটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধিত।

ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আহমেদ ইমতিয়াজ জামি জানান, ‘আমরা ৬৪ জেলায় পথশিশুদের জন্য স্কুল করতে চাই। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর আশপাশে আশ্রয়ণ প্রকল্প চালু করতে চাই। থাকতে চাই মানুষের পাশে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 98 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ