আতঙ্কের নাম মগবাজার ফ্লাইওভার

Print

এই বুঝি মাথায় উপর থেকে পড়লো রড, কিংবা গার্ডার। তার উপর জায়গায় জায়গায় গর্ত, কাদা, ফুটপাত বিহীন রাস্তা দিয়ে চরম ঝুঁকিতে নিত্যদিন চলাচল করে প্রায় কয়েকলাখ মানুষ। রাজধানীবাসীর কাছে এ মৃত্যুঝুঁকির নাম মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। দফায় দফায় বেড়েছে সময়, বেড়েছে ব্যয়, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। পাইলিংকালে নগরবাসী নানামুখী বিড়ম্বনার শিকার হলেও এখন আতঙ্কে পারাপার করতে হচ্ছে তাদের।
২০১১ সালে একনেকে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। ২০১৪ সালের মধ্যে ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হবার কথা ছিল কিন্তু ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে এলেও এখনো ৩০ ভাগ কাজ বাকি রয়ে গেছে নির্মাণের। কবে এ কাজ শেষ হবে এখনো তা নির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি কেউ।

এর পরে দফায় দফায় নির্মাণের সময় বাড়ে। ফলে রীতিমত দায়সারার মতো কাজ করা হলেও সরকারের চাপে পড়ে তাড়াতাড়ি নির্মাণ প্রতিনিয়ত ঘটছে নানার দুর্ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, হরহামেশায়ই ফ্লাইওভার নিচে এমন দুর্ঘটনা ঘটে।
কেবল নিচ দিয়ে চলাচলকারীরাই নয়, নিরাপত্তাহীনতায় খোদ নির্মাণ শ্রমিকরাও। দু’এক জন বাদে কারোরই নেই হেলমেটসহ নিরাপত্তা উপকরণ। এমন ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন তারা। আবার হেলমেট থাকলেও তা ব্যবহার করেন না, শ্রমিকরা। নেই তদারকিও।

ফ্লাইওভারের ওপরে একদিকে যেমন অরক্ষিত ভাবে নির্মাণ কাজ চলছে, অন্যদিকে নিচের অংশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার প্রশাসন ও মিডিয়া সোচ্চার হলে তারা সাবধান হয়ে ভালোভাবে কাজ করে। কিন্তু কিছুদিন পর নির্মাণকারীরা আগের হালে চলে যায়।
সাড়ে ৮ কিলোমিটারের এ ফ্লাইওভারের নির্মাণ এলাকায় নিরাপত্তামূলক বেষ্টনী ও পোশাক পড়ে কাজ করার নিয়ম থাকলেও তার প্রতি নজর দিচ্ছে না নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠান। ফলে নিত্যদিন প্রাণ হারাচ্ছে শ্রমিকও পথচারীরা।
গেলো বছরের ১৬ মার্চ নির্মাণাধীন মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের ওপর থেকে লোহার টুকরো মাথায় পড়ে নিহত হয়েছিল শ্রমিক ইমন। এর পরে দুর্ঘটনা এড়াতে সাধারণ জনগণ ও নির্মাণ শ্রমিকের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কিন্তু এ বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা মিলেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে। যার ফলস্বরুপ গেলো রোববার মালিবাগের রেলগেটে ফের দুর্ঘটনা ঘটে। মধ্যরাতে ক্রেন দিয়ে ফ্লাইওভারের গার্ডার তুলতে গিয়ে ছিটকে পড়ে স্বপন (৪০) নামে নির্মাণকর্মী নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয় আরো দু’জন।

এর আগে ২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল নিরাপত্তা বেষ্টনী ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বাসচাপায় মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের দু’নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। দুই সহোদর মাজেদুল (১৮) ও আসাদুল (২০) বাসচাপায় নিহত হন। একই ঘটনায় মনির ওরফে মঞ্জু (২৩) নামে আরো একজন গুরুতর আহত হয়। আর সম্প্রতি একটি আসামিবাহী গাড়ি ও একটি বাস উল্টে যাত্রী আহত হবার ঘটানো ঘটে।
ফ্লাইওভার এলাকাঘুরে দেখা যায়, নিরাপত্তামূলক বেষ্টনী ছাড়া করা হচ্ছে নির্মাণকাজ। উপরে চলছে ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ নিচে চলছে ফুটপাত নির্মাণের কাজ। তার উপর ভাঙা রাস্তায় চলছে যানবাহনও। এ যেন মানুষের কাছে মরার উপর খাড়ার ঘা। তাই রীতিমত বাধ্য হয়ে রাস্তায় চলাচল করতে হচ্ছে পথচারীদের।
এছাড়া কোনো কোনো জায়গায় বেশ বড় গর্ত রয়েছে। আবার কোথাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। বিশেষ করে মালিবাগ থেকে মৌচাক মোড় হয়ে আবুল হোটেল এবং রাজারবাগ থেকে মালিবাগ মোড় পর্যন্ত সড়কের অবস্থা বেশি খারাপ। পুরো এলাকার রাস্তাটি চলাচলের অযোগ্য।
অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় কোনো রকম নিরাপত্তা ছাড়াই চলছে ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ, এর মধ্যে রয়েছে রডের কাজ, ওয়ারিং এর কাজ,গার্ডার ওঠানো ও বসানোর কাজ। আর ঠিক নিচেই জ্যামে আটকে আছে গাড়ি ও রিকশা। একটু অসাবধানতায় নির্মাণসামগ্রী গায়ে পরে ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। এছাড়া বেশ কয়েকস্থানে রাস্তা বন্ধ করে করা হচ্ছে নির্মাণকাজ।

নগরবিদরা বলছেন, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে দুর্ভোগ-দুর্ঘটনা নতুন ঘটনা নয়। গেলো রোববার রাতেও দুর্ঘটনা ঘটলো। এতে পথচারী ও নির্মাণকর্মী উভয় স্বীকার হয়েছে। এমন ঘটনার মূল কারণ উদাসীনতা ও তদারকির অভাব। ঠিকাদাররা কাজ করছে মন মতো। কিন্তু বহির্বিশ্বে এমন চিত্র বেমানান।
তারা বলেন, দেয়া হচ্ছে অর্থের যোগান। প্রয়োজনে রাস্তাও বন্ধ রাখা হচ্ছে। কিন্তু এর পরেও ফ্লাইওভার নির্মাণ চলছে ধীরগতিতে। যার ভুক্তভোগী শুধু নির্মাণাধীন এলাকার জনগণ নয় পুরো দেশ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 183 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি