কাহিনিহীন প্রেম কাহিনি! পূর্ণ না অর্ধ বোঝা গেল না?

Print
কাহিনিহীন প্রেম কাহিনি! পূর্ণ না অর্ধ বোঝা গেল না?
চলচ্চিত্রের রিভিউ এর এক অনন্য সাহিত্যমান রয়েছে। ওপার বাংলার সুনীল, সমরেশ বা রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা অগনিত ফিল্ম রিভিউ  প্রকাশের পর নির্মাতা-ক্রিটিকের যে যুক্তির অনবদ্য ঝড়- তা ছিল ক্লাসিক। এমনকি বাংলাদেশে বরেণ্য সাংবাদিক আহমেদ জামান চৌধুরী’র লেখা চলচ্চিত্র সমালোচনার পথ বেয়ে যে অনন্য লেখায় পরিনত হওয়া। সেই চর্চা এখন কমেছে সস্তা বিনোদনের নিত্য খবরের অনলাইন পাঠকের হিট গোনার ব্যবসায়!
ঠিক সেসময়ে বসে একজন প্রখ্যাত সংবাদ ব্যক্তিত্বের কলমে যখন একটি চলচ্চিত্র সমালোচনা তৈরি হয়। তখন সেটি অবশ্যই বিশেষ কিছু। পাঠক এবং এদেশের সৃজনশীল মেধাবী চলচ্চিত্র কর্মী কলাকুশলীদের জন্যও লেখাটি এক অনবদ্য মেসেজ। পূর্ণদৈর্ঘ প্রেমকাহিনী-২ ছবিটি নিয়ে লিখেছেন এটিএন নিউজের বার্তা প্রধান মুন্নী সাহা
নিজেদের পরিবারের কারো কোনো সৃজনের কাজ হলে মনে হয় এটা আমাদেরই কাজ। তাই তা দেখার জন্য উত্সাহটাও খানিক বেশিই থাকে। আমাদের অর্থাত্ এটিএন পরিবারের ছবি বলেই দলে বলে, হলে গিয়ে বসা। দেখব পূর্নদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী-২। আমাদের এটিএন পরিবারের কর্তাব্যক্তি  চেয়ারম্যন মাহফুজুর রহমানও আছেন। আমোদী মানুষ তিনি।
খুব হাসিখুশী হয়ে আমায় বললেন, ‘সিনেমা দেখতে আইসা পড়ছেন, নিউজ দেখে কে?
আমিও মজা করে বললাম,
সিনেমার নিউজতো ভালো নিউজ, আমাদের প্রযোজনা, আমরা দেখব- লিখব! মাহফুজুর রহমান; আমাকে লাই দেয়ার হাসি হাসেন। ক’বছর আগের কথা। এটিএন বাংলায় সামিয়া জামান তার ‘রানী কুঠিরের বাকী ইতিহাস’ ছবির কিছু একটা সহযোগিতার জন্য এসেছিলেন। আমি সাথে ছিলাম। বেশ দুষ্টুমি করে বলেছিলাম তখন, ‘আমিও তো সিনেমা বানাবো, টাকা দিবেন না? পানপরাগের ডিব্বা খুলতে খুলতে, মাহফুজুর রহমান জবাব দিলেন, ‘যান, টিভির নিউজটিউজ  বানাইয়া আগে হাত পাকান, পরে আপনারে ফিল্ম বানানোর টাকা দিবনে।’
 আসলে  ফিল্ম বানানোর কোনো ইচ্ছা বা মেধা আমার নাই। এই ঘটনাটুকু  শুধু বললাম এ কারনে যে  আমার বন্ধু বান্ধব অনেকেই ফিল্ম বানাতে চায়, আবার মাহফুজুর রহমান বা সোহানী হোসেনের মতোও অনেকে আছেন নতুনদের কাজ করার জন্য সরলভাবে সহযোগিতা দেবার , ফিল্ম ইন্ডাাস্ট্রির প্রচলিত কেচ্ছাকাহিনীর কোনো রকম শর্ত আরোপ না করেই।  এমন উদ্যোক্তা বা উত্সাহদাতাদের বিশ্বাস বা আস্থা অর্জন করার দ্বায়িত্ব আমাদের নয়কি?  আমার চেনাজানারা যারা  ফিল্ম বানানোর স্বপ্নের সাথে বাস করেন, কখনো কখনো শুনি তাদের  স্বপ্নছবির স্ক্রিপ্ট বা শট ডিভিশনের গল্প। একবার ভাবি- আমার প্রতিশ্রুতির এই প্রযোজকের কাছে তাদের নিয়ে যাবো কি-না। তারপর নিজে নিজেই শুধরে নিই ‘আমার চারপাশের তরুন স্বপ্নবাজরা বাংলাদেশের বাস্তবতা মেনে যখন ‘প্রেম’ দিয়ে কাজ করার জন্য তৈরি হবে তখনই কাজের উঠোনে, আমি ওদের হাজির করবো। হ্যা ‘কাজের উঠোন’ বা ‘স্বপ্নআঁকার ক্যানভাস’!
 সম্প্রতি বরেণ্য সাংবাদিক তোয়াব খানের সাথে আলাপচারিতায় এক পর্যায়ে তিনি বলছিলেন কাজ করবার বা করে দেখবার জায়গা পাওয়াটাই একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য আশীর্বাদ। তারপর নিষ্ঠা আর ভালবাসায় একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ দশজনের জন্যে জায়গা করেন। মানবতায় তার দাগ রেখে যায়। আমি বলি তাকে ‘সিগনেচার’।
 কিন্তু কি দাগ রাখলেন নির্মাতা শাফিউদ্দিন সাফি? আমি এই নির্মাতাকে ভালো করে চিনিনা, অনেক ভালো ভালো কাজও হয়ত করেছেন তিনি, হয়ত তার ভালো কাজগুলো দেখিনি। নিশ্চয়ই সেই কাজের মুগ্ধতায়-ই ফ্রেন্ডস মুভিজের মতো এত বিজ্ঞ মানুষদের প্রডাকশনের ছবি তিনি করতে পারছেন। কিন্তু আমি যেহেতু  তার সেইসব  অনন্য কাজ দেখিনি, সে কারণে তার সামগ্রিক মূল্যায়নের ভেজালে যাবো না। আমি বুঝি এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমানের প্রযোজনা। অর্থাত্ পূর্নদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনী- টু এ তার লগ্নী এবং তার সুযোগ ।
যেটার সুযোগ শাফিউদ্দিন শাফি পেয়েছেন। শুধু কি প্রযোজক?  শাফি পেয়েছেন- নাম্বার ওয়ান শাকিব খান, নাম্বার ওয়ান জয়া আহসান। মেধাবী মৌসুমি হামিদ। চন্দন সিনহার অপূর্ব সুন্দর দুটি গান! কুমার বিশ্বজিত্, কনা, দিনাত জাহান মুন্নী, আসিফ এবং খেয়ার গান। কবীর বকুল, ইমন, কৌশিক তাপসের কম্পোজিশন।  আরো আরো ভালো শিল্পী, অভিনেতার অবদান। ক্রিকেটার হাবিবুল বাশার সুমন, শিল্পী আসিফ এবং সাংবাদিক জ.ই মামুনও অভিনয় করেছেন এখানে। পরিচালক কি কিছুরই ভ্যালু করতে পেরেছেন এখানে?
ছবিটা দেখতে বসে বারবারই মনে হচ্ছিলো ‘বানরের হাতে খুন্তি’। এটিএন পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমি, এখানকার অনেক অসম্ভবের নেপথ্য জানি। সেই জানা থেকেই বুঝতে পারছিলাম, কিভাবে এত বড় বড় সব স্টার বা সংগীত শিল্পী বা কম্পোজাররা এক হলেন! যে কোনো মামুলি বা উঠতি পরিচালকের জন্য এটি একটি আশীর্বাদ।
 টাকা – নায়ক- নায়িকা বা গান, যেভাবেই জোগাড় হোক না কেন, ক্যামেরার পেছনের মানুষটি যদি, তার ‘যত্ন-প্রেম-এবং প্রার্থনা’র পরীক্ষা দিতেন তাহলে, পূর্নদৈর্ঘ্য  প্রেম কাহিনী-২ ছবিটি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে হয়ে থাকতো অনন্য এক উদাহরন।
কিন্তু হায়!!!  কি উদাহরন হলো এই পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম? যেখানে না আছে গল্প, না আছে প্রেম, না আছে কাজের প্রতি দরদ। আমি আগেই বলেছি, হলে গিয়ে হালের ছবি দেখা হয়না, কিন্তু নানান রিভিঊ পড়ি, বন্ধুরা নতুন নতুন র্নিমাতাদের কাজের প্রশংসা করেন।  তাই প্রত্যাশাও বেশি। ছবি দেখতে গিয়ে নিজের গালে নিজে চড় মারার অবস্থা! ছি!! শুধুমাত্র সুকৌশলে ক্রিকেটটীমের ইমেজ-ক্রেজ ব্যবহার করা, আবার কোথাও কোথাও সস্তা কুটচাল দেখিয়ে, ক্রিকেটটীমকেই ছোট করার চেষ্টা ছাড়া গল্প বলতে কিছু নাই। আমি র্দশক হিসেবে বিবেকের দংশনে ভুগছি, কিন্তু আমাদের পরিচালক বাবুটির সে বোধ আছে বলে ছবি দেখে মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে জোর করে শাফির হাতে সুযোগটি ধরিয়ে দিয়েছে ফ্রেন্ডস মুভিজ। আর অনিচ্ছায় নেয়া সুযোগকে হেলাফেলা করা, পরিচালকের র্স্মাটনেস। তার এই ক্রাইম করার মতো র্স্মাটনেস এর কারণে ভবিষ্যতে কোনো নতুনের হাতে কোনো পরিচালক যদি সুযোগ না দেয়, তাহলে তার কোনো কিছু এসে যায় না!
 ভাবটা এমন… কেন আমারে টাকা দিলি?
আমি বলতে চাইছি, ছবিটি বানাতে গিয়ে, সহশিল্পী নির্বাচন থেকে শুরু করে, সংলাপ, সম্পাদনা সবটাতেই তাচ্ছিল্য আর রুচিহীনতার পরিচয়।  সহজ করে বলি- এমন অযত্ন আর তাচ্ছিল্য করে যে পরিচালক ছবি বানায়, তাকে আমি টাকা দিতাম না; সুযোগ থাকলেও।
 আমি জয়া আহসান হলে, অভিনয়ে রাজী হতাম না এই অপচয় আর সস্তা সিনেমাটোগ্রাফির সেন্স ওয়ালা পরিচালকের ক্যামেরার সামনে সুন্দর পোশাক- কেশ বিন্যাস আর সিরিয়াসনেস নিয়ে হাজির হবার।  যেখানে পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রীর মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে!
আমি চন্দন সিনহা, কুমার বিশ্বজিত্ বা কবীর বকুল হলে গানগুলো ফিরিয়ে নিতাম। এমন হাজারটা বলা যায়! এক কথায় বলতে গেলে, এ ছবি দেখে একজন দর্শক হিসেবে মনে হয়েছে, পূর্নদৈর্ঘ্যর পাত্রপাত্রী, গায়ক গায়িকা সবাই এই কাজটাকে কাজ হিসেবে, আনন্দের সাথে নিয়েছেন এটাকে কাজ করার সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন, শুধু পরিচালকই বিষয়টি পছন্দ করেননি। একটা ছবি করার সুযোগ, যে কোন পরিচালকের জন্য তার স্বপ্ন আঁঁকার ক্যানভাস… সেই ক্যানভাসটা ড. মাহফুজুর রহমান দিক আর  ইমপ্রেস টেলিফিল্মের দিক থেকে হোক… সেটির প্রতি কৃতজ্ঞ থেকে প্রার্থনার মত কাজটা তুলে আনা ভাল পরিচালক বা ভালো প্রফেশনালের পরিচায়ক।
ছবিটি দেখে মনে হয়েছে, সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল। কাহিনীহীন, প্রেম কাহিনী থেকে শুরু করা যায়, শেষে গিয়ে জগা খিচুড়ি বিন্যাস, বাজে দৃশ্যায়ন, কো-আর্টিস্টের দুর্বল সিলেকশন, ক্রিকেট টীম কে অবমাননা করা ইত্যাদি ইত্যাদি নানা কিছু পার হয়ে ভিলেনের গায়ের স্যুট এর সেফটিপিন এ গিয়ে ঠেকবে। কঠিন দন্দ্বের একটি সিকোয়েন্সে দর্শক দেখবেন, গাড়ির পাশে গরু হেঁটে হেঁটে যায়। দেখবেন রাতের পোশাকে দিনের বেলায় নায়কের নাচ। আর কুমিল্লার বা আঞ্চলিক উচ্চারণে বারবার ’এ্যামাই টু’।  আমি জানি, আমার মত অনেকেরই কানে লাগবে না, দেখবে না… কিন্তু প্রেমের গল্পতো খুঁজবে?
কিন্তু সেই গল্প কই? যেই গল্পে আমি মোহমুগ্ধ হয়ে আটকে থাকতে পারি। যে গল্পের পর সিনেমা হলের রেগুলার র্দশক হতে পারি বা, আমার বন্ধুটিকে আমার প্রযোজকের হাতে তুলে দিয়ে বলতে পারি, এবার টাকা দেন, ব্যবসা সফল, দর্শকপ্রিয় ছবি বানানোর জন্য তৈরি আমরাও। যেখানে বিনোদন আর সৃজনশীলতার টানটান প্রতিযোগিতা থাকবে পাশের দেশের সাথে। যেটা দেখিয়ে বলবো, এটা আমাদের র্প্রাথনার ফল, আমরা ভালোকাজের যোগ্য।  আমার বন্ধুরা যারা রাজকুমার হিরানীর মত দরদ দিয়ে ছবি বানাতে চায়, তারা কি শিখলো এই অপচয় দেখে?
 শেষ করি স্বপ্নবাজ তেমন এক মেকারের কমেন্ট দিয়ে—

— নাহ্ মুন্নী আপা, আমি বোধহয় পারবো না, কমার্শিয়াল ছবি বানাতে। আমিতো ক্রিয়েটিভিটিতে ছাড় দিবো না, আর  প্রযোজকরা বোধহয় এমনই পছন্দ করেন, পূর্ণদৈর্ঘ্য’র মত পুরোটা হেলাফেলা। তারা আমাদের কে টাকা দেবেন না, কারণ আমরা কাজটা প্রার্থনা মনে করি। সুযোগ পাওয়াটাকে আশীর্বাদ ভাবি .।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 105 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ