ওষুধ কোম্পানির মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন নিয়ে নানা প্রশ্ন

Print
পরিদর্শন করা হয়নি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কোম্পানি * সুপারিশের ২০ কোম্পানির ১৭টি আগে থেকেই বন্ধ * অভিযোগ ভিত্তিহীন : বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান

ওষুধ কোম্পানির মূল্যায়ন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রতিবেদনে লাইসেন্স বন্ধে সুপারিশকৃত ২০ কোম্পানির বেশির ভাগই অনেক দিন আগেই বন্ধ করে দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর।

এছাড়া সুনির্দিষ্ট কিছু কোম্পানি কয়েকটি গ্রুপের ওষুধ উৎপাদন করতে পারবে না- এ মর্মে সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।1_142710

এক্ষেত্রে যেসব কোম্পানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এর কয়েকটির দাবি- সংশ্লিষ্ট গ্রুপের ওষুধ উৎপাদনের লাইসেন্স নেই তাদের। এমনকি উৎপাদন সংক্রান্ত কারিগরি সক্ষমতা বা কোনো প্ল্যান্টও নেই সেসব কোম্পানির।

জিএমপি (গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস বা উত্তম উৎপাদন কৌশল) নীতিমালা অনুসরণ না করায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর উৎপাদনের অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করেছে বিশেষজ্ঞ দল। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানাধীন অনেক কোম্পানি এ নীতিমালা অনুসরণ না করলেও তাদের নাম প্রতিবেদনে আসেনি। প্রতিবেদনটি দায়সারা গোছের হয়েছে বলে মন্তব্য করে কয়েকটি কোম্পানি আবার পরিদর্শন করে নিরপেক্ষভাবে প্রতিবেদন দিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, এ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও শিল্প সমিতিতে আবেদন করেছে কয়েকটি কোম্পানি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, একটা প্রতিবেদন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। আমরা আমাদের মতো পরিদর্শন করেছি। যাদের বিরুদ্ধে সুযোগ-সুবিধা উন্নত করার মতামত দেয়া হয়েছে তারা প্রতিবেদনের বিরুদ্ধাচরণ করতেই পারে। অধ্যাপক ফারুক বলেন, দেশের মানুষ উন্নতমানের ওষুধ চায়। সেটা নিশ্চিত করতেই এই প্রতিবেদন। এক্ষেত্রে যারা মান নিশ্চিত করতে পারবে না তাদের উৎপাদনে না থাকাই ভালো। তবে প্রতিবেদনের বিষয়ে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেসব বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গত ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ১০ম বৈঠকে দেশের ৮৪টি ওষুধ কোম্পানির কারখানা পরিদর্শন সম্পর্কিত প্রতিবেদনের ওপর আলোচনা হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান বৈঠকে বলেছেন, যে ২০টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করার বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে ১১টি কোম্পানিকে আগেই সাসপেন্ড করা হয়েছে, ৬টি কোম্পানি নিজ থেকে বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৩টি কোম্পানি কোর্টে মামলা করে ফ্যাক্টরি চালু রেখেছে। তিনি আরও জানান, প্রতিবেদনে ইন্দো-বাংলা ফার্মা লিমিটেড দ্বিতীয় গ্র“পে আছে। এটি প্রথম গ্রুপে (নিবন্ধন বাতিলের তালিকা) আসা উচিত ছিল। কারণ ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ওষুধ প্রশাসন এরই মধ্যে ১১টি মামলা করেছে। তারা কোর্টে মামলা করে ফ্যাক্টরি চালু রেখেছে। বিশেষজ্ঞ দলের মূল্যায়নে এই কোম্পানি দ্বিতীয় গ্রুপে স্থান পেয়েছে।

দেশের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি পরিদর্শন করে জিএমপি মূল্যায়ন করতে ২০০৯ সালে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুককে পরিদর্শন দলের প্রধান করা হয়। দেশের ৮৪টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটির কাছে জমা দেয় বিশেষজ্ঞ দল। ওই প্রতিবেদনে ২০টি ওষুধ কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল, ১৪টির সব ধরনের এন্টিবায়োটিক উৎপাদন অনুমতি বাতিল এবং ২২টির পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপের এন্টিবায়োটিক উৎপাদন বাতিলে সুপারিশ করা হয়।

বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯ এপ্রিল সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন টেকনো ড্রাগসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ জালাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি লিখিত অভিযোগে বলেন, পত্রিকায় বিশেষজ্ঞ দলের যে ৫ সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে অধ্যাপক আ ব ম ফারুক তার কারখানা পরিদর্শনে যান। তাও আবার বিকেল ৫টার পরে এবং তিনি ভেতরে প্রবেশ না করেই ফিরে আসেন। তিনি সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে প্রশ্ন করেন, একটি ওষুধ কারখানা এ ধরনের পরিদর্শন করে কোনো রিপোর্ট প্রদান করা যায় কিনা। এছাড়া তিনি এই রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, যে কোনো নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দিয়ে কারখানা পরিদর্শন করার পর একই রিপোর্ট পাওয়া গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারখানা বন্ধ করে দেবেন।

এ প্রসঙ্গে টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ জালাল উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, গত ২৩ জানুয়ারি ২০১০-এ সংসদীয় বিশেষজ্ঞ দল প্রথম পরিদর্শনের পর টেকনো ড্রাগসে জিএমপি নীতিমালা অনুযায়ী চলনসই বলে অনুমোদন দেয়। সেই সঙ্গে আরও অধিকতর জিএমপি উপযোগী ওষুধ উৎপাদনের যেসব শর্ত প্রয়োগ করেছিল তা গত ৫ বছরে অধিকাংশই পূরণ করা হয়। কিন্তু ২০১৫তে এসে বিশেষজ্ঞ দল কী কারণে এ ধরনের মন্তব্য করেছেন তা আমার বোধগম্য নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গণমাধ্যমে সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পক্ষ থেকে টেকনো ড্রাগস পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনের নেতৃত্ব দেন অধিদফতরের পরিচালক মো. রুহুল আমিন। এই পবিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের কার্যাদি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাদি কারখানায় বিদ্যমান আছে।

এছাড়া গত ২৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী বরাবর একই ধরনের লিখিত অভিযোগ করেছেন এমএসটি ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম তসলিম হাসান। তিনি অভিযোগে বলেন, বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদনে কারখানার প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত হয়নি। কারখানায় ওষুধ উৎপাদনের সর্বাধুনিক সুবিধা রয়েছে। এ কারণে বিশেষজ্ঞ দল দু’বার নেতিবাচক মন্তব্য করলেও ওষুধ প্রশাসন প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে আমাদের অব্যাহতি দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এমএসটি ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম তসলিম হাসান যুগান্তরকে বলেন, বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন দায়সারা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, ১৫ বিঘা জায়গার ওপর বিদেশী বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কারখানা, যেখানে উচ্চ পর্যায়ের সব সুবিধা বিদ্যমান। কিন্তু রাত ৮টায় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় স্বল্প সময়ে কারখানা পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞ দল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, ওষুধ প্রশাসন এই কারখানার জিএমপিতে সন্তুষ্ট হয়ে ওষুধ এক্সপোর্টের অনুমতি দিয়েছে।

প্রতিবেদনে টঙ্গীতে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালসে ২০১৪’র ৮ ডিসেম্বর তৃতীয়বারের মতো সংসদীয় বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, এই কারখানায় শুধু হেমোডায়ালাইসিস ফ্লুইড, ক্লোরহেক্সিডিন এন্টিসেপটিক এবং সেট্রিমিড এন্টিসেপটিক উৎপাদন করা হয়। অর্থাৎ সেখানে কোনো ধরনের পেনিসিলিন অথবা সেফালোস্পোরিন গ্রুপের এন্টিবায়োটিক এবং হরমোন জাতীয় কোনো ওষুধ উৎপাদন করা হয় না। তাছাড়া ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকেও ওই ধরনের কোনো ওষুধ উৎপাদনের অনুমোদনও নেই। কিন্তু সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনের মতামতে বলা হয়েছে, কারখানার সমস্যাগুলো দূরীকরণ সাপেক্ষে পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপের এন্টিবায়োটিক এবং স্টেরয়েড/হরমোনজাতীয় ওষুধ ছাড়া অন্য ওষুধ উৎপাদনের সুপারিশ করা যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী যুগান্তরকে বলেন, আমরা শুধু ইলেক্ট্রোলাইট ফ্লুইড উৎপাদন করে থাকি। অন্য কিছুই আমরা উৎপাদন করি না। তাছাড়া বিশেষজ্ঞ দল আমাদের কারখানার বিরুদ্ধে এ ধরনের মতামত কীভাবে দিয়েছেন বুঝতে পারছি না।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, সংসদীয় কমিটির বিশেষজ্ঞ দল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কারখানাগুলো পরিদর্শন করেনি। এমনকি কয়েকটি ওষুধ কারখানা জিএমপি নীতিমালা অনুসরণ না করা সত্ত্বেও তাদের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ দল ছিল উদাসীন। এর মধ্যে হাডসন ফার্মাসিউক্যালসসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানি রয়েছে। হাডসন ফার্মাসিউক্যালস লিমিটেডের মালিক এসএম শফিউজ্জামান ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব। এমনকি দেশের বড় কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির দু-একটি ইউনিট সনাতন পদ্ধতিতে জিএমপি নীতিমালা ছাড়াই ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করে থাকে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ দল এসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে যাননি বা কোনো মন্তব্যও করেননি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব হাডসন ফার্মাসিউক্যালস লিমিটেডের মালিক এসএম শফিউজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়। তাছাড়া আমার কারখানার কোনো ওষুধ ড্রাগ টেস্টিং ল্যাব থেকে মানহীন হিসেবে কখনও ফেরত আসেনি। তিনি বলেন, একটি বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় কমিটি এই বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে। তারা কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশের পর বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রতিকার চেয়ে সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

বিশেষজ্ঞ দলের জিএমপি-মূল্যায়নবিষয়ক প্রতিবেদনের অসঙ্গতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো. রুহুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, এই কমিটির প্রতিবেদন সম্পর্কে অধিদফতর কোনো মন্তব্য করতে পারে না। প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয় নীতিগতভাবে গ্রহণ করেছে। তবে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 129 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ