ঈদ যাত্রায় বাসের সংখ্যা কমানোর কারণ কী

Print

দেশের উত্তরাঞ্চলে ঈদের ছুটিতে যারা বাড়ি ফিরবেন, তাদের জন্য দুঃসংবাদ দিয়েছে বাস পরিবহন মালিক সমিতি। মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার অজুহাতে উত্তরাঞ্চলের ১৭ জেলায় ঈদযাত্রায় বাসের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছেন মালিকরা। তবে যাত্রীদের অভিযোগ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ‘বৈধতা’ নিতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
১৮ আগস্ট শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে সারাদেশের ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি। টিকিট বিক্রি শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উত্তরবঙ্গের ১৭টি জেলার বিভিন্ন রুটের ৩০ ও ৩১ অগাস্ট এবং ১ সেপ্টেম্বরের বাসের আগাম টিকেট শেষ হয়ে যায়। কাউন্টার ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন, সড়ক খারাপের কারণে এবার ঈদে উত্তরাঞ্চলে বাসের সংখ্যা অন্যান্য বছরের চেয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। বাস পরিবহন মালিক সমিতির সিদ্ধান্তকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কৌশল বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।
বাসের সংখ্যা কমানোর বিষয়ে সমর্থন করে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।
তিনি বলেন, রাস্তাঘাট খারাপের কারণে উত্তরবঙ্গে একটি গাড়ি ছেড়ে দিলে একদিন পরেও আসে না। অনেক সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। এ অবস্থায় গাড়িগুলো শিডিউল মেইনটেন করতে পারছে না।
কিন্তু যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, দুর্ভোগকে পুঁজি করে অতিরিক্ত ভাড়া নৈরাজ্য চালানোর জন্য এমন তারা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে এসে অর্ধেক ট্রিপ দেওয়ার বিষয়টি ভাড়া বেশি নেওয়ার একটা কৌশল হতে পারে বলে মনে করে উত্তরাঞ্চলের যাত্রীরাও।
হঠাৎ বাস মালিকদের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে সাথে কথা বলেন কয়েক বছর ধরে ঢাকায় বসবাসকারী পঞ্চগরের মুক্তা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বাসের সংখ্যা আগের মতো থাকলেই ঢাকার মানুষজন যেতে পারত না। ঈদের মধ্যে বাসের ছাদের ওপর চড়ে যাতায়াত করে মানুষ। কিন্তু এবার যদি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় তাহলে তো সংকট আর ঘনীভূত হবে।’
ঢাকার সানিডেইল স্কুলের ওই শিক্ষিকা আরও বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে ঢাকার সব লোকাল বাস মহাসড়কে উঠবে। ফিটনেসবিহীন বাসগুলো দূরপাল্লার যাত্রী বহন করবে। কিন্তু একবার ভেবে দেখা দরকার এতে নিরাপত্তার বিষয়টা কী হতে পারে! ঈদের আগে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ভাড়া বেশি নেওয়ার একটা কৌশলও হতে পারে বাস মালিক সমিতির।’
এ বিষয়ে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) পাবলিকেশন কাম ইনফরমেশন অফিসার জিয়াউল হক সরকার বলেন, ‘এমনিতেই বাস সংকট। আবার টিকিট কালোবাজারি তো আছেই। তবে এবার বাস অর্ধেক নামানোর বিষয়ে মালিক সমিতি যা বলছে সেটা আসলেই কতটুকু সত্যি সেটা দেখা দরকার। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার টিকিটের জন্য বেশি হাহাকার। টিকিট ছাড়ার প্রথম দিনেই নেই। অবাক ব্যাপার!’
বাসের ট্রিপ কমানো সাধারণ মানুষকে জিম্মির একটা কৌশল হতে পারে উল্লেখ করে বর্তমানে গাজীপুরে বসবাসকারী কুড়িগ্রামের বাসিন্দা জিয়াউল বলেন, ‘ঈদের সময় মানুষ তো বাড়িতে যাবেই। এসময় বাস বা ট্রেনে আলাদা বগির ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বাসের ট্রিপ কমিয়ে ফেলায় হাহাকার তো আরও বাড়বে!’ বাস কমানোর বিষয়টি মানুষকে দুর্ভোগে ফেলার মতো উপযোগী একটা সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন জিয়াউল।
ঈদের সময়ে বাসের অর্ধেক ট্রিপ কমিয়ে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, মালিকপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো নেই। কিন্তু মহাসড়কে তো কোনো বড় সমস্যা নেই। তাহলে কেন জেলা সদর পর্যন্ত বাস চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো না। আমরাও তো জানি কিছু রাস্তায় সমস্যা হয়েছে। ভেতরের রাস্তায় আমরা তো অন্যভাবেও যেতে পারব। কিন্তু তা না করে এমন সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিকতা দেখি না।’ এ সময় আরও বাস যোগ করা উচিত ছিল বলেন মনে করেন তিনি।
রাস্তাঘাটের সংকট দেখানো একটা কৌশল হতে পারে জানিয়ে জিয়াউল আরও বলেন, ‘প্রতিবার টিকিটের সংকট হয় এটা মালিকপক্ষ জানে। এবার তারা রাস্তা খারাপের একটা খোড়া অজুহাত দাঁড় করেছে। বিষয়টি নিয়ে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টদের তদারকি করা দরকার।’
ঈদ-যাত্রার বাস ট্রিপ অর্ধেক: অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কৌশল!
ঈদে বাড়ি ফেরার জন্য টিকিট সংগ্রহের জন্য কাউন্টারে জনগণ। ১৮ আগস্ট শুক্রবার রাজধানীর গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে ছবিটি তুলেছে ফোকাস বাংলা।
নাটোর থেকে ঢাকার উত্তরা এসে একটি কলেজে শিক্ষকতা করছেন আহমেদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঈদের মধ্যে তো বাসায় যেতেই হবে। এখন যদি গড়ির সংখ্যা কমে যায় তাহলে উত্তরবঙ্গের অনেকেরই ঢাকায় ঈদ করতে হবে। বিশেষ করে পোশাক শ্রমিকরা এতে ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হবেন। মালিক পক্ষ ঈদের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক করেননি। মানবিক দিক বিবেচনা করে হলেও মাস মালিক সমিতি এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে পারে।’
বাস মালিকরা ঈদের মধ্যে এমন দাবি থেকে সরে এসে সরকারের কাছে তারা যাবতীয় দাবি উত্থাপন করতে পারে বলে মনে করে তিনি। আহমেদ বলেন, সাধারণ জনগণকে বিপত্তিতে ফেলে কোনো কার্যক্রম তারা চালাতে পারে না। আবার হঠাৎ এমন ঘোষণা মালিক পক্ষের ভাড়া বাড়ানোর একটা অপকৌশলও হতে পারে।’
কিন্তু বিষয়টি এভাবে দেখতে নারাজ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।
কোনো মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি বন্ধ রাখে না দাবি করে এই পরিবহন নেতা বলেন, ‘কোনো মালিক গাড়ি বন্ধ রাখলে তো তারই ক্ষতি। বিভিন্ন জায়গায় তারও তো অভাব আছে। কিন্তু রাস্তাঘাটের সমস্যার কারণ গাড়ির মালিকরা অনেক কম টিকিট বিক্রির জন্য বলে দিয়েছেন। মনে করেন, আমরা একটা গাড়ির টিকিট বিক্রি করলাম। ধরে নিলাম গাড়িটি আট ঘণ্টা পরে ফিরে আসবে। সেই অনুপাতে দশ ঘণ্টা হিসাব করে টিকিট বিক্রি করা হলো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সেটা বিশ ঘণ্টাও আসছে না। তখন যাত্রীদের তো আরও ভোগান্তি হবে।’ এই কারণে এবার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাদের সংখ্যা কমানো ছাড়া বিকল্প কোনো কিছু নেই দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘অনবরত বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক জায়গায় পানিতে ডুবে আছে রাস্তাঘাট। এখানে সরকারেরও কিছু করার নেই। এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে কারও করার কিছু নেই।’
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন অভিযোগ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর তিনি বলেন, ‘আসলে সংকট সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো ভাড়া বৃদ্ধি। আমরা মনে করি, সংকটকে পুঁজি করে এই সময়ে বাণিজ্যকে তারা চালিয়ে থাকে। তারা দুর্ভোগকে পুঁজি করে অতিরিক্ত ভাড়া নৈরাজ্য করতে চায়।’
বাংলাদেশে গণপরিবহনের সংকট আছে উল্লেখ করেন তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে যাত্রীর তুলনায় গণপরিবহনের সংখ্যা অনেক কম। তার ওপর যদি ঈদের মধ্যেই বাসের সংখ্যা অর্ধেক কমিয়ে দেয় তাহলে এই সংকট তো আরও বিস্তৃত হবে।
‘পরিবহন সংকট হলে যাত্রীরা এমনিতেই বাসের ইঞ্জিনের ওপর, ছাদে যাতায়াত করে। এভাবে সংকট তৈরি করে সিটের বাহিরে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের সুযোগ দিচ্ছে মালিকরা। এখানেও তারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে। করাটা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।’ অর্থাৎ দুই-তিনটা ট্রিপে যা আয় করত সেটা একটা ট্রিপে আয় করার পরিকল্পনা নিয়ে পরিবহন মালিক সমিতি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সরকার যেনো বিষয়টি তদারকি করে।’
একই সাথে ঈদের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাস চলাচলের ব্যবস্থা করার জানান তিনি। কেউ গণবিরোধী, যাত্রীর স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে বিষয়টি মনিটরিং করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহবানও জানান যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 235 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ