আরো ২ লাখ রোহিঙ্গা আসছে

Print

নতুন করে আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে! এমনই আগাম পূর্বাভাস দিয়েছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও মানবিক সাহায্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)। রাখাইনের সংঘাতপূর্ণ এলাকা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত বৈশ্বিক ওই সংস্থা বলছে, তাদের অংশীদার প্রতিষ্ঠান অ্যাকশন কনট্রে লা ফেইম (এসিএফ)-এর নেতৃত্বে সমপ্রতি মানবিক সংস্থাগুলো রাখাইন থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ওপর একটি জরিপ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ওই জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিয়েই মূলত জরিপটি হয়। সেই জরিপে রোহিঙ্গা শিশুদের অপুষ্টির মাত্রা চরমে থাকা এবং তাদের অপুষ্টি যে সার্বিকভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে সেই তথ্য ওঠে এসেছে। আইআরসির কাছে থাকা তথ্য মতে, বাংলাদেশে এখন ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। নতুন করে আগামী কয়েক সপ্তাহে আরো ২ লাখ রোহিঙ্গা আগমনের ফলে মোট রোহিঙ্গা সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।
তাদের মতে, রোহিঙ্গা আশ্রিত কক্সবাজার এলাকার মানবিক সংকট এখন কল্পনাতীত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। শনিবার আইআরসি সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরে একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত সংস্থাটির নিজস্ব অনুসন্ধান, জরিপ, ধারণা ও জ্ঞানলব্ধ। কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফে মানবিক সহায়তা প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বরাতে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছে নতুন-পুরাতন মিলে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এরই মধ্যে ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ২৫শে আগস্টের ক্রেকডাউনের পর থেকে গত আড়াই মাসেই এসেছে ৬ লাখ ১৩ হাজার। এখনও প্রতিদিন দল বেঁধে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বিভিন্ন উপায়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ এবং আক্রান্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে ত্রাণকার্য পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিতে বিশ্ব নেতাদের আহ্বান সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। রাখাইন সংকট নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার পর চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে রাখাইন নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানানো হলেও এটি বন্ধে চীনের ভেটোর কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি নিরাপত্তা পরিষদ। যদিও জাতিসংঘ আগেই বলেছে রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে রাখাইনে যা চলছে তা একটি জাতিকে জাতিগতভাবে নির্মূলের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী সুচি সরকার কঠোর সমালোচনার মধ্যে রয়েছে। অবশ্য বৈশ্বিক ওই সমালোচনা থামাতে দেশটির কার্যকর নেতা, স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচি দাবি করেছেন ৫ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে রাখাইনে মিলিটারি অপারেশন বন্ধ রয়েছে এবং সেখানে কোনো সংঘাত নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এমনটাই জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম। গত কয়েক দিনে যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারে এসেছে তারাও একই কথা বলছেন। তাদের সরবরাহ করা তথ্যমতে, সহিংসতার মাত্রা কমলেও রাখাইনে থাকার মতো অবস্থা নেই। সেখানে চরম খাদ্য ও অর্থ সংকট বিরাজ করছে। তাছাড়া নির্যাতনের ভয়ও তাদের তাড়া করছে। তাদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। আগতরা বলছেন, তারা তাদের নিজেদের এবং প্রতিবেশীদের বাড়িঘর পুড়তে দেখেছেন। অনেককে চোখের সামনে হত্যা করা হয়েছে। অনেক নারী ধর্ষিত হয়েছেন, মারাও গেছেন। এ অবস্থায় তাদের রাখাইন ছেড়ে আসা ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। এখনও যারা রাখাইনে রয়েছে তাদের জীবনরক্ষার ন্যূনতম সাপ্লাই নেই সেখানে। মিয়ানমার সরকার ২৫শে আগস্টের পর থেকে অনেক দিন রাখাইনে জাতিসংঘের অধীন সংস্থাগুলোকেও খাবার, পানি, ওষুধ পৌঁছানোর জন্যও ঢুকতে দেয়নি। অবশ্য অক্টোবরে এ বিধি নিষেধ কিছু শিথিল করতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। তারা ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামকে সেখানে খাবার নিয়ে যেতে দিয়েছে। কিন্তু সমালোচনা রয়েছে তারা যেখানে গেছে সেখান থেকে আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের অবস্থান অনেক দূরে। ফলে তাদের অনেকের কাছেই খাবার পৌঁছানো যায়নি। রাখাইনে থাকা আন্তর্জাতিক সংস্থা রেডক্রস বলছে, এখনও যেসব রোহিঙ্গা রাখাইনে রয়েছেন তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। রেডক্রসের মিয়ানমার ডেলিগেশনের প্রধান ফাবরিজ্জিও কারবনির মতে, রাখাইনের ভূ-প্রকৃতিই এর জন্য প্রধান অন্তরায়। সেখানে উঁচু পাহাড় রয়েছে। আছে নদী, জলাভূমি। আর মানুষগুলো (অর্থাৎ ভয়ার্ত রোহিঙ্গারা) রয়েছেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কারবনি শনিবার বেইজিংভিত্তিক একটি টেলিভিশন সিজিটিএনকে বলছিল, যখন তারা (ত্রাণকর্মীরা) একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে যান তখন তারা মানুষদের সমস্যাগুলো শুনতে পারেন। তার ভাষায় ‘আমি যা বুঝাতে চাই তা হলো এরা (রোহিঙ্গারা) অন্য সমপ্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন। তাছাড়া সেখানে সহিংসতার যে মানসিক প্রভাব তাও রয়েছে।’ রেডক্রস জোর দিয়ে বলেছে সেখানে তাদের মানবিক সহায়তা এখন খুবই জরুরি। কিন্তু তারা এটাও বলছে এটি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। কারবনি স্পষ্ট করেই বলেন, মানবিক সহায়তাই এ সংকটের সমাধান বিষয় নয়। এর একটি রাজনৈতিক সমাধান আসতে হবে। বাস্তুচ্যুত লোকজনকে তাদের ঘরে ফেরানো এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তার জন্য এটি জরুরি। সেখানে অবশ্যই সমপ্রদায়গুলোর মধ্যে রিকনসিলিয়েশন আনতে হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 55 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ