এখন ইসলামী ব্যাংকের মালিক কে?

Print
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতে দেশের সবচেয়ে লাভজনক ব্যাংক হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা ইসলামী ব্যাংকে এখন বইছে বহুমুখী পরিবর্তনের হাওয়া। একদিকে পরিবর্তন হয়েছে মালিকানার, অন্যদিকে পরিবর্তন এসেছে ব্যবস্থাপনাতেও। আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানকে সরিয়ে সেখানে বসানো হয়েছে নতুনদের। শুধু তাই নয়, বিদেশি মালিকদের সরিয়ে এই ব্যাংকে এখন দেশি ব্যবসায়ীদের মালিকানা বাড়ছে। আবার ব্যাংকটির মৌলিক দর্শন বা জামায়াতে ইসলামীর দর্শন থেকেও বেরিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। আগে জামায়াত ঘরানার ব্যক্তিরা এই ব্যাংকটিকে নিয়ন্ত্রণ করতো, এখন সেই নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়িক গ্রুপ এস আলমের হাতে। ইসলামী ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

ইসলামী ব্যাংকের এসব পরিবর্তন ব্যাংক খাতের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আরাস্তু খান। তিনি নিজেও এই পালাবদলের হাওয়ায় ব্যাংকটিতে ঠাঁই পেয়েছেন। তিনি  বলেন, ‘আমরা আসার পর ইসলামী ব্যাংকে এখন অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যা আপনারা দেখছেন।’

প্রসঙ্গত, গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়। পুনর্গঠন করা হয় পরিচালনা পর্ষদ। পর্ষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোস্তফা আনোয়ারকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান করা হয় সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে। পদত্যাগে বাধ্য করানো হয় ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আবদুল মান্নানকে। নতুন এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয় ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডি মো. আবদুল হামিদ মিঞাকে। ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম। ব্যাংকের কোম্পানি সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের কোম্পানি সচিব জাহিদুল কুদ্দুস মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম, যিনি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

ব্যাংকপাড়ায় এখন একটাই আলোচনা, আর সেটি হচ্ছে এস আলম গ্রুপের পছন্দের তালিকা থেকে আবদুল হামিদ মিঞাকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা  বলেছেন, বর্তমানে ব্যাংকটিতে যা হচ্ছে, তার সবই হচ্ছে চট্টগ্রামভিত্তিক ওই ব্যবসায়িক গ্রুপের ইচ্ছা অনুযায়ী। এছাড়া গত কয়েক মাসে ওই ব্যবসায়িক গ্রুপের পছন্দের লোকদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে। ওই গ্রুপের তালিকা ধরে ধরে বদলি করা হয়েছে সহস্রাধিক কর্মকর্তাকে।

চলতি বছরের শুরুতে ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন দেখা গেলেও মূলত ২০১০ সাল থেকেই ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ওই সময়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সৌদি সরকারকে একটি চিঠি দিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে জামায়াত ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে মতামত নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে শেয়ার কিনতে থাকে স্থানীয় কিছু সরকার সমর্থক উদ্যোক্তা। একই সঙ্গে বিদেশিরাও শেয়ার ছেড়ে চলে যেতে থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার ছাড়তে থাকে। এসব শেয়ার কিনে নিতে থাকেন দেশি উদ্যোক্তারা।

এর আগে পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে জামায়াত-ঘনিষ্ঠদের। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৩ সালে। শুরু থেকেই এই ব্যাংকটির ওপর ছিল জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপক প্রভাব।

ইসলামী ব্যাংকের এই বহুমুখী পরিবর্তনকে অভ্যন্তরীণ বড় সংস্কার বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি  বলেন, ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বড় সংস্কার দরকার ছিল। দীর্ঘদিন ব্যাংকটি জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। এ পরিচয় থেকে বের হয়ে আসার জন্য যে প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে এতে সাধারণ মানুষদের কাছে ইসলামী ব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। তিনি এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসাবেই দেখছেন বলেও জানান।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার সময়ে ইসলামী ব্যাংকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দেশগুলোর বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ ছিল ৭০ শতাংশ। বর্তমানে তা ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। বিদেশিদের ওইসব শেয়ার কিনে নিয়েছেন দেশি ব্যবসায়ীরা। ফলে এই ব্যাংকে ক্রমেই বিদেশিদের অংশীদারিত্ব কমছে।

দুবাই ইসলামিক ব্যাংক ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে কেনা ইসলামী ব্যাংকের ১ কোটি ৩৭ লাখ ৩ হাজার ৫৪০টি শেয়ারের পুরোটা পাঁচ দফায় বিক্রি করেছে। ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে বাহরাইনভিত্তিক বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ার ছিল ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৪টি। দুই দফায় পুরো শেয়ার বিক্রি করে ওই বছরের অক্টোবরের মধ্যে নিজেদের বিনিয়োগের পুরোটা তুলে নিয়েছে ব্যাংকটি।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারী ছিল জর্ডান ইসলামিক ব্যাংক, কাতারের ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ করপোরেশন, দুবাই ইসলামিক ব্যাংক এবং বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক। কূটনৈতিক পর্যায়ে সরকারের দেওয়া নির্দেশনা এবং সাম্প্রতিক মনোভাবের কারণে নিজেদের কাছে রাখা সব শেয়ার ধাপে ধাপে ছেড়ে দিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। ইসলামী ব্যাংকে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর এখন কোনও শেয়ার নেই। এর মধ্যে দুবাই ইসলামিক ব্যাংক এবং বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে নিজেদের পুরো শেয়ার বিক্রি করেছে। তবে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার ছেড়ে দিয়েছে এ তথ্য জানা গেলেও তাদের শেয়ার বিক্রির কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

অবশ্য, এখনও ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ১৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে কুয়েত সরকারের চার প্রতিষ্ঠানের নামে। একইভাবে সৌদি আরবভিত্তিক ছয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি শেয়ার। আর ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রাজি ব্যাংকিং ও ইনভেস্টমেন্টের ইউসুফ আব্দুল্লাহ আল রাজির শেয়ার রয়েছে ৭.৫৮ শতাংশ।

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্লাটিনাম এনডেভার্স, প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল, ব্লু ইন্টারন্যাশনাল, এবিসি ভেঞ্চার, গ্রান্ড বিজনেস, এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং, হযরত শাহজালাল (র.) ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির নামে গত ৭ মাসে প্রায় ৭শ’ কোটি টাকার শেয়ার কেনা হয়েছে। যদিও গত ডিসেম্বরে হযরত শাহজালাল (র.) ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি তাদের সব শেয়ার বিক্রি করে দেয় বস্ত্র খাতের স্বল্প পরিচিত প্রতিষ্ঠান আরমাডা স্পিনিং মিলের কাছে। আর এই প্রতিষ্ঠানটির হাত ধরে ব্যাংকটির পর্ষদে ঢুকেছেন সরকারের সাবেক সচিব আরাস্তু খান, যিনি এখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

-বাংলা ট্রিবিউন

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 299 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ