আদালতের অভিযানের জের রোগী বের করে দিয়ে ধর্মঘট

Print
হাসপাতাল ক্লিনিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের জের  রোগী বের করে দিয়ে ধর্মঘট, পরে প্রত্যাহার

বগুড়া শহরের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকেরা হঠাৎ তাঁদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। এমনই একজন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের স্ট্রোকে আক্রান্ত বৃদ্ধ আবুল হোসেন। ছবিটি বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকা থেকে তোলা l সোয়েল রানা

বগুড়া শহরের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকেরা হঠাৎ তাঁদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। এমনই একজন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের স্ট্রোকে আক্রান্ত বৃদ্ধ আবুল হোসেন। ছবিটি বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকা থেকে তোলা l সোয়েল রানা

একটি হাসপাতালে চিকিৎসকের নাম করে রোগী দেখছিলেন চিকিৎসা সহকারী। শল্যচিকিৎসকের বদলে আরেক হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করছিলেন আরেক চিকিৎসা সহকারী। রোগনির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলের কাগজপত্রে ছিল না চিকিৎসকের স্বাক্ষর।
বগুড়ার বেসরকারি দুটি হাসপাতালে গতকাল বৃহস্পতিবার অভিযানে এমন চিত্রই পান ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় আদালত একটি হাসপাতালের মালিক ও চিকিৎসা সহকারীকে তিন মাসের দণ্ড দেন। অন্য হাসপাতালকে চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। র্যা ব, পৌরসভার স্বাস্থ্যকর্মী ও জেলা ড্রাগ সুপারকে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন বগুড়া জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তায়েব উর রহমান।
অভিযানের প্রতিবাদে শহরের তিন শতাধিক ক্লিনিক-হাসপাতালে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে বেলা ১১টা থেকে ধর্মঘট শুরু করে বগুড়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। দুপুরের দিকে ঠনঠনিয়া পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে সাতমাথা-শেরপুর সড়ক অবরোধ করা হয়। পরে সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশে বাংলাদেশ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বগুড়া শাখার সভাপতি মোস্তফা আলম ঘোষণা দেন, অভিযানের সময় মালিক-কর্মচারী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে বিচারক দুর্ব্যবহার ও মারধর এবং বেআইনিভাবে জরিমানা করেছেন। এ কারণে বিনা শর্তে আটক দুজনকে মুক্তি, ওই বিচারককে প্রত্যাহার করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় হাসপাতাল-ক্লিনিকের তালা খুলবে না। তবে রাতে অ্যাসোসিয়েশনের সভা শেষে মোস্তফা আলম  বলেন, আগামী রোববারের মধ্যে তাঁদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট চলবে।
এর আগে গত ২৪ জানুয়ারি রাজশাহীতে কয়েকটি হাসপাতালে অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর প্রতিবাদে রোগীদের বের করে হাসপাতালে তালা দিয়ে ধর্মঘট শুরু করে রাজশাহীর সব কটি বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল। এরও আগে গত বছরের ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রামে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে আদালতে মামলা করা হলে প্রতিবাদে চট্টগ্রামের সব চিকিৎসক টানা ধর্মঘট পালন করেন।
বগুড়ায় গতকাল অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী হাকিম তায়েব উর রহমান বলেন, শহরের কানুছগাড়ি ফাতেমা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা কর্মকর্তা পরিচয়ে রোগী দেখছিলেন চিকিৎসা সহকারী ওমর ফারুক। এ সময় হাতেনাতে তাঁকে আটক করা হয়। এ ছাড়া কর্তব্যরত চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করছিলেন অন্য একজন চিকিৎসা সহকারী। রোগনির্ণয় কেন্দ্রের এক্স-রে কক্ষের দেয়ালে ভেন্টিলেটর খোলা ছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের কাগজে ছিল না কোনো চিকিৎসকের স্বাক্ষর। ভর্তি রোগী ও অস্ত্রোপচার করা রোগীর ফাইলে কোনো চিকিৎসকের স্বাক্ষর ছিল না। কোন চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেছেন, সেই তথ্যও নেই। রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করায় ভোক্তা অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী হাসপাতালের মালিক মামুনুর রশিদ ওরফে বাবুর তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা না দেওয়ায় তাঁকে ছয় মাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর ওমর ফারুককে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা না দেওয়ায় তাঁকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তায়েব উর রহমান আরও বলেন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শাজাহানপুর উপজেলার নয়মাইলে ম্যাক্স কেয়ার ক্লিনিকে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানেও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসা সহকারী রোগীর অস্ত্রোপচার করেন। চিকিৎসা সহকারী ছিলেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। এ কারণে ক্লিনিকের মালিক কামাল হোসেন, চিকিৎসা সহকারী আবদুর রউফ এবং কথিত শল্যচিকিৎসক ফজলুর রহমানের কাছ থেকে ভোক্তা অধিকার আইনে চার লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
ফাতেমা ক্লিনিকে অভিযানের দুজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, অভিযানের সময় সিভিল সার্জনের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে এসএ টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার ও বগুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আরিফ রেহমান বিচারিক হাকিম তায়েব উর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হন। বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে তিনি আরিফ রেহমানকে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে অন্য সাংবাদিকেরা সেখানে গেলে তাঁদের সঙ্গেও তিনি দুর্ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে সাংবাদিকেরা বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানালে প্রায় এক ঘণ্টা পর আরিফকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সাংবাদিক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে দুপুর ১২টার দিকে শহরের সাতমাথা অবরোধ করে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন সাংবাদিকেরা। বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি যাহেদুর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারিক হাকিম তায়েব উর রহমানকে বগুড়া থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। একই দাবিতে পরে জেলা প্রশাসক মো. আশরাফ উদ্দিনের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন সাংবাদিকেরা।
তায়েব উর রহমান বলেন, ওই সাংবাদিক ক্লিনিক মালিকের হয়ে তদবির ও সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন। এ কারণে তাঁকে আটক করে রাখা হয়েছিল।
বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন নুরুজ্জামান বলেন, যেসব অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়েছেন, সেখানে সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি থাকা দরকার ছিল। কিন্তু কোনো প্রতিনিধি চাওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, বিচারিক হাকিমের বিরুদ্ধে সাংবাদিক লাঞ্ছনা এবং ক্লিনিক মালিকদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

-প্রথম আলো

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 123 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ