কার দোষে চিকুনগুনিয়া

Print

২০১৬-১৭ অর্থবছরে (জুলাই ২০১৬ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত) মশক নিধন বাবদ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৩৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। গত পাঁচ বছরে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ১১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও নতুন করে আরও কিছু ওষুধ কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। তার পরও রাজধানীতে মশার উপদ্রব কমেনি। মশক নিধন কার্যক্রমও মানুষের চোখে পড়ে না। মশার ওষুধ কেনা ও এর সঠিক ব্যবহার নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি। অনেকেরই প্রশ্ন, মশক নিধনের টাকা যায় কোথায়। সম্প্রতি এডিস মশার কামড়ে নগরবাসী ভয়াবহ চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত হতে থাকলে এ বিপর্যয়ের চালচিত্র আবারও সবার সামনে উঠে আসে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মশক নিধনে সম্পৃক্ত ফগারম্যানদের দেখাই মেলে না। প্রতিদিন ওষুধ স্প্রে করার প্রয়োজন থাকলেও ১০-১৫ দিন পর পর ওষুধ স্প্রে করেন তারা। ফলে মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না নগরবাসী।
তবে ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘চিকুনগুনিয়ার খবর পাওয়ার পরই প্রতিটি ওয়ার্ডে জনবল আরও বাড়ানো হয়েছে। দুইজন করে অতিরিক্ত লোক দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চলছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদগুলোতে।’

ওষুধে যখন ভেজাল :অভিযোগ রয়েছে, মশার ওষুধ কেনায় সম্পৃক্ত সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে মানহীন ওষুধ নিয়ে থাকেন। তবে ২০১১ সালের ২০ আগস্ট বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে। ঠিকাদার মিজানুর রহমান খান ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় ৫০০ ড্রাম এডাল্টিসাইড ওষুধ সরবরাহ করেন। এক পর্যায়ে এ ওষুধ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা যায়, ড্রামগুলোতে কোনো ওষুধই নেই।
বর্তমান দুই সিটি করপোরেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) দরপত্রের মাধ্যমে ওষুধ সংগ্রহ করে। এ ওষুধ খামারবাড়ির প্লান্টেশন উইং, গাজীপুরের এগ্রিকালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও মহাখালীর আইইডিসিআর থেকে পরীক্ষা করা হয়। তিনটি পরীক্ষা রিপোর্টে ওষুধের মান ঠিক থাকলে ডিএনসিসি ওষুধ নেয়। ডিএনসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘এত পরীক্ষা পর আর কোনো ভেজাল থাকার কথা না।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আগে দরপত্রের মাধ্যমে ওষুধ কিনলেও গত কয়েক বছর ধরে বাজারমূল্যের চেয়ে তুলনামূলক বেশি দামে নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ডের কাছ থেকে ওষুধ সংগ্রহ করছে। এসব ওষুধও তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। তবে এই পরীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ পরীক্ষার সময় সিটি করপোরেশনের কোনো প্রতিনিধি থাকেন না। এমনকি মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের সময় কখনও কখনও নমুনা সংগ্রহ করেও মান যাচাই করা হয় না।
এ প্রসঙ্গে দুই সিটি করপোরেশনেরই দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, ‘এডাল্টিসাইড ওষুধে পানি মেশানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ এতে ধোঁয়া হয় না। একজন ফগারম্যানকে প্রতিদিন ৩০ মিলিলিটার লার্ভিসাইড ওষুধ দেওয়া হয়, যার দাম ৪৫ টাকা। প্রতি ৬ মিলিলিটার ওষুধে ১০ লিটার পানি মিশিয়ে সেটা ব্যবহার করতে হয়। এই ওষুধ বাইরে বিক্রি করতে গেলে কেউ কেনে না। ৩০ টাকার ওষুধ বড়জোর ১০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। ১০ টাকার জন্য কোনো ফগারম্যান হয়তো এমন করবেন না।’
প্রয়োজন প্রতিদিন, ছিটানো হয় মাসে দু’দিন: নগরবাসীর অভিযোগ, সপ্তাহে দু’দিন মশার ওষুধ স্প্রে করার কথা। অথচ কখনও কখনও এক মাসেও ফগারম্যানদের দেখা পাওয়া যায় না। সম্প্রতি এ নিয়ে ডিএনসিসির কাউন্সিলররা মেয়রের কাছে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে মেয়র ফগারম্যানদের পরিচালনা ও মশার ওষুধ স্প্রে করার দায়িত্ব কাউন্সিলরদের হাতে ছেড়ে দেন। নগরবাসীর আরও অভিযোগ, স্প্রে করা ওষুধ থেকে কেবলই কেরোসিনের গন্ধ আসে। এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জে. শেখ সালাহউদ্দিন ও ডিএনসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘এডাল্টিসাইড ওষুধে ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশই থাকে কেরোসিন। আর দশমিক ৬ শতাংশ থাকে ওষুধ। তাই কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া অমূলক নয়।’
কাজে ফাঁকি দেয় ফগারম্যানরা: ওষুধ ছিটানোর দায়িত্ব পালনকারী একজন ফগারম্যান প্রতিদিন মাত্র ৮০ টাকা মজুরি পান। মশা নিয়ন্ত্রণ রাখতে মজুরি বাড়ানো ছাড়াও প্রতিটি ওয়ার্ডে ২০ থেকে ৫০টি ফগার মেশিন ও ২৫ থেকে ৬০ জন ফগারম্যান থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রতিটি ওয়ার্ডে ফগারম্যান রয়েছে পাঁচজন করে। তারা ১০ দিনে দু’বার স্প্রে করতে পারে। এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জামাল মোস্তফা জানান, তার ওয়ার্ডে পাঁচটি মেশিন ও সাতজন লোক আছে। অথচ প্রয়োজন অন্তত ১৫টি মেশিন ও ২০ জন লোক। যেসব ওয়ার্ডের আয়তন দ্বিগুণ, সেগুলোতে দ্বিগুণ মেশিন ও জনবল প্রয়োজন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 195 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি