এ কেমন ভয়ঙ্কর খেলা শিশু কিশোরদের

Print

বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর। তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় রাজধানীর উত্তরা। এজন্য প্রায়ই তারা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে। রাজনীতি না করলেও রাজনৈতিক দলের মতোই মহড়া দেয় এলাকায়। অস্ত্র প্রদর্শন করে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে তৎপরতার কমতি নেই কারও। উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে স্কুলছাত্র আদনান কবির হত্যার পর এরকম দুটি গ্রুপ আলোচনায় এসেছে। তবে এরকম আরো চারটি গ্রুপ রয়েছে উত্তরায়। আধিপত্য বিস্তার নিয়েই এক গ্রুপ-অন্য গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই গ্রুপগুলো বেশ সক্রিয়। তারা অনেকক্ষেত্রে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করে একে অন্যকে হুমকি দেয়। গ্রুপের ছেলেরা একসঙ্গে খেলাধুলা, আড্ডা দেয়। মূলত খেলাধুলা-আড্ডা দেয়াকে কেন্দ্র করে এসব গ্রুপ গড়ে উঠলেও গ্রুপগুলো জড়িয়ে পড়েছে ভয়ঙ্কর সব অপরাধে। এই গ্রুপিং আর দ্বন্দ্বের জের ধরেই প্রাণ দিতে হয়েছে ভদ্র, নম্র হিসেবে পরিচিত কিশোর আদনানকে।
গত ৬ই জানুয়ারি উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের পার্কের সামনে আদনান হত্যার ঘটনা ঘটে। সোমবার সরজমিন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ওই সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের ১৫ নম্বর বাড়ির সামনে ‘ঘটনাস্থল’ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। সেখানে এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে। ওই রোডের কয়েক শ’ গজ দূরেই পার্ক। তার পাশে খেলার মাঠ। ওই মাঠেই আদনানের ওপর হামলা করা হয়। আশপাশের বাসিন্দারা দেখেছেন ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য। কিন্তু অজানা আতঙ্কে নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে চান না কেউ। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী জানান, সন্ধ্যার দিকে খেলা শেষে এ ঘটনা ঘটে। এসময় মাঠের বাইরে একটি দোকানের সামনে ছিল ওই শিক্ষার্থী। হঠাৎ করেই ‘ধর ধর’ বলে চিৎকার শুনতে পায় সে। তারপরই মাঠ থেকে বের হয়ে দৌড়ে ১০-১২ জন কিশোর-তরুণ ১৭ নম্বর সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলো। তারপর কি ঘটেছিলো তা দেখেনি ওই শিক্ষার্থী। যে বাড়ির সামনে এ ঘটনা ঘটে ওই বাড়ির প্রহরী আব্দুর রশীদ সেদিন অন্যত্র ছিলেন। তবে ঘটনাস্থলের অন্য পাশের ১৬ নম্বর বাড়ির প্রহরী আব্দুল আমির জানান, ‘মাগো মাগো বলে চিৎকার করছিলো কেউ। চিৎকার শুনেই ওপর থেকে দ্রুত নিচে নামেন তিনি। গেইট খুলে বাইরে বের হতে হতেই হামলাকারীরা চলে যায়। হামলাকারীদের একজনের হাতে হকিস্টিক দেখেছেন আব্দুল আমির। এরমধ্যেই ১৭ নম্বর বাড়ির সামনে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা কিশোর আদনানকে দেখে এগিয়ে যান। তার আগেই ১৭ থেকে ১৮ বছর বয়সী একটি মেয়ে দৌড়ে সেখানে আসে। মেয়েটি আব্দুল আমিরের সহযোগিতা চেয়ে বলে, ও আমার ভাই। ওরে হাসপাতালে নিতে হবে। হেল্প করুন প্লিজ। পরে একজন মহিলা, আব্দুল আমিরসহ তারা সবাই মিলে আদনানকে রিকশায় তুলেন।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আদনানের পিতা ব্যবসায়ী কবির হোসেন জানান, খেলা শেষে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো আদনান। তখন আদনানের দুই বন্ধু আনাস ও আরবার তার সঙ্গে ছিল। হঠাৎ করেই আগে থেকে ওত পেতে থাকা ১৫-১৬ জন সন্ত্রাসী ‘ধর ধর’ বলে হামলা চালায়। সঙ্গী দুজন তাৎক্ষণিকভাবে পালিয়ে গেলেও পালাতে পারেনি আদনান। আদনানকে দৌড়ে রাস্তায় আটক করে তারা। পরে কুপিয়ে, পিটিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কবির হোসেন বলেন, নৃশংসভাবে আমার ছেলেকে কোপানো হয়েছে। তার মাথায়-পিঠে সাতটি কোপ রয়েছে। ডান হাতের রগ কেটে ফেলা হয়েছে। আশপাশের লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখলেও কেউ তাকে রক্ষা করতে যায়নি। তবে সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার পর আদনানের বন্ধু আনাসের বোন মাহফুজা আক্তার মুনা ও পিঠা বিক্রেতা ফাতেমা বেগম তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
কবির হোসেন জানান, আসরের নামাজ পড়তে তিনি বের হচ্ছিলেন যখন তখন আদনানকে বাইরে যেতে দেখেছেন। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে খেলতে যাচ্ছিলো। প্রতিদিনই সে গরম কাপড় ও খেলার সরঞ্জাম নিয়ে খেলতে যায়। রোববার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে পুনঃভর্তি হওয়ার কথা ছিল। ওই সময়ে আদনানকে তিনি বলেছিলেন, ‘বাবা দেরি করো না। সন্ধ্যার আগে বাসায় এসো। তোমার চুল কাটতে হবে। রোববারে তোমার স্কুলে ভর্তি।’ আদনান বলেছিলো, ঠিক আছে বাবা। সন্ধ্যার আগেই আসবো।
সেই চুল আর কাটতে হয়নি। স্কুলে নতুন করে নতুন ক্লাসে ভর্তি হওয়া হয়নি তার। আর ফেরা হয়নি বাসায়। চিরদিনের মতো না ফেরার দেশে চলে গেছে আদনান। তার পিতা কবির হোসেন বলেন, সন্ধ্যার পর ফোনে খবর পাই আমার ছেলে লুবনা হাসপাতালে। তাকে কারা যেন কুপিয়েছে। দ্রুত ছুটে যাই। হাসপাতালে পৌঁছে দেখি আমার বাবা আর নেই। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যার সঙ্গে কথা বলেছি, সেই ছেলেকে ওরা মেরে ফেলেছে। কবির হোসেন বলেন, আমার ছেলে গ্রুপিং করতো না। খেলার জন্য অনেকের সঙ্গে মিশতো। তার সঙ্গীদের সঙ্গে বিরোধের জের ধরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। আদনান হত্যার পর থেকে ১২ নম্বর সেক্টরের পাঁচ নম্বর সড়কের বাসায় কেউ থাকেন না। সোমবার ওই বাসায় গিয়ে তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। পাঁচ নম্বর সেক্টরে আদনানের নানার বাড়ি। সেখানেই রয়েছেন তারা। ১২ নম্বর সেক্টরের বাড়ির নিচতলার বাসিন্দা নাসিমা আক্তার বলেন, ছেলেকে হারানোর পর থেকে তার স্কুলব্যাগটি আঁকড়ে ধরে দিন-রাত তার মা কান্নাকাটি করছেন। আদনানসহ তাদের তিন ভাইয়ের কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। অনেক ভদ্র, শান্ত প্রকৃতির ছিল আদনান। তবু কেন তাকে এভাবে হত্যা করা হলো তা বুঝতে পারছেন না তিনি।
সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন থেকেই নাইন স্টার ও ডিসকো বয়েজ উত্তরা গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছিলো। উত্তরার ১১ ও ৯ নম্বর সেক্টরে আধিপত্য ছিল ডিসকো গ্রুপের। অন্যদিকে ১২ ও ১৩ নম্বর সেক্টরে ছিল নাইন স্টার। নাইন স্টার গ্রুপের সঙ্গে ছিল আদনান। এই গ্রুপের অধিকাংশরাই ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মাইলস্টোনের ছাত্র। তারা প্রায় সবাই কিশোর। অন্যদিকে ডিসকো গ্রুপে রয়েছে রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মাইলস্টোনের ছাত্র। তারা প্রায় সবাই একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। তবে তাদের মধ্যে অনেক অছাত্র রয়েছে। গত বছর নাইনস্টার গ্রুপের রাজুর ওপর হামলা চালিয়েছিলো ডিসকো গ্রুপের সদস্যরা। তারপর থেকে দুটি গ্রুপের দ্বন্দ্ব ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করছিলো। কিছুদিন আগে ডিসকো গ্রুপ ১৩ নম্বর সেক্টরে শোডাউন করে। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে। ফেসবুকেই এক গ্রুপ অন্য গ্রুপকে হুমকি-ধামকি দিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছিলো বেশ কিছু দিন যাবৎ। এর জের ধরেই ৬ই জানুয়ারি নাইন স্টারের সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে হকিস্টিক ও লাঠিসোটা নিয়ে ১৩ নম্বর সেক্টরের খেলার মাঠের পাশে অবস্থান নেয় ডিসকো গ্রুপের সদস্যরা। এসময় নাঈমুর রহমান অনিক একটি সেলফি তুলে তা ফেসবুকে প্রকাশ করে। তার পরেই আদনানের ওপর হামলা চালানো হয়।
এলাকাবাসী জানান, এসব গ্রুপের ছেলেরা প্রত্যেকেই অভিজাত পরিবারের সন্তান। প্রায়ই রাতে তারা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায় এলাকায়। অনেকেই মদ পান। তাদের সম্পর্কে ভয়ে কথা বলতে চান না সাধারণ মানুষ। প্রায়ই তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একে-অন্যের ওপর হামলা চালায়। ডিসকো বয়েস উত্তরা, নাইনস্টার ছাড়াও অন্যান্য গ্রুপগুলো হচ্ছে- বিগবস, পাওয়ার বয়েস উত্তরা, নাইনএমএম বয়েজ উত্তরা ইত্যাদি।
আদনান হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারনামীয় আসামিরা হচ্ছে- নাঈমুর রহমান অনিক, সাদাফ জাকির, রায়হান আহম্মেদ সেতু, রবিউল ইসলাম, আক্তারুজ্জামান ছোটন, আহম্মেদ জিয়ান, নাজমুস সাকিব, নাফিজ মো. আলম। উত্তরায় সমবয়সীদের কাছে ডন হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের নাগোয়া সড়কের রফিকুল ইসলামের ছেলে নাফিজ মো. আলম। ঘটনার পর রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র নাফিজ মো. আলম ও সাদাফ জাকিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহীন জানান, একদিনের রিমান্ড শেষে নাফিজকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। বয়স আঠারোর কম হওয়ায় সাদাফ জাকিরকে কিশোর সংশোধনাগারে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। অন্যদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 254 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ