একজন লড়াকু নারীর হাল খাতা

Print

বছর শেষে সবারই বোধ হয় শুধু বিগত বছরের নয় বরং পুরো জীবনের হিসেব নিকেষ মাথায় এসে ভর করে। কী পেলাম? কী হারালাম? কী করতে চেয়েছিলাম? কী করতে পেরেছি?

আমার নিজের বয়সের হিসাবটাই মাথায় আসে বেশি। সার্টিফিকেট বলে আমার বয়স ৪৬ কিন্তু আমার হিসেবে আমার বয়স নয়/দশের বেশি নয় কারণ প্রায় সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ভাববার, নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করবার, মতামত দেবার সাহস সঞ্চয় করেছি আমি ৩৭ বছর বয়সে। এর আগে সবাই কী বলবে, সমাজ কী চায়, ধর্ম কী নির্দেশ দেয় এসব ভাবনা আমার নিজের চিন্তার জগতকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রাখত।

আমার নতুন জন্ম কীভাবে ঘটেছিল সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, ঘটেছিল সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি তখন বাচ্চাদেরকে নিয়ে দেশে থাকি, আমার তথাকথিত সামাজিক স্বামী লন্ডনে থাকেন। তার সাথে প্রায় একবছরের বিচ্ছেদ আমার দেহে মনে একটা বিপ্লব ঘটিয়ে দিল যেন। নিজের কামরায় একা থাকি, দিন শেষে বাচ্চারা ছাড়া অন্য কারো আনাগোনা নেই আমার আশেপাশে। কী মুক্তি! কী স্বস্তি! ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

বন্ধনমুক্ত হবার চেষ্টা করেছিলাম আগেও, কিন্তু বিচ্ছেদের এই স্বস্তির দেখা তখনো মেলেনি কারন তখন আমার শিক্ষা বা উপার্জনক্ষমতা ছিল না। সমাজকে অগ্রাহ্য করতে হলে যেসব যোগ্যতা থাকতে হয় তার কিছুই ছিল না। কিন্তু এবার বিষয়টা অন্যরকম। এতোদিনে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছি, ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিয়েছি, মাসে দুই আড়াই লক্ষ টাকা উপার্জন করি। নিজের টাকায় কেনা গাড়ি নিজেই চালাই। কারো কথায় কান দিতে হয় না।

হয়তো একটু স্থূল শোনাতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তিই আরো অনেক মুক্তির পথ খুলে দিল। নির্ভয়ে নিজেকে নিয়ে, নিজের দু’টো বাচ্চাকে নিয়ে ভাবতে পারলাম প্রথম বারের মত। আমি কী চাই? আমার বাচ্চাদের কীসে মঙ্গল? তাদের জীবনে সবধরনের মুক্তির সম্ভাবনা এনে দিতে আমি কী করতে পারি? উত্তর ছিল- অনেক, অনেক, অনেক কিছু। এবং প্রথম পদক্ষেপ ছিল নিজেকে নিয়ে খুশি হতে পারা, নিজের মধ্যে সুখী থাকতে পারা।

এই সময় একটা ঘটনা ঘটল। সমস্ত কুয়াশা কেটে গেল। আমার সামনে একটা বিশাল বিস্ময়কর পৃথিবী যে পৃথিবী আমি আগে কখনো দেখিনি, আছে বলেই জানতাম না। একদিন স্কুলে আমার একজন সিনিয়র সহকর্মী হঠাত আমার দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে বলে উঠলেন, ‘তোমার কী হয়েছে? এতো সুন্দর লাগছে কেন তোমাকে? অসম্ভব, অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর! হঠাত করে এমন হয়ে গেলে কেমন করে?’

আমার বয়স তখন ৩৭ কিন্তু তখনকার ছবিগুলো দেখলে মনে হয় আঠারো/ঊনিশ। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘You’re what you eat.’ অর্থাৎ ফ্যাট খেলে ফ্যাট, স্বাস্থ্যকর জিনিস খেলে স্বাস্থ্যবান। আমার মনে হতে লাগল, আসলে ‘You’re what you think, you’re what you feel.’ ভাবনার মুক্তি, মনের আনন্দ আমার চোখে মুখে চুলে সমস্ত শরীরে উপচে পড়ছিল যেন।

সেই থেকে জীবনটা অন্যরকম। ভালো থেকে আরো ভালো’র দিকে গেছে সবকিছু। নিজের সব সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছি, দ্রুত নিয়েছি, কিন্তু এক ‘বন্ধু’কে বড় অংকের টাকা ধার দিয়ে টাকা এবং বন্ধুত্ব দুইই হারানো ছাড়া অন্য কোনো সিদ্ধান্ত আজ পর্যন্ত খারাপ হয়নি।

অনেক প্রতিকূলতা ও বাধার মুখে তথাকথিত সামাজিক স্বামীকে ডিভোর্স দিতে সক্ষম হলাম। সাহস করে লন্ডনে একটা বাড়িও কিনলাম। কাগজপত্র হবার পর একাই চাবি দিয়ে দরজা খুলে সেই বাসায় ঢুকে হাউমাউ করে কাঁদলাম কিছুক্ষণ কারণ আমার এই আনন্দ শেয়ার করার মত কেউ কাছে নেই। সেদিনই ভার্চুয়ালি পরিচয় হলো একজন অসাধারণ মানুষ অপুর সাথে। এক সপ্তাহ পর বাস্তবে সাক্ষাত, প্রথম দেখায় ভালোলাগা এবং আবার দ্রুত সিদ্ধান্ত। অপু বলেছিল সে ঠিক নিশ্চিত না আবার সংসার করতে চায় কী না। আমি বলেছিলাম, ‘আমি নিশ্চিত আবার সংসার করতে চাই না। আমরা সংসার করব না, জীবন শেয়ার করব।’ আমাদের দু’জনেরই দু’টো করে বড়বড় সন্তান আছে, এ নিয়েও অপুর দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না।

তারপর অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। আমরা সংসার করি না, শুধু একসাথে বাঁচি। নিজেদের সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করি, অন্যজনের সন্তানের প্রতি দায়িত্বপালনে পাশে দাঁড়াই। সবগুলো ছেলেমেয়েকেই মনে হয় মানুষ, যাদের দায়িত্বজ্ঞান আছে, মানবতাবোধ আছে, রসবোধ আছে। কে কার সন্তান আলাদাভাবে সারাক্ষণ মাথায় কাজ করে না। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোর জন্য অপেক্ষা থাকে যখন সবগুলো বাচ্চার পছন্দের খাবারগুলো টেবিলে সাজিয়ে দিতে পারি, ওরা গলাপর্যন্ত খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। তারপর বোর্ডগেম খেলা, অথবা টিভিতে মুভি লাগিয়ে দিয়ে সবাই মিলে সোফায় বসে অপুর নাক ডাকিয়ে ঘুমানো উপভোগ করা। জীবন কানায় কানায় এতোটাই ভরে গেছে যে মাঝে মধ্যে অপরাধ বোধ করি- সবাই কি আমাদের মত ভালো আছে? এমনটা ভালো নিশ্চয়ই থাকুক আমার সব বন্ধুরা, শত্রুরাও যেন থাকে।

জীবনের শুরুর দিকটা সমাজ হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছে সত্যি, তবু সংক্ষিপ্ত বাকিটা জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত সচেতনভাবে সুন্দর করে বাঁচতে পারার আনন্দে ঐশ্বর্যময়। বিশেষ করে গত একটা বছর খুব প্রোডাক্টিভ ভাবে কেটেছে। নিজের লেখা প্রথম নাটকের সফল মঞ্চায়ন, প্রথম বইয়ের প্রকাশ, প্রথম ইংরেজি উপন্যাস ‘মিনারা’জ মিরর’ শেষ করতে পারা, শিক্ষকতা এবং দোভাষীর কাজে নানাবিধ সাফল্য- সব মিলিয়ে ২০১৬/২০১৭ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দু’টো বছর। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হচ্ছে আমার মেয়ের নতুন চাকুরি, অপুর/আমার/ এবং আমাদের সন্তানদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের দৃঢ়তা ও গভীরতা বৃদ্ধি।

এই সময়ের মধ্যে কিছু যে হারাইনি এমন নয়, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ব্যথায় কাতরাতে হয়নি এমন নয়, কষ্টে বুক টনটন করে ওঠেনি এমন নয়, হতাশায় চারদিক অন্ধকার হয়ে আসেনি এমনও নয়। কিন্তু সেই গল্পগুলোতে হাঁক ঢাক করে জানান দেবার কিছু নেই। আশার এবং আনন্দের গল্পগুলোই ছড়িয়ে দিতে চাই। জানাতে চাই চেষ্টা করলে হবে, হতেই হবে।

একজনের একটা লেখায় পড়েছিলাম অতীত বদলানো যায় না কিন্তু বর্তমানকে সুন্দর করে বাঁচার মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য একটা চমৎকার অতীত সৃষ্টি করা যায়। একটা চমৎকার ২০১৮ কাটুক সবার, একটা সুন্দর অতীত সৃষ্টি হোক ২০১৯ এর জন্য।

 

জেসমিন চৌধুরী
লেখক: শিক্ষক, অনুবাদক ও নাট্যকর্মী

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 115 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ