ওষুধের দাম যেসব কারণে বাড়ে

Print

ওষুধের দাম যেসব কারণে বাড়েকিছুদিন আগে প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. প্রাণগোপাল দত্ত বলেছেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকরা ওষুধ কম্পানি থেকে কমিশন নেওয়া বন্ধ করলে ওষুধের দাম ৪০ শতাংশ কমে যাবে। তার অর্থ হলো, ওষুধ কম্পানিগুলো চিকিৎসকদের ঘুষ বা কমিশন না দিলে মানুষ ১০০ টাকার ওষুধ ৬০ টাকায় কিনতে পারত।

ঔষধ প্রশাসনের এক সাবেক পরিচালকের তথ্য মোতাবেক, বাংলাদেশের ওষুধ কম্পানিগুলো তাদের মোট বিক্রির ১০ শতাংশ অর্থ চিকিৎসকদের ঘুষ বা কমিশন দেওয়া বাবদ ব্যয় করে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ওষুধ কম্পানিগুলোর মোট ওষুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। মোট বিক্রির ১০ শতাংশ হিসেবে প্রদত্ত কমিশনের পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চিকিৎসকদের বিভিন্নভাবে কমিশন দেয় ওষুধ কম্পানিগুলো। মজার ব্যাপার হলো, চিকিৎসকরা ওষুধ কম্পানি থেকে কমিশন পেলেও ওষুধ কম্পানিগুলো কমিশন বাবদ প্রদত্ত সব টাকা তুলে নেয় মানুষের পকেট থেকে। চিকিৎসকরা শুধু ওষুধ কম্পানি থেকেই কমিশন নেন না। তাঁরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো থেকেও মোটা অঙ্কের কমিশন পেয়ে থাকেন। আর এ কারণেই প্রায় সব চিকিৎসক রোগীকে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক টেস্টের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোনো কোনো ডায়াগনস্টিক টেস্টের পেছনে অসহায় দরিদ্র রোগীদের হাজার হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, চিকিৎসকদের এ ধরনের ঘুষ বা কমিশন বাণিজ্যের কারণে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে ঢালাওভাবে সব চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ প্রযোজ্য নয়। আমার জানাশোনা অনেক চিকিৎসক আছেন, যাঁরা এই কমিশন-বাণিজ্যকে সম্পূর্ণ অনৈতিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।ওষুধ কম্পানিগুলোর অনৈতিক ওষুধ বিপণন (Drug promotion) বহুকাল ধরে জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এই অনৈতিক ওষুধ বিপণনে চিকিৎসকদের পাশাপাশি সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করে থাকেন ওষুধ বিক্রেতা ও মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ বা বিক্রয় প্রতিনিধিরা। আগেই বলেছি, ওষুধ বিপণনের উদ্দেশ্য যদি হয় স্রেফ মুনাফা, তবে এ কারণে বড় ধরনের খেসারত দিতে হয় রোগীকে। বহু চিকিৎসক ওষুধ কম্পানি কর্তৃক প্রতারিত হয়ে অনেক সময় সুস্থ মানুষকে রোগী বানিয়ে ওষুধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন। আবার অনেক সুস্থ সবল মানুষ ওষুধ কম্পানির প্ররোচনায় পড়ে আরো বেশি সুস্থ, সবল ও সুন্দর জীবনের জন্য অপ্রয়োজনীয় ও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর ওষুধ গ্রহণ করে। এসব ওষুধকে বলা হয় লাইফস্টাইল ড্রাগ। ফুড সাপ্লিমেন্ট, ভিটামিন, টনিক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, স্থূলতা কমানোর ওষুধ, যৌন অক্ষমতা, মাথার টাক, মন চাঙ্গা করার ওষুধ—এসব ড্রাগের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে ওষুধের বিজ্ঞাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিজ্ঞাপন বৈধ হলে দেশে কোকা-কোলা, পেপসি, হরলিকস, কমপ্লান বা ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির মতো ওষুধ দেদার বিক্রি হতো।

আমাদের মনে রাখা দরকার, ভোগ্যপণ্য আর ওষুধ এক জিনিস নয়। ভোগ্যপণ্য জীবন রক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় বস্তু নয়। ওষুধ অত্যাবশ্যকীয় জীবন রক্ষাকারী বস্তু। সঠিক সময় সঠিক মাত্রায় সঠিক ওষুধটি প্রয়োগ না করলে কোনো কোনো অবস্থায় মানুষ মৃত্যুবরণ করতে পারে। মারাত্মক ও জটিল সংক্রামক রোগের কথাই ধরা যাক। জটিল সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ধ্বংসের জন্য আমাদের প্রয়োজন সঠিক মাত্রার গুণগত মানসম্পন্ন একদম সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক। অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচনে ভুল হলে রোগ ভালো হবে না, রোগীর ভোগান্তি বাড়বে, একসময় হয়তো রোগী মারাও যাবে। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো অবকাশ নেই। সংক্রামক রোগের ধরন যেমন ভিন্ন হয়, তেমনি অ্যান্টিবায়োটিকের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রেই উৎপাদকের জোরালো বিপণন ও চিকিৎসকদের অনৈতিক আচরণের কারণে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগের মাত্রা অতীতের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। শুধু ব্যবসায়িক কারণে আজকাল চিকিৎসকরা সাধারণ সংক্রামক রোগেও সস্তা ও ন্যারো স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকের (যেসব অ্যান্টিবায়োটিক বিস্তৃত পদের জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে না) পরিবর্তে নামিদামি ও পেটেন্টেড ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক রোগীকে প্রদান করছেন। কোনো কোনো সংক্রামক রোগে ন্যারো স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করলে ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক (যেসব অ্যান্টিবায়োটিক বিস্তৃত পদের জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে) প্রদান করে রোগ সারানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু রোগীকে শুরুতেই ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করা হলে এবং সে ওষুধ কাজ না করলে তখন হাতে আর কোনো বিকল্প থাকে না। সে জন্য আমরা বলে থাকি, কার্যকর ও অব্যর্থ অ্যান্টিবায়োটিকগুলো রোগীর দুঃসময়ের জন্য মজুদ রাখুন। কিন্তু চিকিৎসকরা অতিদ্রুত রোগ সারিয়ে রোগীর আস্থা ও সুনাম অর্জনের মাধ্যমে ব্যবসার প্রসার বাড়ানোর জন্য এবং কমিশন বাণিজ্যের কারণে অত্যন্ত দামি ও ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা শুরু করে থাকেন। তাঁরা খুব কমই ভাবেন ভুল ও নির্বিচার অপব্যবহারের কারণে জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেলে শেষ সম্বল হিসেবে তাঁরা কোন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন। ওষুধ কম্পানিগুলোর আক্রামণাত্মক প্রমোশন, চিকিৎসকের অনৈতিক ও অবিবেচনাপ্রসূত প্রেসক্রাইবিং এবং রোগীর আত্মচিকিৎসায় নির্বিচারে ব্যবহারের কারণে এরই মধ্যে বহু অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকারিতা হারিয়ে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেছে। এটি মানবসভ্যতার জন্য একটি মারাত্মক দুঃসংবাদ। আমরা মনে করি, হয়তো ভবিষ্যতে এমন একদিন আসবে যখন অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে অসহায়ভাবে রোগী মৃত্যুবরণ করবে। আর চিকিৎসকদের অসহায়ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না। শুনেছি, কয়েক দিন আগে মন্ত্রিসভায় সদ্য অনুমোদনপ্রাপ্ত ওষুধনীতি ২০১৬তে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না করার বিধান রাখা হয়েছে। এ ধরনের দাবি আমরা বহুদিন ধরে করে আসছি। তবে বিধান বা আইন করা এক জিনিস, আর তা বাস্তবায়ন করা কঠিন আরেক জিনিস। যে দেশে ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল মিশ্রিত বিষাক্ত সিরাপ খাইয়ে হাজারো শিশু হত্যা করা হয়, অথচ মামলা করার পরও অভিযুক্তরা সব খালাস পেয়ে যায়, সে দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করলে কী এমন গুরুদণ্ড হবে তা আন্দাজ করতে কষ্ট হচ্ছে।

ওষুধ কম্পানিগুলো বাজারজাত করার সময় ওষুধের ওপর বিভিন্ন তথ্য দিয়ে লিফলেট বা আকর্ষণীয় ফোল্ডার প্রকাশ করে। ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধি (মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ) এসব তথ্যসংবলিত কাগজপত্র চিকিৎসকদের মধ্যে বিলি করেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা এসব বিজ্ঞাপনের ফিরিস্তি পড়ার সময় ও সুযোগ পান না। বিক্রয় প্রতিনিধিরাই চিকিৎসকদের কাছে তাঁদের কম্পানির ওষুধের গুণাবলি ও কার্যকারিতার ফিরিস্তি উপস্থাপন করেন। ওষুধের লিফলেট বা বিজ্ঞাপনে প্রায়ই অতিরঞ্জিতভাবে ওষুধের গুণাবলি তুলে ধরা হয়। কার্যকর না হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো রোগে ওষুধটি খুব ভালো কাজ করে বলে দাবি করা হয়। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়া সম্পর্কে খুব কমই লেখা থাকে, বলাও হয়ে থাকে অতি অল্প। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসকরা যাচাই-বাছাই না করেই এসব ওষুধ প্রেসক্রাইব করা শুরু করেন। এতে রোগী বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথমত, ওষুধটি দামি হলে রোগীকে অধিক পয়সা ব্যয় করতে হয়, যেখানে সস্তায় একই মানের একই ওষুধ পাওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়ত, সব কম্পানির ওষুধের গুণগত মান সমান নয়। অর্থ বা উপহারের বিনিময়ে চিকিৎসক গুণগত মান যাচাই না করে কোনো ওষুধ প্রেসক্রাইব করলে রোগী শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র বিক্রয় প্রতিনিধি বা চিকিৎসকদের এসব অপকর্ম সমর্থন করে না। কিন্তু আমরা করি এবং অতিমাত্রায় করি। কারণ বাংলাদেশে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে চিকিৎসা, হাসপাতাল, ফার্মেসি, ওষুধ কেনাকাটা, আদান-প্রদান ও নিয়ন্ত্রণ—সব কিছুতেই চিকিৎসকদের মনোপলি বা একচেটিয়া রাজত্ব।

ড. শ্রীনাথ রেড্ডির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের এক বিশেষজ্ঞদল সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখতে পেয়েছিল যে ২০০৮-০৯ সালে ভারতের বার্ষিক বিক্রির ২৫ শতাংশ অর্থ ওষুধের বিপণনে ব্যয় করে, যেখানে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখে মাত্র ৭ শতাংশ। সমীক্ষায় বলা হয়, ভারতের বাজারে প্রায় ৯০ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ প্রচলিত আছে। এসব ওষুধের মধ্যে বেশির ভাগই হলো অযৌক্তিক, অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ। ভারতের ১০টি শীর্ষস্থানীয় ওষুধের (যেগুলোর বিক্রির পরিমাণ মোট ওষুধ বিক্রির ১০ শতাংশের কাছাকাছি) রয়েছে মাল্টিভিটামিন, কফ সিরাপের অযৌক্তিক মিশ্রণ ও একটি লিভারের ওষুধ, যার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়নি। ১৯৯৯ সালে বিক্রি করা ২৫টি শীর্ষস্থানীয় ওষুধের মধ্যে বেশির ভাগ ছিল রক্তের টনিক, কফ সিরাপ, লিভারের ওষুধ, ব্যথানাশক, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, হজমিকারক এনজাইম ইত্যাদি। আমাদের ওষুধশিল্পও কোনোভাবেই বা কোনো দিক থেকে ব্যতিক্রম নয়।

ভিটামিনের বিজ্ঞাপন বা প্রচারে অতীতে (হয়তো এখনো) অনেক আজগুবি কথা শোনা যেত। ওষুধ কম্পানিগুলো ভিটামিন প্রমোশনে বিশেষ করে টার্গেট করে শিশু ও বৃদ্ধদের। মা-বাবারা সব সময়ই সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। কোনো ওষুধ কম্পানি যদি দাবি করে, তাদের উৎপাদিত ভিটামিন শিশুদের মেধা বিকাশে সাহায্য করে, বয়োবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, পড়াশোনায় মনোযোগী করে, তবে মা-বাবা সন্তানের জন্য অবশ্যই সেই ভিটামিন ক্রয় করবেন দাম ও আজগুবি কার্যকারিতার কথা বিবেচেনায় না নিয়েই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রোগ চিকিৎসায় রোগী চিকিৎসকের কাছে গেলে তাঁরা প্রয়োজনীয় ওষুধের সঙ্গে প্রেসক্রিপশনে একাধিক অপ্রয়োজনীয় ওষুধ জুড়ে দেন। একবার আমার ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছিল। দু-এক জায়গায় আমি তা লিখেছিলামও। ইউরিক এসিড বেশি বলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গিয়েছিলাম। আমি যে একজন ফার্মাসিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তা চিকিৎসককে বুঝতে দিইনি। তিনি প্রেসক্রিপশনে দুটি ওষুধের নাম লিখলেন, যার মধ্যে একটি ছিল এসলোরিক (জেনেরিক : অ্যালোপিউরিনিল) এবং অন্যটি নামিদামি মাল্টিভিটামিন। এসলোরিক প্রেসক্রাইব করা ছিল একদম পারফেক্ট। কিন্তু মাল্টিভিটামিনের প্রয়োজন কী তা বুঝে উঠতে পারলাম না। আমি সুস্থ-সবল মানুষ, কোনো সমস্যা নেই, ভিটামিনের ঘাটতি আছে তা-ও নয়। তার পরও কেন এই অযৌক্তিক ভিটামিন, তা চিকিৎসকের কাছে জানতে চাইলাম। তিনি বলছিলেন, ভিটামিনটা ভালো, খেতে থাকুন উপকার দেবে। আমি মানতে নারাজ। নাছোড়বান্দার মতো আমি জানতে চাইলাম, কী উপকার এই ভিটামিন থেকে আমি পাব? তিনি অনেকটা খেপে গিয়ে যা বললেন তার মর্মার্থ হলো, তিনি চিকিৎসক বলে ভিটামিনটি সম্পর্কে সব জানেন। আমি অজ্ঞ মানুষ, ওষুধ সম্পর্কে আমার ধারণা কম। তাই তর্কে যাওয়া আমার ঠিক হচ্ছে না। এবার আমি আমার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করলাম। আমার পরিচয় পেয়ে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং সবিনয়ে প্রেসক্রিপশনটি চেয়ে নিয়ে ভিটামিনটি কেটে দিলেন। আমি বললাম, আপনি আমার পরিচয় পেয়ে আত্মরক্ষা বা দুর্বলতা ঢাকার জন্য অপ্রয়োজনীয় ভিটামিনটা বাদ দিলেন, একজন অজ্ঞ, অশিক্ষিত শ্রমিক, কৃষক বা সাধারণ রোগী হলে আপনি কী করতেন? চিকিৎসক মহাশয় সেদিন আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি। চিকিৎসকদের এই অনৈতিক মানসিকতার পেছনে যা কাজ করে তা হলো লোভ, লালসা ও নিজের ব্যক্তিত্ব, মানবিকতা, নৈতিকতা, আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা বোধের কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অধিক থেকে আরো অধিক উপার্জনের মনোবৃত্তি। না হলে একজন চিকিৎসক কী করে একটি ওষুধ প্রেসক্রাইব করার বিনিময়ে ওষুধ কম্পানির কাছ থেকে বউয়ের জন্য একটি শাড়ি বা গয়না গ্রহণ করতে পারেন। একটি পারফিউম বা ফুলদানির জন্য একজন অসহায় দরিদ্র সাধারণ মানুষ, যে অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে একজন চিকিৎসকের কাছে যায় সুচিকিৎসা পাওয়ার আশায়, এ ধরনের একজন মানুষের ক্ষতি একজন চিকিৎসক কিভাবে করতে পারেন! বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে জানা যায়, ওষুধ কম্পানির কাছ থেকে চিকিৎসকরা (সব চিকিৎসক নন) যেসব উপঢৌকন পান, তার মধ্যে রয়েছে নগদ টাকাপয়সা, বড় অঙ্কের টাকার চেক, গয়না, দামি কাপড়চোপড়, পারফিউম, অফিস ভাড়া, অফিস ডেকোরেশনের খরচ, চেম্বারের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও যন্ত্রপাতি, বিদেশ ভ্রমণের টিকিট, বিদেশে অবস্থানকালে হোটেল ভাড়া, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, টেলিফোন, ফ্রিজ, টেলিভিশন, এয়ারকুলার ইত্যাদি। আমার সামনে ঘটে যাওয়া আরো একটি ঘটনা উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। বেশ কয়েক বছর আগে এক চিকিৎসক এক বিক্রয় প্রতিনিধির কাছ থেকে একটি ক্রিস্টাল ফুলদানি গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে সেই কম্পানির লোসার্টান পটাশিয়ামের ব্র্যান্ড নামটি (উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ) লিখে দিলেন এক রোগীর প্রেসক্রিপশনে। আমি হতবাক হয়ে গেলাম। মজার ব্যাপার, সেই ওষুধের ব্র্যান্ড নামটিও চিকিৎসক জানতেন না। বিক্রয় প্রতিনিধির কাছ থেকে জেনে নিয়ে নামটি প্রেসক্রিপশনে লিখলেন। ওপরে উল্লিখিত লোভনীয় জিনিসপত্র ছাড়া প্রত্যেক চিকিৎসক ওষুধ কম্পানি থেকে ফ্রি স্যাম্পল হিসেবে অসংখ্য ওষুধ পেয়ে থাকেন। আমি বুঝি না, এসব ওষুধ দিয়ে চিকিৎসকরা কী করেন! শোনা যায়, তাঁরা এসব ওষুধ বিক্রি করে নগদ টাকা উপার্জন করেন। তবে অনেক চিকিৎসক গরিব রোগীদের এসব ওষুধ দান করেন বলেও শোনা যায়। আমরা যতই বলি না কেন, সব মানুষকে এক কাতারে অবশ্যই ফেলা যায় না, ফেলা উচিতও নয়।

তবে ওষুধ কম্পানি, চিকিৎসক, বিক্রয় প্রতিনিধিদের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হওয়া দরকার। ওষুধ প্রমোশনে কোটি কোটি টাকা খরচের ভারটা রোগী বা ওষুধ ক্রেতাকেই বহন করতে হয়। এতে ওষুধের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। চিকিৎসকদের অজ্ঞতা, অবহেলা বা পড়াশোনার অভাবে নকল, ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধও রোগীর হাতে পৌঁছে যায় ওষুধ কম্পানি ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

প্রতিদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব দিকের রাস্তায় অসংখ্য বিক্রয় প্রতিনিধির তত্পরতা আমার চোখে পড়ে। সারা দেশে একই অবস্থা বিরাজ করছে। ওষুধ কম্পানি, চিকিৎসক ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের এই অশুভ ও অনৈতিক তত্পরতা নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। ভারতে এ ব্যাপারে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। কোনো চিকিৎসক উপহার নিলে তাঁর চিকিৎসা সনদ বাতিল করার বিধান রাখা হচ্ছে বলে শুনেছি। যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে, ওষুধের বিজ্ঞাপনে ওষুধ কম্পানিগুলো বছরে কত টাকা খরচ করে তা প্রকাশ করতে হবে, ভুতুড়ে লেখক দিয়ে কোনো ওষুধের ওপর প্রবন্ধ লেখা হয় কি না তা জানাতে হবে। এ ছাড়া গবেষণার নামে ওষুধ কম্পানিগুলো চিকিৎসকদের কত টাকা প্রদান করে, কনসালটেশন ফি বাবদ ব্যয় কত, যাতায়াত ও আপ্যায়নে কত খরচ হয় তা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা বহাল করার চিন্তাভাবনা চলছে।

অনৈতিক ওষুধ বিপণন বন্ধে সরকারের কোনো উদ্যোগ আছে বলে অতীতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশের অসংখ্য পত্রিকায় এ ব্যাপারে অনেক প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে, প্রতিকারের উপায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ অরাজকতা বেশিদিন চলতে দেওয়া যায় না। চিকিৎসাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবন করে সরকার জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের। নতুন ওষুধনীতিতে এ ধরনের কোনো দিকনির্দেশনা আছে কি?

লেখক :মুনীরউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক, ফার্মাসি অনুষদ, ঢাবি

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 257 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ