এমফিল-পিএইচডি আবেদনকারীদের যোগ্যতা

Print

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ক্রমবর্ধমান মৌলবাদী ভোটের প্রভাব, শিক্ষা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অজ্ঞতার প্রভাব অথবা উদ্দেশ্যবাদীদের গুপ্ত প্রভাবে না হয় শিশুদের পাঠ্যবইতে নানা ধরনের ভুলভ্রান্তি বা অসঙ্গতি ঘটে গেছে এবং জনরোষের প্রতিক্রিয়ায় এরই মধ্যে সেগুলো শুধরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দুজন কর্মকর্তাকে শাস্তিও (ওএসডি) দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু উচ্চশিক্ষার উচ্চতর (গবেষণা) ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের দ্বারা বছরের পর বছর ধরে যে রকম অন্যায় ঘটে যাচ্ছে- সেটার কী হবে? সেই অন্যায়টি তারা করছেন এমফিল- পিএইচডি গবেষণার্থে আগ্রহীদের যোগ্যতা নিরূপণে। খোলাসা করে বলি :

বর্তমানে ঢাবি, জাবি, রাবি, চবিসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের আবেদনের যোগ্যতা বিবেচনায় পূর্বতন শ্রেণি-পদ্ধতির ক্ষেত্রে মাধ্যমিক/সমমান ও উচ্চ মাধ্যমিক/সমমান পরীক্ষার যে কোনো একটিতে প্রথম বিভাগ ও অন্যটিতে দ্বিতীয় বিভাগ (ন্যূনতম ৫০% নম্বর) এবং গ্রেডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রে মাধ্যমিক/সমমান ও উচ্চ মাধ্যমিক/সমমান পরীক্ষার যে কোনো একটিতে জিপিএ ৪.০ এবং অন্যটিতে জিপিএ ৩.৫০-কে ন্যূনতম গ্রেড পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে গ্রেডিং শুরুর প্রথমবার অর্থাৎ ২০০১ ও ২০০৩ সালের সঙ্গে তৎপরবর্তী বছরগুলোতে প্রযুক্ত গ্রেডিং-এর সমন্বয়করণে বিভিন্ন সময়ে যে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেগুলো মানা হচ্ছে না। অর্থাৎ ২০০১ থেকে শুরু করে ২০১৬ পর্যন্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উতরানো সকল শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত গ্রেডকে ‘এক’ করে দেখছে তারা। অথচ গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর বছরে (২০০১) এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশে জিপিএ ৫ পেয়েছিল যেখানে মাত্র ৭৬ জন, সেখানে ২০১৬ সালে জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ নয় হাজার ৭৬১ জন এবং এইচএসসি/সমমান পরীক্ষার গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর বছরে ২০০৩ সালে জিপিএ ৫ (চতুর্থ বিষয় ব্যতীত) পেয়েছিল মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী, সেখানে সদ্যবিদায়ী ২০১৬ সালে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৫৮ হাজার ২৭৬ জন শিক্ষার্থী। এই বিভেদটা বুঝে নিতে কাণ্ডজ্ঞানের সাধারণ প্রয়োগই যথেষ্ট ছিল। যাইহোক, সেটার অভাব থাকে বলেই সরকারকে একাধিকবার প্রজ্ঞাপন জারি করে এই গ্রেডিং বৈষম্যের মুসাবিদা করতে হয়েছে। উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন নং শিম/শাঃ ১১/১৯-১/২০০৭/১৭৪ অনুযায়ী বর্তমান প্রচলিত জিপিএ বা ক্ষেত্রমত, সিজিপিএর বিপরীতে পূর্বের এসএসসি বা সমমান এবং এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণি যথাক্রমে- জিপিএ ৩.০০ বা তদূর্ধ্ব প্রথম বিভাগ, জিপিএ ২.০০ থেকে ৩.০০-এর কম দ্বিতীয় বিভাগ, জিপিএ ১.০০ থেকে ২.০০-এর কম তৃতীয় বিভাগ নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জিপিএর ক্ষেত্রে মানবণ্টনে ভিন্নরকম পদ্ধতির প্রয়োগে বৈষম্যের সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা ০২-০৬-২০০৯ সালের প্রজ্ঞাপন ও গেজেটে ২০০১, ২০০২ ও ২০০৩ সালের এসএসসি/সমমান ও ২০০৩ সালের এইচএসসি/সমমান পরীক্ষায়  জিপিএ-৩.৫-কে প্রথম বিভাগের সমমান ধরা হয়েছে। এরপর ০২/০৩/২০১০ সালে জারি করা সংশোধিত গেজেটে সব সালের জন্য জিপিএ-৩ কে প্রথম শ্রেণির সমমান ধরা হয়েছে।

তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের এমফিল-পিএইচডি গবেষকদের জন্য গ্রেডিং পদ্ধতিতে যে ন্যূনতম ৩.৫ কে নির্ধারণ করেছে, সেখানে ৩.৫ কে পূর্বতন শ্রেণি-পদ্ধতির নিরিখে কোন মানের ক্যাটাগরিতে বিবেচনা করা হচ্ছে? শ্রেণি পদ্ধতিতে যেখানে এসএসসি ও এইচএসসির একটিতে প্রথম শ্রেণি আর অন্যটিতে দ্বিতীয় শ্রেণি পেলেই যোগ্য বিবেচনা করা হচ্ছে, সেখানে গ্রেডিং পদ্ধতিতে কেন সরকারি প্রজ্ঞাপন শিম/শাঃ ১১/১৯-১/২০০৭/১৭৪ অনুযায়ী শ্রেণির বিপরীতে গ্রেডকে বিবেচনা করা হচ্ছে না! সরকারি বিবেচনায় গ্রেড ৩ (৫১-৫৯%) এর বেশি পেয়েও কেন শিক্ষার্থীরা (২০০১ ও ২০০৩ সালের) এমফিল-পিএইচডিতে আবেদনের যোগ্যতা রাখবে না?

পুনরাবৃত্তির সুরে বলি, বর্তমানের লাখে লাখে জিপিএ ৫-এর সঙ্গে ২০০১ ও ২০০৩ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উতরানো শিক্ষার্থীদের জিপিএর তুলনা চলে না। সে জন্য এমফিল-পিএইচডির আবেদনপত্রে তাদের ক্ষেত্রে গ্রেডিং যোগ্যতার আলাদা বিধান উল্লেখ করার বিকল্প থাকে না। আবার এটা না করলে এ বিষয়ক সরকারি প্রজ্ঞাপনকেও অমান্য করা হয় এবং সে কারণে গবেষণায় আগ্রহী অজস্র মানুষের উচ্চশিক্ষার অধিকারকে তুচ্ছজ্ঞান করা হয়, যা ‘জাতির বিবেক’ বিবেচিত শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটেই প্রত্যাশিত না।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 185 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি