আন্দোলনের নেপথ্যে হাজার কোটি টাকার চাঁদা

Print

হকারদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে রাতারাতি গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ভুঁইফোড় সংগঠন। যেগুলোর পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন সরকারদলীয় বেশ কিছু নেতা। ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের নেতারাই সরাসরি এ কাজ তত্ত্বাবধায়ন করেন। সঙ্গে আছে পুলিশ প্রশাসনেরও কিছু অসাধু কর্মকর্তা। তাদের কাছে অসহায় খোদ সিটি করপোরেশনও। উচ্ছেদ কার্যক্রমে গেলেই লেলিয়ে দেওয়া হয় অনুগতদের, বাধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এর সব কিছুর মূলে হকারদের কাছ থেকে আদায় করা বিপুল পরিমাণ চাঁদা। সাম্প্রতিক সময়ে হকার উচ্ছেদ, পাল্টা দখল এবং সংঘর্ষের বিষয়ে মামলা-হামলার নেপথ্যেও ছিল এই বিশাল টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ।
এক জরিপে জানা যায়, ফুটপাত থেকে বছরে চাঁদা বাবদ আদায় হয় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। এর কোনো অংশই জমা পড়ে না সরকারের কোষাগারে, পুরোটাই যায় চাঁদাবাজ ও তাদের নিয়ন্ত্রকদের পকেটে। ফলে কোনো পরিবর্তনই হয় না হকারদের জীবনমানের।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজধানীর ফুটপাতজুড়েই রয়েছে দোকান। তবে গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন এলাকাকেন্দ্রিক গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন হকার সংগঠন। নেতারাও সব ওই এলাকার নেতা কিংবা পাতিনেতা। অনেকের আয়ের মাধ্যমও এই হকার রাজনীতি। এ ছাড়াও বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে ‘কর্মী’ জোগান দেওয়ায় সহজলভ্যতা, প্রতিদিন পকেট ভরানোসহ বেশ কিছু কারণেই নেতারা এসব নিয়ন্ত্রণে রাখেন। প্রতিদিনের চাঁদা ওঠাতে এলাকাভেদে তাদের রয়েছে ১০ থেকে পাঁচজনের টিম। এরা মূলত সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে হকারদের কাছ থেকে টাকা নেয়।
তবে এসব হকার মূলত চার ধাপে নিয়ন্ত্রিত হয়। মহানগরের কিছু অসাধু নেতা তাদের অনুগতদের দিয়ে তৈরি করেছেন হকার সংগঠন। তাই উচ্ছেদে নামলেও তাদের আন্দোলনে প্রতিবারই ব্যর্থ হয় সিটি করপোরেশন। সংগঠনগুলোর মধ্যে হকার্স সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবুল হোসেন, যিনি একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টিরও সভাপতি। তবে এই হকার্স নেতার ফুটপাতে কোনো দোকান নেই। মূলত হকারদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতা ও বিবৃতি দিয়েই আজ তিনি হকার নেতা। তার সংগঠনের কোনো রেজিস্ট্রেশনও নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হোসেন বলেন, সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন কোনো বিষয় নয়। আর আমি যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি, সেটাও এখানে প্রযোজ্য নয়।
অন্য একটি সংগঠন হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হাসেম কবির। তিনি মূলত পল্টনে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ভবনের সামনের ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে চাঁদা তোলার কাজ করেন। নিজেকে নেতা হিসেবে জাহির করতেই গড়ে তুলেছেন এই সংগঠন। এরও কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। ফুটপাতের দোকানদার রুবেল মিয়ার কাছে এখানকার লাইনম্যানের (চাঁদা তোলার দায়িত্বে যিনি) পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, ‘কবির (আবুল হাসেম কবির) সাব লাইনম্যানের কাজ করেন। তবে এখন আবার তিনি নেতা!’
বিএনপি সমর্থিত ছিন্নমূল হকার্স সমিতি নামেও রয়েছে একটি সংগঠন। এই সংগঠনের সভাপতি কামাল সিদ্দিকী। তারও নিজস্ব কোনো দোকান নেই। ছিন্নমূল হকার্স লীগ নামে আরেকটি সংগঠনের সভাপতি হারুন। তিনি বায়তুল মোকাররম মার্কেটের স্বর্ণের দোকানগুলোর সামনের ফুটপাতের লাইনম্যান। সেখানে তিনি দৈনিক চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা তোলেন বলে জানান ফুটপাতেরই এক দোকানদার। এ ছাড়াও রয়েছে জাতীয় সম্মিলিত হকার জোট, ইসলামি হকার দল, জাতীয় হকার অধিকার রক্ষা কমিটি, হকার আন্দোলসহ বেশ কিছু সংগঠন। এসব সংগঠনের নেতারাও ফুটপাতের কোনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। সহজ আয়ের উৎস হিসেবেই বেছে নিয়েছেন হকার রাজনীতি।
জানা গেছে, সংগঠনের নেতারা ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায়ের পর তা বিভিন্ন নেতাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। পরবর্তিতে ওপরের নেতারা প্রশাসনসহ অন্যদের মধ্যে সেই টাকা ভাগবাটোয়ারা করে দেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশে জুতা বিক্রি করেন আয়ুব আলী। তিনি জানান, দোকান বসানোর কারণে প্রতিদিন ৭০ টাকা দিতে হচ্ছে লাইনম্যানকে; ১০০ টাকা দিতে হচ্ছে ভাড়া; এ ছাড়া পুলিশের ভাগের কোনো হিসাব-নিকাশ নেই, যখন যাকে যা দিয়ে পারা যায়। এর বাইরে আরও খরচ আছে ১০০ টাকা। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বিভিন্ন উপলক্ষেও টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে গড়ে প্রতিদিনি প্রায় ৪০০ টাকা খরচ আছে। এর বাইরে আরও আছে নিজেদের খরচ।
গুলিস্তান মসজিদের পাশে ব্যবসা করেন লাল মিয়া সরদার। তিনি বললেন, আমরা এই অনিশ্চিত ব্যবসা করতে চাই না। পুলিশের নির্যাতন, চাঁদাবাজি তো রয়েছেই। এ ছাড়াও বিভিন্ন রকম হয়রানি নিত্যসঙ্গী, অন্য কেউ বেশি টাকা দিলে পুরনোরা ব্যবসা করতে পারে না। তখন পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। আমরা পুনর্বাসন চাই। কিন্তু এরপরও নেতাদের কথায় সরকারের বিরুদ্ধে মিছিলে যেতে হয়, না গেলে শারীরিক নির্যাতন করে। অনেক সময় প্রোগ্রামে পাহারা বসায়, আমরা সেখান থেকে উঠেও আসতে পারি না।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) থেকে নগর পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় দুই লেনের দুই হাজার ২১৫ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে মাত্র ৪৩০ কিলোমিটার হাঁটাচলার জন্য ফুটপাত রয়েছে। এর মধ্যে ৮৩ দশমিক এক শতাংশ ফুটপাত দখল করে রেখেছে হকাররা। ফুটপাত সরকারি হলেও প্রতি বর্গফুটের বিপরীতে তাদের মাসিক ভাড়া দিতে হচ্ছে গড়ে এক হাজার ৮১২ টাকা। এই হিসাবে হকারদের কাছ থেকে বছরে আদায় হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, যা দিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক বছরের বাজেট প্রণয়ন সম্ভব। হকারদের কাছ থেকে এসব টাকা আদায় করার জন্য রয়েছে লাইনম্যান। তারা মাসিকের পাশাপাশি দৈনিক হারেও চাঁদা নেন। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয় আলাদা চাঁদা, যা সংশ্লিষ্ট বিভাগের খাতায় জমা হচ্ছে না।
রাজধানীকে যানজট নিরসন ও তিলোত্তমা গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বৈঠকে হকার পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বরের ওই বৈঠকের সভাপতি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। এর আগে একনেক সভায়ও হকার পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকেই হকারদের পুনর্বাসন ও হলিডে মার্কেট চালুর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয় সরকার। প্রথমদিকে এ বিষয়ে হকারদের পক্ষ থেকে সাড়া মিললেও পরবর্তীতে স্বার্থান্বেষী মহলের হুমকিতে পিছু হটে হকাররা।
জানা যায়, হকার্স নেতা, প্রশাসনের কিছু অর্থলোভী সদস্য, স্থানীয় নেতারা চান না হকারদের পুনর্বাসন করা হোক। এতে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা তোলার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এমনকি যারা হকার পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশ নেন তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র বরাবর একটি অভিযোগপত্রও দেন হকাররা। যেখানে হামলাকারী স্থানীয় নেতা ও চাঁদাবাজদের নাম উল্লেখ ছিল। এ বিষয়ে মতিঝিল থানার এক পুলিশ ইন্সপেক্টরের কাছে অভিযোগ জানালেও তিনি কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ হকারদের।
তবে এতে পিছপা হয়নি সরকার। হকারদের পুনর্বাসনে হাতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প। সিটি করপোরেশনের এ সংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, স্বল্প খরচে ট্রেনিং করিয়ে বিদেশ পাঠানো, বিভিন্ন সরকারি প্রজেক্টে কাজ দেওয়া এবং হলিডে মার্কেট চালুর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু হকার নেতাদের বাধার কারণে তা এগোতে পারছে না। উল্টো এই কার্যক্রমে আবেদন করা চারশ থেকে পাঁচশ হকার রয়েছেন অর্থলোভীদের হুমকিতে। তারা এখন কোথাও দোকান বসাতে পারছেন না।
পুনর্বাসনের বিষয়ে জানতে কথা হয় হকারদেরই একটি সংগঠন বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ হকার্স লীগ সভাপতি এমএ কাশেমের সঙ্গে। যিনি হকার পুনর্বাসন কমিটিরও সদস্য। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, আমরা নির্বিঘে ব্যবসা করতে চাই। চাঁদা আর বিভিন্ন খাতে টাকা দিয়ে ব্যবসার কিছুই থাকে না। তাই আমাদের দরকার পুনর্বাসন। এ সংক্রান্ত উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। যারা হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে তাদের তালিকা করে শাস্তি দিতে পারলে এই খাত থেকে সিটি করপোরেশন অনেক আয়ও করতে পারবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, হকার পুনর্বাসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর অংশ হিসেবে আমরা শুক্র ও শনিবার হলিডে মার্কেট স্থাপন করেছি। এ ছাড়া অন্যদিনগুলোতে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর ফুটপাতে ব্যবসা করা যাবে। তা ছাড়া আমরা হকারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশ পাঠানোর বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। এ জন্য হকারদের কাছ থেকে বায়োডাটাও আহ্বান করা হয়েছে, অনেক আবেদনও এসেছে। আমরা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেব। যারা এত কিছুর পরও আন্দোলন করছেন বা আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছেন, তারা ভুল পথে আছেন। সবার সহযোগিতায় আমরা নগরীকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখতে চাই।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 143 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ