কোটিপতি বাবার রিকশাওয়ালা ছেলে!

Print

সিনেমায় হয়তো অনেকেই দেখেছেন, বাবা কোটিপতি অার ছেলে হয়তো বস্তিতে বড় হয়েছে খেয়ে না খেয়ে। ওই ছেলেটি জানে না তার বাবা কে। মাকে প্রশ্ন করেও উত্তর পায় না। শেষতক হয়তো মধুর মিলন হয়। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। সিনেমার কাহিনী অনেক সময় বাস্তবে ঘটলেও সেখানে মধুর মিলন কী আর সম্ভব?
কোন সিনেমার কাহিনী বলছি না। বাস্তবের গল্প এটি। বাবা কোটিপতি আর ছেলে রিকশা চালিয়ে জীবন যাপন করেন। মা ঝিয়ের কাজ করে ছেলেকে বড় করেছেন। ওই ছেলেটি তার বাবার আদর পায়নি। ‘বাবা কী? বাবা কেমন হয়? বাবারা কি তার ছেলেকে ভীষণ ভালোবাসেন? তাহলে আমার বাবা কই? কেন তিনি আমাদের বাড়ি আসেন না। কেন আমার বাবা আমাকে ভালোবাসেন না। এমন অনেক প্রশ্ন করে মায়ের কষ্টগুলোকে বাড়িয়েছেন বহুবার। কিন্তু এর উত্তর মেলেনি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দরিদ্র রিকশাওয়ালা নূরুল ইসলামের।

২০ বছরের বেশি সময় ধরে রিকশা চালিয়ে ঘুরছে তার সংসারের চাকা। অথচ তার জীবন এমন হওয়ার কথা ছিল না। নূরুল ইসলামের আছেন কোটিপতি বাবা। তার নাম মো. মুজাহার আলী শরীফ। তার বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ইন্দ্রকূল গ্রামে। বর্তমানে তিনি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বেজগাঁও বিশ্বরোড এলাকায় স্থায়ীভাবে বাস করছেন। সেখানে নিজস্ব বাড়ি রয়েছে তার। সোনালী ব্যাংক শ্রীনগর শাখার একজন কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু নিজের সন্তানের খোঁজ রাখেন না তিনি।
জানা গেছে, মুজাহারের নামে অনেক জমিজমা রয়েছে। সেসব জমি তার বড় মেয়ের স্বামী মামুন হাওলাদার দেখাশোনা করেন। মুজাহার বর্তমানে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় স্থায়ীভাবে বাস করছেন। দু-তিন বছর পর তিনি একবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।
১৯৭৮ সালের দিকে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীনে একজন স্টোরকিপার হিসেবে চাকরি শুরু করেন মুজাহার। তখন তিনি প্রথম স্ত্রীর তথ্য গোপন করে পাথরঘাটা উপজেলার খাড়াকান্দা গ্রামে দরিদ্র কৃষক আব্দুল গণি হাওলাদারের মেয়ে আনোয়ারা বেগম ওরফে বকফুল বিবির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে আনোয়ারা সন্তানসম্ভাবনা হন। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং পাথরঘাটা উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যস্থতায় বিয়ে হয় দুজনের। বিয়ের কয়েক মাস পর আনোয়ারা একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। সেই ছেলের নাম রাখা হয় নূরুল ইসলাম।
এরপর পাথরঘাটা শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে দুই বছর সন্তানসহ আনোয়ারার সঙ্গে একত্রে বাস করেন মুজাহার। দুই বছর পর হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যান তিনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করে স্বামীর দেখা পাননি আনোয়ারা। সেই থেকে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে একাকী জীবন তার।
এবাড়ি-ওবাড়ি ঝিয়ের কাজ করে একমাত্র ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। নূরুল ইসলামের বয়স এখন ৩৭ বছর। এই ৩৭ বছরে কখনো বাবার দেখা পাননি। পাননি বাবার আদর-সোহাগ।
নূরুল ইসলাম বলেন, বাবার সম্পত্তি চাই না। এক দিনের জন্য হলেও বাবার সঙ্গে থাকতে চাই। দেখতে চাই বাবার চেহারা। দেখতে চাই বাপ-ছেলের সম্পর্ক কেমন হয়।
নূরুল ইসলাম বিয়ে করেছেন। তার দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে মারিয়া সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে তাঞ্জিলা স্কুলে ভর্তি হয়নি। রিকশা চালিয়ে যে দুই পয়সা রোজগার তা দিয়েই চলছে স্ত্রী-সন্তান, মাসহ পাঁচজনের ভরণ-পোষণ। বাবার জন্য আক্ষেপ থাকলেও সুখের সংসার তার। তবে নিজের সন্তানের সঙ্গে এমন আচরণ করবেন না বলেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নূরুল ইসলাম।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 396 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ