করের টাকায় টিকে আছে ৪ ব্যাংক

Print
চরম খারাপ অবস্থায় আছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চারটি ব্যাংক। সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ নষ্ট করে এখন টিকে আছে সাধারণ জনগণের করের টাকায়। তবে মূলধন জোগান দিয়েও অবস্থার উন্নতি ঘটানো যাচ্ছে না সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের।

গত দুই বছরে ব্যাংক চারটিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার মূলধন দেওয়া হয়েছে। তারপরও মূলধন সংকটে আছে ব্যাংকগুলো। পাশাপাশি বাড়ছে খেলাপি ঋণ, বাড়ছে লোকসানি শাখাও। সামগ্রিকভাবেই বিভিন্ন আর্থিক সূচকে সংকটজনক পর্যায়ে আছে সরকারি ব্যাংকগুলো।মূলত পুরোনো খেলাপি ঋণই খেয়ে ফেলছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মুনাফার বড় অংশ। এর সঙ্গে গত কয়েক বছরে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন ঋণ কেলেঙ্কারি। পতন ঠেকাতে সরকারি চার ব্যাংকে গত নভেম্বরে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তাতেও অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। এখন নতুন করে সরকারের কাছে আরও মূলধন চেয়েছে তারা।
বর্তমানে চার সরকারি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আর মূলধনের ঘাটতি ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর বাইরে এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো মিলে ১৮ হাজার ১৬২ কোটি টাকা অবলোপন করেছে, যা মোট খেলাপি ঋণের চেয়েও বেশি।
আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলে বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রতি বৃহৎ ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সুবিধা সিংহভাগই দিয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংক।
মূলধন ঘাটতি ও ঋণখেলাপির পাশাপাশি চার ব্যাংকের লোকসানি শাখাও বাড়ছে। বর্তমানে চার ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১৮৩টি। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১২৪টি, অগ্রণী ব্যাংকে ৩৪টি, জনতা ব্যাংকে ১৫টি এবং রূপালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১০টি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন। বারবার মূলধন জোগান দিয়ে তো আর ঠিক করা যায় না। এসব ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে কঠোর হতে হবে, বারবার পুনর্নিয়োগ দেওয়া যাবে না। লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে প্রয়োজনে পুরো পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাতেই পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর হতে হবে।
২০১৫ সালের আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশই খেলাপি। আরও সহজ করে বললে, ব্যাংকটির প্রতি ১০০ টাকা ঋণের বিপরীতে সাড়ে ২৭ টাকা খেলাপি।
এখানেই শেষ নয়। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকটি। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে এ বিপুল অর্থ দায়মুক্ত করা হয়েছে। অবলুপ্ত ও খেলাপি ঋণ মিলিয়ে হিসাব করা হলে দেখা যাচ্ছে, সোনালী ব্যাংক যত ঋণ বিতরণ করেছে, তার অর্ধেকেরও বেশি ঋণ ফেরত দেননি গ্রহীতারা।
একই বছরের তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ২১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ। পাশাপাশি অবলোপন করা হয়েছে আরও ৫ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। খেলাপি ও অবলুপ্ত করা ঋণ মিলিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের মোট ঋণের ৯ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকাই অনাদায়ির খাতায়।
একইভাবে জনতা ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ৩১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৯ শতাংশই খেলাপি। এই ব্যাংকের অবলুপ্ত করা ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা।
২০১৫ সাল শেষে রূপালী ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ১৩ হাজার ৭৭১ কোটি টাকার মধ্যে ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকাই খেলাপি। অর্থাৎ, মোট ঋণের সোয়া ১১ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে। আর এ সময় পর্যন্ত অবলুপ্ত করা হয়েছে ১ হাজার ১৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।
পর্যবেক্ষক হিসেবে একটি ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন একজন নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নিয়মিতভাবে পুরো সময়ে পর্ষদ সভায় অংশ নিলেও ব্যাংকগুলোর কোনো উন্নতি চোখে পড়ছে না। আবার উন্নতি করতে হলে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেটিও হচ্ছে না। তবে নতুন করে ঋণ কেলেঙ্কারি কিছুটা কমলেও পুরোনো ঋণগুলো দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারই ১৯৯৬ সালে একটি ব্যাংক সংস্কার কমিটি গঠন করেছিল। ১৯৯৯ সালে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিটি বলেছিল, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি প্রায় সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মালিক, গ্রাহক ও নিয়ন্ত্রক—সরকারের এ ত্রিমুখী ভূমিকার কারণে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংস্কার ও পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনাসহ স্বায়ত্তশাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিচালনা পর্ষদকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদানের পাশাপাশি দায়িত্ব ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। যাদের সামাজিক স্বীকৃতি ও যোগ্যতা প্রশ্নাতীত এবং যাদের অধীনে ব্যাংক কর্মকর্তারা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অনুপ্রেরণা পাবেন, তাদেরই ব্যাংকের পর্ষদে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভার বহন, কর্মকর্তাদের জবাবদিহির অভাব, ত্রুটিপূর্ণ পদোন্নতি নীতিমালা, অতিরিক্ত জনবল, অপর্যাপ্ত বেতন-ভাতা, কর্মচারী ইউনিয়নের অবাঞ্ছিত কার্যকলাপ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রধান সমস্যা। ব্যাপক সংস্কার ছাড়া এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’
সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার ১৬ বছর পর রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ প্রথম আলোকে বলেন, নতুন করে তাঁর এ নিয়ে কিছু বলার নেই। কারণ, পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। সুতরাং, ওই কথাগুলো তাঁর এখনকার কথাও।
যদিও ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বড় ধরনের সংস্কারকাজ ঠিকই শুরু করেছিল সরকার। এ জন্য চারটি ব্যাংকেই পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ব্যয় হয় ১৩০ কোটি টাকা। আর পুরো প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩৯ কোটি ডলার (বর্তমান হিসাবে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি)। এই প্রকল্পের আওতায় ব্যাংকগুলোতে উচ্চ বেতন-ভাতায় চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালে যাতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলতে পারে, সে জন্য চার ব্যাংককে কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয়। শুরুতে ব্যাংকগুলো কিছুটা ভালো চলেছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়েছে। এ সময় ব্যাংকগুলোতে দলের নেতা-কর্মীদের পরিচালক বানানো হয়। এরপর ঘটে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি। পরিস্থিতি নাজুক হয় ব্যাংকগুলোর।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 58 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ