কারা থাকছেন ফাইনাল লিস্টে

Print

নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটির পছন্দের তালিকায় এগিয়ে আছেন সাবেক আমলারা। রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে পাওয়া ১২৫ জন থেকে এরই মধ্যে ২০ জনকে বেছে শর্টলিস্ট করা হয়েছে। সিভিল প্রশাসনের পাশাপাশি সাবেক সেনা কর্মকর্তা, জেলা জজ ও শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও রয়েছেন এ শর্ট লিস্টে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৮ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠনে ১০ জনের নামের তালিকা প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেবে সার্চ কমিটি। ওইভাবেই কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন তারা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ বা মুখ্য সচিবের মধ্য থেকে কাউকে নিয়োগ দেয়া হতে পারে। এমনটাই আভাস পাওয়া গেছে। এজন্য সাবেক মন্ত্রিপরিষদ ও পিএসসি’র চেয়ারম্যান ড. সাদত হুসাইন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, সাবেক মুখ্য সচিব মো. আবদুল করিম, শেখ ওয়াহিদ-উজ-জামান ও মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান- সার্চ কমিটির পছন্দের তালিকায় প্রথম কাতারে রয়েছেন। এদের মধ্যে বেশির ভাগের চাকরি জীবনে বেশ সুনাম রয়েছে।

গত মঙ্গলবার সার্চ কমিটির বৈঠকে শর্টলিস্ট তৈরির সময় বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিদের বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ পাঁচ জনের মধ্য থেকে যে কোনো একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ পাবেন এমনটি ধারণা করছেন অনেকে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সার্চ কমিটিতে সাবেক আইজিপি ও পরে সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া নূর মোহাম্মদ, শিক্ষাবিদ ড. তোফায়েল আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও স্বাস্থ্য সচিব হুমায়ুন কবির, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, শিক্ষাবিদ ড. সাদেকা হালিম, এলজিআরডি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মনজুর হোসেন, নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এম এ গফুর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) দানিয়েল ইসলাম, বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন এবং এনবিআরের সাবেক সদস্য রাহেলা চৌধুরীকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। এছাড়া সাবেক গভর্নর খোরশেদ আলম, সাবেক সচিব ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী এবং কমডোর (অব.) ওয়াহিদ চৌধুরীর নামও আলোচনায় আছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সার্চ কমিটির তৈরি করা ২০ জনের শর্ট লিস্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। নিয়োগ পাওয়ার পর যাতে কোন ব্যক্তিকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি না হয় এজন্য এমনটা করা হচ্ছে। সার্চ কমিটির সদস্যদেরও এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আজ সুপ্রিম কোর্ট জাজেস লাউঞ্জে সার্চ কমিটির পঞ্চম বৈঠক। ওই বৈঠকে শর্টলিস্টে পাওয়া নামগুলোর ব্যাপারে আহরণ করা তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। এরপরই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। এছাড়া প্রাথমিক ২০ জনের তালিকায় আরো সংযোজন-বিয়োজন করা হতে পারে। এর আগে নির্বাচন কমিশন গঠনে আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সার্চ কমিটি গঠন করেনে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ। ওই কমিটি দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নামের তালিকায় চেয়ে পাঠায়। এর ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার নিবন্ধিত ২৫টি রাজনৈতিক দল ১২৫ জনের তালিকা জমা দেয়। ওই তালিকা থেকে ২০ জনের একটি শর্টলিস্ট তৈরি করা হয়েছে। এটা নিয়েই আজ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে গতকাল সার্চ কমিটির সঙ্গে গতকাল বৈঠক করেন দেশের চার বিশিষ্ট নাগরিক। এই চার বিশিষ্টজন হলেন- সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা, বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ও সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। উল্লেখ্য, বৈঠকে পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে বসার কথা থাকলেও তার নামে প্রতারণার মামলা বিচারাধীন থাকায় তালিকা থেকে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদের নাম বাদ দেয়া হয়। বৈঠক শেষে বিশিষ্টজনরা সাংবাদিকদের বলেন, একটি রাজনৈতিক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যে ধরনের দক্ষতা ও সাহস দরকার, ওই ধরনের ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে বলে আমরা আশাবাদী। এদিন বেলা ১১টা থেকে পৌনে একটা পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা বলেন, কেমন ধরনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার নিয়োগ দেয়া দরকার সেই পরামর্শ আমরা দিয়েছি। আমরা এ ব্যাপারে সবাই একমত নির্বাচন কমিশনে যারা নেতৃত্ব দেবেন তাদের দল নিরপেক্ষ হওয়া উচিত, বিবেকবান হওয়া উচিত, সাহসী হওয়া, প্রজ্ঞাবান এবং তাদের পরিশ্রমী হওয়া দরকার। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন করাটাই নতুন ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ১৯৯৬-এ আবু হেনা সাহেব, ২০০১-এ আবু সাইদ সাহেব ও ২০০৮-এ শামসুল হুদা সাহেব যে নির্বাচন করেছেন সেগুলো দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু আগামীতে যে হবে তাদের সঙ্গে উনাদের একটা তফাত আছে। উনারা করেছিলেন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে, এই গভর্নমেন্ট কোনো প্রকার ইন্টারফেয়ারেন্স করে নাই। তারা নির্বাচনে অংশীজনও ছিলেন না। সেটা তাদের সাফল্যের একটা কারণ। এবার যে নির্বাচনটা হবে সেখানে কিন্তু রাজনৈতিক সরকার থাকবে। তাদের যে একটা বাড়তি চ্যালেঞ্জ থাকবে সেটা আগের কমিশনগুলোতে ছিল না। সেখানে পলিটিক্যাল ইন্টারফেয়ারেন্স থাকতে পারে। সেটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা গুরুত্ব না দেয়া একটা বিরাট জিনিস। সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যে তাদেরকে নির্বাচন করতে হবে। সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, আমরা বিশ্বাস করি এই সার্চ কমিটি নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। যেটা বলা হয়েছে যুক্ত করেছি, অসামপ্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সামান্যতম ভিন্ন থাকে তাদের যাতে নিয়োগ দেয়া না হয়। প্রেসিডেন্ট যে সার্চ কমিটি করেছেন, যোগ্য কমিটি করেছেন। আমরা এও মনে করি তারা যে ১০টি নাম পাঠাবেন যোগ্য নাম পাঠাবেন এবং প্রেসিডেন্ট সেখান থেকে পাঁচটি নাম দেবেন। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো কে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবেন। তিনি হচ্ছেন প্রতীক। তিনি যদি একটু নরম হন তাহলে কমিশন জিরো হয়ে গেল। ভারতের নির্বাচন কমিশনের কথা বলেছি, তারা কারও কথা মানে না। মেরুদণ্ড শক্ত থাকতে হবে, কোনো হুমকি ও কোনোকিছু তারা পরোয়া করবে না। শক্ত ও বয়স অবশ্যই ৭০-এর ভিতরে থাকবে। নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি এই কথাটা বলেছি আইন নয়, পৃথিবী এগিয়ে গেছে এখন বলা হচ্ছে নির্বাচনের ব্যাপারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কানাডাসহ পৃথিবীর ২০টি দেশে আছে আইন নয়, সংবিধানে আছে। বাংলাদেশেও আইন নয়, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছি। মাহফুজ আনাম বলেন, আমরা কতগুলো প্রফেশনাল ও কতগুলো হিউম্যান ক্রাইটেরিয়ার কথা বলেছি। সৎ, যোগ্য, নিষ্ঠাবান, সাহসী, চাপে মাথা নত করবেন না। এইসব ভিত্তিতেই উনারা সিলেক্ট করেন। আল্টিমেটলি পারফরমেন্সটা তো একটা ব্যক্তির ব্যাপার। এখন উনি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে তো সার্চ কমিটির কিছু করার নেই। একইসঙ্গে কমিটি নামের তালিকা দেয়ার পর তা প্রকাশ করা হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। মাহফুজ আনাম বলেন, গতবার সার্চ কমিটি নাম দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেবিনেট সেক্রেটারি সেটা প্রকাশ করেছেন। এবারও আমরা আশা করব রিকমেন্ডেশন পাওয়ার পর গতবারের মতো এটাও পাবলিক করা হবে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, বৃহস্পতিবার (আজ) বিকাল চারটায় সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে আবার বসবে সার্চ কমিটি। ওই বৈঠকে পাওয়া নামগুলোর ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করবেন তথ্য আহরণ ও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। কমিটি আশা করছে আগামী ৮ তারিখের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কমিটি যে ২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছে সেই প্রাথমিক তালিকায় আরো সংযোজন বিয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন সুপারিশকৃত ব্যক্তিরা যেন প্রায় একই যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতা সম্পন্ন হন। কমিটি সুপারিশ প্রণয়নকালে তাদের পরামর্শ বিবেচনায় নেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। এর আগে গত সোমবার বিশিষ্ট ১২ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেছে সার্চ কমিটি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 197 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি