অসম্ভব ড্র’র স্বপ্ন শেষ বিকেলে ম্লান

Print

সত্যিকার অর্থেই এ যেন ‘মিশন ইমপসিবল’। জিততে ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে চাই ৪৫৯ রান। আর ড্র করতে হলে টিকে থাকতে হবে চার সেশন! সেই অসম্ভব ড্র’র স্বপ্নটা শেষ বিকেলের আলোর মতো কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল। মাত্র ১৪ বলের ব্যবধানে সাজঘরের পথ ধরলেন সৌম্য সরকার ও মুমিনুল হক। এর আগেই বিদায় নেন তামিম ইকবাল। সব মিলিয়ে রোববারের শেষে হায়দ্রাবাদ টেস্টে বাংলাদেশের ড্র’য়ের সেই অসম্ভব স্বপ্নটাও খুব ম্লান! সোমবার শেষ দিনের শেষ ৩ সেশনে যে আর ৭টি উইকেট নিতে পারলেই ঐতিহাসিক টেস্টটিতে জয় স্বাগতিক ভারতের। তারাই চালক এই ম্যাচের।
টেস্টের চতুর্থ দিন শেষে বাংলাদেশ তাদের ২য় ইনিংসে ৩৫ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে করেছে ১০৩ রান। শেষ দিনের সকালে ব্যাট হাতে নামবেন মাহমুদুল্লাহ ৯ ও সাকিব আল হাসান ২১ রানে। ব্যক্তিগত ৮ রানের সময় রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান সাকিব। আল্ট্রাএজে দেখা যায় রবীন্দ্র জাদেজার বল তার ব্যাট স্পর্শ করেনি। যদিও আম্পায়ার তাকে আউট দিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন!
ভারতের বিপক্ষে জয় থেকে এখনো ৩৫৬ রান দুরে আছে বাংলাদেশ। হাতে আছে ৭ উইকেট। হাতে তিন সেশন, মানে ৯০ ওভার। সমীকরণটা বাংলাদেশের জন্য কঠিনের চেয়ে কঠিন সেটা বলে দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ভারতের মাটিতে এমন পরিস্থিতিতে জয় বা ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ার ইতিহাস সফরকারী কোনো দলের সুদূর অতীতেও নেই।
কঠিন সেই মিশনে নেমে রোববার শেষ সেশনে রবিচন্দ্রন অশ্বিন বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে শুরুতেই বিদায় করেন তামিমকে। তার বলে প্রথম স্লিপে বিরাট কোহলির ক্যাচ দেন টাইগার ওপেনার। জোরালো আবেদনে আম্পায়ার সাড়া না দিলে রিভিউ নেন ভারত অধিনায়ক। বল ব্যাটে লাগার প্রমাণ মিললে পাল্টে যায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত।
বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার লড়াইয়ে ছিলেন সৌম্য সরকার ও মুমিনুল হক। ভালোই চলছিল। কিন্তু সেই জুটিও বেশিদুর যেতে পারল না। ফিরে গেলেন সৌম্য। ৪২ রান করে জাদেজার বলে আউট। স্লিপে অাজিঙ্কা রাহানের হাতে ক্যাচ দিয়ে সৌম্য শেষ করেন ভারত সফর। এরপর তার পিছু নেন মুমিনুলও। ২৭ রান করা এই ব্যাটসম্যানের উইকেট তুলে নেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন। তিনিও স্লিপে রাহানের হাতে ক্যাচ তুলে দেন। বড় ধাক্কা টাইগারদের জন্য। তারপর বাকি সময়টা শেষ করেন সাকিব ও মাহমুদউল্লাহ।
এর আগে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য ‘মিশন ইমপসিবল’ এর মতো এক লক্ষ্য ছুড়ে দেয় ভারত। চা বিরতির আগে ভারত ২য় ইনিংসে ২৯ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৫৯ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন চেতেশ্বর পুজারা (৫৪) ও রবিন্দ্রু জাদেজা (১৬)।
সান্ত্বনা হতে পারে ম্যাচটা অন্তত ইনিংস ব্যবধানে হারছে না মুশফিকুর রহীমের দল। কারণ বাংলাদেশের ১ম ইনিংস থেকে ২৯৯ রান এগিয়ে থেকেও ফলো-অনে করানোর রাস্তায় হাঁটেনি স্বাগতিকরা। কিছুটা চমকে দিয়ে বরং নিজেরাই আবার ব্যাট হাতে নামে। উইকেটে আরো ফাটল ধরিয়ে হয়তো বোলারদের হাতে বল দিতে চাইলেন বিরাট কোহলি। কিন্তু চাপের মুখে থেকেও ভাল বোলিং করছেন টাইগার বোলাররা।
২য় ইনিংসের শুরুটা বেশ ভাল ছিল বাংলাদেশের বোলারদের। তাসকিনের জোড়া আঘাতে কেঁপে ওঠে স্বাগতিকদের ব্যাটিং লাইন আপ। তারপর বিরাট কোহলিকে আটকে দেন সাকিব আল হাসান।
দলীয় ১২ রানে প্রথম উইকেট হারায় ভারত। ফিরে যান আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান ওপেনার মুরালি বিজয়। অফ স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে মুশফিকের হাতে তুলে দেন ক্যাচ। এরপরই লোকেশ রাহুলকে (১০) সাজঘরের পথ দেখিয়ে দেন সেই তাসকিন। এই পেসারের বলে কাট করতে গিয়ে সেই মুশফিকের গ্লাভসে ক্যাচ।
এরপর আগের ইনিংসের ডাবল সেঞ্চুরিয়ান কোহলিকে ফেরান সাকিব। ৩৮ রান আসে ভারত অধিনায়কের ব্যাটে। মিড উইকেটে মাহমুদউল্লাহর হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন তিনি। এরপর রাহানেকে (২৮) ফিরিয়ে পাপমোচন করেন সাকিব। ৪ রানে তার হাতেই জীবন পেয়েছিলেন এই ভারতীয়।
এদিনই লাঞ্চের আগে ১ম ইনিংসে ১২৭.৫ ওভারে ৩৮৮ রান তুলে অলআউট হয় টাইগাররা। সেখানে আছে টাইগার অধিনায়ক মুশফিকুর রহীমের বীরোচিত ১২৭। তারো আগে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ৬ উইকেট হারিয়ে ৬৮৭ রানের পাহাড়ে উঠে ১ম ইনিংস ঘোষণা করে ভারত।

আরো একবার স্রোতের বিপরীতে লড়াই করে গেছেন মুশফিক। ১২৭ রানে শেষ হয় তার সংগ্রামী সেই ইনিংস। এটি ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে পঞ্চম টেস্ট শতক টাইগার অধিনায়কের। ২৩৫ বল খেলে এই মাইলফলকে পা রাখেন তিনি। ২৬২ বল, ১৬ চার ও দুটি ছক্কার এই ইনিংস খেলার পথে মুশি টপকে যান হাবিবুল বাশারকে (৩০২৬)। টেস্ট এখন তিনি দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ওপরে আছেন তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান।
মুশফিককে ফিরিয়ে রবিচন্দ্রন অশ্বিন ৪৫ টেস্টে আড়াইশ’ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়েন। টপকে যান অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি ডেনিস লিলিকে (৪৮)। ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম হিসেবে ২৫০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড এখন অশ্বিনের।
আগের দিন মুশফিককে দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন সাকিব আল হাসান। এরপরই মেহেদী হাসান মিরাজ। দারুণ দৃঢ়তা দেখিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংসটাই খেলে ফেলেন তিনি। মেহেদী আগের দিনের সেই ৫১ রানেই ধরেন সাজঘরের পথ। মুশফিককে কিছুক্ষণ সঙ্গ দিয়ে তাইজুল ইসলাম ফিরে যান ১০ রানে। খেলেন ৩৮ বল। তাসকিন আহমেদও লড়েছেন কিছুটা সময়। ৩৫ বলে ৮ রান করে রবিন্দ্র জাদেজার শিকার তিনি। ৩৯ রানের জুটি গড়েন অধিনায়কের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত কামরুল ইসলাম রাব্বি অপরাজিত ছিলেন শুন্য রানে।
আগের দিন রাজিব গান্ধী স্টেডিয়ামে সাকিবের ব্যাট থেকে আসে ৮২ রান। অন্য ব্যাটসম্যানরা উইকেটে আসা-যাওয়ার খেলাতেই ছিলেন ব্যস্ত! এরপর রোববার ৬৬ রানে শেষ ৪ উইকেট! তাইতো ব্যাটিং স্বর্গে ঠিকঠাক জবাব দেয়া হল না স্বাগতিকদের। তবু রানটা নেহাত মন্দ হলো না পাহাড়ে চাপা পড়ার পরও।
তারও আগে প্রথম দুই দিনের ৫ সেশনে ব্যাটিং স্বর্গে ভারত রানের পাহাড়ে উঠে বসে। ৬ উইকেট হারিয়ে ১ম ইনিংসে ৬৮৭ রানে ইনিংস ঘোষণা করে তারা। ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি করেছেন রেকর্ড গড়া ডাবল সেঞ্চুরি। তার আগে মুরালি বিজয় এবং পরে ঋদ্ধিমান সাহা সেঞ্চুরি করেছেন।
সব মিলিয়ে হারের শঙ্কার মুখেই এখন বাংলাদেশ। হাতে ৭ উইকেট রেখে টেস্টের পঞ্চম দিনের পুরোটা পার করে দেয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারবে কি বাংলাদেশ?

সংক্ষিপ্ত স্কোর :
ভারত ১ম ইনিংস : ১৬৬ ওভারে ৬৮৭/৬ ইনিংস ঘোষণা (রাহুল ২, বিজয় ১০৮, পুজারা ৮৩, কোহলি ২০৪, রাহানে ৮২, ঋদ্ধিমান ১০৬*, অশ্বিন ৩৪, জাদেজা ৬০*; তাসকিন ১/১২৭, রাব্বি ০/১০০, সৌম্য ০/৪, মিরাজ ২/১৬৫, সাকিব ০/১০৪, তাইজুল ৩/১৫৬, সাব্বির ০/১০, মাহমুদুউল্লাহ ০/১৬)। এবং ভারত ২য় ইনিংস : ১৫৯/৪ ইনিংস ঘোষণা (পুজারা ৫৪, কোহলি ৩৮, রাহানে ২৮; তাসকিন ২/৪৩, সাকিব ২/৫০)
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ১২৭.৫ ওভারে ৩৮৮/১০ (তামিম ২৪, সৌম্য ১৫, মুমিনুল ১২, মাহমুদউল্লাহ ২৮, সাকিব ৮২, মুশফিক ১২৭, সাব্বির ১৬, মিরাজ ৫১, তাইজুল ১০, তাসকিন ৮; ভুবনেশ্বর ১/৫২, ইশান্ত ১/৬৯, অশ্বিন ২/৯৮, যাদব ৩/৮৪, জাদেজা ২/৭০) এবং বাংলাদেশ ২য় ইনিংস : ৩৫ ওভারে ১০৩/৩ (সৌম্য ৪২, মুমিনুল ২৭, মাহমুদুল্লাহ ৯*, সাকিব ২১*; অশ্বিন ২/৩৪, জাদেজা ১/২৭)।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 226 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ