আল-কায়েদা ও আইএস: কতখানি ঝুঁকিতে আমরা?

Print
ইদানীং দেশে নানা ধরনের ঘটনা আর দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। এখনো শেষ হয়নি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। সেটাও এখন পানসে হয়ে গেছে। ওই নির্বাচন নিয়ে কোনো উত্তাপ নেই। হঠাৎ নিষ্প্রাণ সংসদ উত্তপ্ত হলো বিচারকদের অভিশংসনের আইনকে উচ্চ আদালত কর্তৃক সংবিধান পরিপন্থী রায় দেওয়ার পর। এসব সংবাদ ছাপিয়ে গেল জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর চূড়ান্ত বিবেচনায় ফাঁসির আদেশ বহাল থাকা। হারিয়ে গেল তনুর হত্যার তদন্ত। কিন্তু যা হারায়নি তা হলো বাংলাদেশে জঙ্গি বা ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রসার। এখন সিঙ্গাপুরে প্রবাসীদের কিছু সদস্য যোগ হয়েছেন বাংলাদেশে কথিত ‘হোম গ্রোন’ বা স্থানীয় পর্যায়ের সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে।

আমরা শুনি যে আমাদের দেশের জঙ্গিরা ‘হোম গ্রোন’, যাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নেই; কিন্তু ইতিমধ্যেই সিঙ্গাপুর যোগ হয়েছে। জুলহাজ মান্নানের হত্যার পর এ ধরনের তত্ত্ব মানতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র। সে দেশের জন্য তিনি (জুলহাজ) ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র। এই হত্যা ও পরবর্তী তৎপরতা মানতে পারল না যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। জন কেরির ব্যক্তিগত ফোন এবং নিশা দেশাইয়ের ঢাকা আগমন, বিভিন্ন জনের সঙ্গে আলোচনা আর বৈঠকের পর তিনি বলে গেলেন ‘হোম গ্রোন’ জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক গ্রুপের যোগাযোগ রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে। কিন্তু আমাদের জবাব একটাই, এই ‘হোম গ্রোন’ জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের সম্পর্ক নেই। ‘মরদ কা বাত হাতিকা দাঁত’।

এ পর্যন্ত যেসব হত্যা হয়েছে তার ধরন, কৌশল আর যাঁদের হত্যা করা হয়েছে, তার পেছনের কারণগুলোর বিশ্লেষণ করলে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তার সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের তথাকথিত দুটি জিহাদি গ্রুপের তত্ত্বের মিল রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের দিকেই নজর দিচ্ছে। জুলহাজ মান্নান, যিনি এ দেশের সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর ইনকোয়ারি নামের বেসরকারি সংস্থার আদর্শের আদলে কাজ করছিলেন, তাঁদের হত্যার দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট, মূল আল-কায়েদার উপমহাদেশের কথিত শাখা। পুলিশ সন্দেহ করছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে যারা পক্ষান্তরে আনসার আল ইসলামের একাংশের স্থানীয় সংস্করণ বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এই গ্রুপই অভিজিৎ হত্যার দায় স্বীকার করেছিল বলে পত্রপত্রিকায় প্রকাশ। অবশ্য এ পর্যন্ত ছকের মধ্যে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডগুলোর বেশির ভাগ, যার মধ্যে টাঙ্গাইলে হালে একজন হিন্দুধর্মাবলম্বী দরজির হত্যাও রয়েছে—এসবের দায়দায়িত্ব আইএস নিয়েছে বলে ‘সাইট’ নামক সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে আমাদের দেশসহ বিশ্বের সিংহভাগ গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। কাজেই আমাদের অঞ্চলেও মধ্যপ্রাচ্য তথা উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো বিশ্বের দুটি প্রতিযোগী ‘জিহাদি’ সংগঠনের প্রতিযোগিতার ছাপ প্রতীয়মান হচ্ছে।

আইএস অঞ্চলভিত্তিক সংগঠনের কোনো ঘোষণা দেয়নি, যেমনটা আল-কায়েদা এই উপমহাদেশে তাদের শাখা স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে শাখার কথা না বললেও আইএসের মুখপত্র দাবিক-এর ১৪তম সংস্করণে বাংলাদেশসহ বাংলা অঞ্চলে একজন আমির নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যার নাম শায়েখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। ওই সংস্করণে আইএসের হালের নিযুক্ত আমিরের প্রায় ছয় পৃষ্ঠার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। ওই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং উদ্যোগের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কী ধরনের টার্গেটের প্রতি তাদের নজর রয়েছে, তা-ও বিস্তারিত বলা হয়েছে। হালে আইএস দাবিক-এর বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করা শুরু করেছে। যাতে বাংলা ভাষাভাষী জনমানুষ তাদের এই মুখপত্র সাগ্রহে পড়ে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এই দুই তথাকথিত জিহাদি সংগঠনের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। বিবিসির সূত্রমতে, বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় হত্যা ও হামলার ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রায় ১৫টিতে আইএস তাদের সম্পৃক্ততার কথা বলেছে, অপরদিকে ৪টি হত্যার দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদার উপমহাদেশীয় শাখা। তবে এসব দায় স্বীকারকে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নাকচ করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং জেএমবির জড়িত থাকার কথা বলে।

আল-কায়েদা আর আইএসের প্রতিযোগিতা শুরু হয় আল-কায়েদার পূর্বতন কৌশল পরিবর্তনের পর। এই কৌশলগত পরিবর্তন শুরু হয় তিউনিসিয়াতে ২০১০ সালে আরব বসন্ত শুরু হওয়ার পর। ২০১১ সালের মধ্যে সমগ্র আরব বিশ্ব, বিশেষ করে লিবিয়া, মিসর, ইয়েমেন এবং সর্বশেষ সিরিয়ায় সরকার হটাও আন্দোলন শুরু হওয়ার পর। তত দিনে আল-কায়েদার অঘোষিত নেতৃত্ব চলে যায় আয়মান আল জাওয়াহিরির অনুসারীদের হাতে। আল-কায়েদা আরব বসন্তে সমগ্র আরব বিশ্ব তছনছ হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করে শাখা স্থাপন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আল-কায়েদা ইন মাগরেব, আল-কায়েদা ইন অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা এবং আল-কায়েদা ইন ইরাক। আল-কায়েদা ইন ইরাকের নেতৃত্বে ছিলেন জারকাবি। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর আল-কায়েদার নতুন নেতৃত্ব তাদের পুরোনো খোল পাল্টিয়ে ফেলে; যার বাইরে থেকে যায় জারকাবির নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদা ইন ইরাক। জারকাবি আল-কায়েদার নতুন কৌশল সমর্থন করতে পারেননি। আল-কায়েদা থেকে বের হয়ে ‘আল-কায়েদা ইন ইরাক’ রূপান্তরিত হয় ইসলামিক স্টেট রূপে এবং আল-কায়েদার নতুন কৌশলের বিপরীতে নিজেদের ভিন্নতর কৌশল তৈরি করে।

১৯৯৯ থেকেই জারকাবি ইরাকে অত্যন্ত স্বাধীনভাবে অভিযান পরিচালনায় আগ্রাসী হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে ইরাকের পতনের পর মূল আল-কায়েদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় ইরাকের আল-কায়েদা। জারকাবির মৃত্যুর পর ক্রমেই আইএস গড়ে ওঠে, শক্ত হতে থাকে ভিত; যখন সাদ্দাম হোসেনের সাবেক সামরিক বাহিনীর সুন্নি সদস্যরা যোগ দেয়। বর্তমানে আইএসের কৌশল আল-কায়েদা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এসব বিষয়ে যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁদের মতে আইএস এবং আল-কায়েদা উভয়ের লক্ষ্য এক হলেও তারা দুই ধারার গেরিলাযুদ্ধের কৌশল ধারণ করেছে। আল-কায়েদা মাও সে-তুংয়ের গেরিলা কৌশল ধারণ করে বিস্তার করছে। অপরদিকে অস্ত্র-অর্থ আর সিরিয়া ও ইরাকের কিছু ভূখণ্ডের দখলে থাকা আইএস চে গুয়েভারার ‘ফকোইস্ট’ (Focoist) কৌশল ধারণ করেছে। আর এই আগ্রাসী গেরিলা তত্ত্বের তাত্ত্বিক উদ্ভাবক ছিলেন ফ্রান্সের বিপ্লবী চিন্তাবিদ রেগিস ডেবরে (Regis Debray)। এই তত্ত্বকে শাণিত করেন গুয়েভারা কিউবার বিপ্লবে। ফকোইস্ট তত্ত্বের মূলমন্ত্র হলো সুযোগ বা পরিবেশ তৈরির অপেক্ষায় নয়, শক্তি সঞ্চয় করে টার্গেটের ওপর পূর্ণশক্তি দিয়ে আক্রমণ রচনা করতে হবে এবং বিভিন্ন আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। অপরদিকে মাও সে-তুং জনযুদ্ধের যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন তাতে প্রথমে জনগণকে সঙ্গে নেওয়ার এবং জনসমর্থনের, তা যত গৌণই হোক, প্রয়াস নিয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার পর চূড়ান্ত লক্ষ্যে যাওয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগ করা।

আল-কায়েদা বর্তমানে মাও সে-তুংয়ের গেরিলা কৌশল ধারণ করেছে বলে একাধিক গবেষণায় প্রতীয়মান। আল-কায়েদা বেশ সময় নিয়ে জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে অগ্রসর হওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। এই তত্ত্বে তারা ইয়েমেন ও লিবিয়াতে বেশ সাফল্য পেয়েছে। এই তত্ত্ব গ্রহণ করে সিরিয়াতে আল-নুসরা ফ্রন্ট, যারা আল-কায়েদার অংশ, অধিকৃত জায়গায় শরিয়াহ আইনকে অনেকটা শিথিল করে জনগণকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে। ওই সব জায়গায় যোদ্ধাদের প্রকাশ্যে ধূমপানের অনুমতি দিয়েছে; যা একসময় শরিয়াহ আইনের আওতায় আল-কায়েদা কর্তৃক হারাম ঘোষিত হয়েছিল। এমনকি জনগণের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার বা কোনো গর্হিত কাজ করলে কঠোর শাস্তির বিধান করেছে। এ ছাড়া পারতপক্ষে মুসলিম জনগোষ্ঠী, শিয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশিদের ওপরও অহেতুক আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া আছে। অহেতুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত না হওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আল-কায়েদার এই কৌশলে মাও সে-তুংয়ের তত্ত্বের মতো সঠিক পরিবেশ তৈরি ও সময়ের জন্য ধীরগতিতে এগোবার নীতি বলেই প্রতীয়মান হয়। আল-কায়েদার সমর্থক বিভিন্ন দেশের সংগঠনকে ওই দেশের সরকারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে এমন সব টার্গেট গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া আছে, যাতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তাদের বিরুদ্ধে না যায় এবং অন্তত মৌন সমর্থন পাওয়া যায়। অবশ্য আইএস আল-কায়েদার এ তত্ত্বকে অতি পুরোনো আর ধীরগতির মনে করে।

গবেষকেরা মনে করেন, আইএসের ফকোইস্ট তত্ত্বের বেশ কিছুটা সার্থকতার কারণ সিরিয়া ও ইরাকের পরিস্থিতি। সিরিয়া আর ইরাকের অবস্থার উন্নতি, বিশেষ করে সিরিয়ার সমস্যা সমাধানের ওপর নির্ভর করছে আইএসের ফকোইস্ট তত্ত্ব এবং অন্যতম জিহাদি গ্রুপ হিসেবে আইএসের টিকে থাকার বিষয়টি। সিরিয়ার পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আইএস দুর্বল হতে থাকলে আল-কায়েদার শক্তি বাড়বে। আল-কায়েদার তত্ত্ব ধীরে অগ্রসর হওয়া এবং জনগণের একাংশের সহানুভূতি অন্তত কিছুটা অর্জিত হলেই লক্ষ্য পূরণে বিভিন্ন টার্গেট অঞ্চলে চূড়ান্ত সংঘাতের সূচনার পথ ধরা।

যা-ই হোক এই স্বল্প পরিসরের এ বিশ্লেষণ হয়তো আল-কায়েদা এবং আইএসের মধ্যে তাত্ত্বিক ও রণকৌশলগত তফাতের বিশদ ধারণা দেবে না, তবে তথাকথিত এই দুই জিহাদি সংগঠনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে—যার জের পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দৃশ্যমান। বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার যেসব ঘটনা ঘটছে এবং ঘটনার দায়দায়িত্ব এই দুই সংগঠন যেভাবে স্বীকার করছে, তাতে মনে হয় আমাদের এ অঞ্চলে, বাংলাদেশসহ একধরনের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে এখনো আইএসের পতাকা যেমন দৃশ্যমান নয়, তেমনি হয়তো আল-কায়েদার শারীরিক উপস্থিতি নেই। তবে এই দুই জিহাদি সংগঠনের কৌশলগত ও আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ধারকেরা যে সংগঠিত রয়েছে, তা বিগত ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণ করলে একধরনের চিত্র ফুটে ওঠে। এখানেই আমাদের শঙ্কা। আমরা একধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি, তা উপলব্ধি করেই একে প্রতিহত করার কৌশল নিতে হবে।

এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷

hhintlbd@yahoo.com

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 42 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ