ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ : আইনসভা বনাম বিচার বিভাগ

Print

 

 ড. আবদুল লতিফ মাসুম 

 রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ তত্ত্ব একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। এ তত্ত্বের মূল কথা হলো রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিভাজন। এর উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার একক ব্যবহার নিরোধ। রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে সার্বিকভাবে ন্যস্ত না হয় তা নিশ্চিত করা, এই তত্ত্ব কথার মূল কথা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দীর্ঘ সমীক্ষায় দেখা গেছে, কখনো কখনো রাজা বা রানী, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদ অথবা যেকোনো প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের সার্বিক ক্ষমতা প্রয়োগ করলে নাগরিক স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে। সার্বিক ক্ষমতা সার্বিকভাবেই ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার মোহগ্রস্ত করে তোলে। ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণের পক্ষে একদল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোরালো যুক্তি দেখান, স্বৈরাচারীপ্রবণতার বিরুদ্ধে এমনকি সংসদীয় রাজনীতিতে কথিত সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচারের (টাইরানি অব দ্য মেজোরিটি) বিরুদ্ধে অবশ্যই রক্ষাকবচ প্রয়োজন। এ সম্পর্কিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান মনীষী মন্টেস্কুর ১৭৫৮ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য ল’- এসব ধারণা ব্যক্ত করেন। তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন ১. ভীতিভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র ২. গুণভিত্তিক প্রজাতন্ত্র ও ৩. মর্যাদাভিত্তিক রাজতন্ত্র। মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্রকে অস্বাভাবিক এবং অন্যান্য ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক বলে বর্ণনা করেন। তিনি ব্রিটিশ ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণের প্রশংসা করেন। পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে এই স্বতন্ত্রীকরণ প্রয়াস বহুলাংশে প্রতিফলিত হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানেও ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২২ এ বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করিবেন।’ সংবিধানের বিচার বিভাগ পরিচ্ছদের ৯৪ অনুচ্ছেদে (৪) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।’ সংবিধানের ওই বিধানাবলি বাস্তবে প্রায়োগিক করে তোলার জন্য প্রকৃতপক্ষে কোনো সরকারই তেমন কোনো কাজ করেনি। সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের প্রচেষ্টায় কিছু বাস্তব অগ্রগতি সাধিত হয়। ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে ওই সব কার্যব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। চলমান সময়ে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ বিষয়টি আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় হওয়ার কারণ গত ৫ মে হাইকোর্টের দেয়া এক রায়। হাইকোর্ট বিভাগের এই যুগান্তকারী রায়ে বলা হয়, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ এবং সংবিধান পরিপন্থী।’ এই রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘সংসদের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের পদ্ধতি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র, যদিও এটি বিশ্বের কোনো কোনো দেশে বিদ্যমান।’ আদালত আরো বলেছেন, ‘সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার যে বিধান রয়েছে, এই সংশোধনী সেই বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির পরিপন্থী, তাই এটি সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদকেও আঘাত করে।’
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিগত ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল পাস হয়। এতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান বাতিল করে বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন আইনজীবী এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। প্রায় দু’বছর পরে ওই রিটের চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হলো। এই রায় প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়। গোটা জাতি আর সব বিষয়ের মতো এই বিষয়ও দলীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সরকার এবং সরকারের অনুগত আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী সবাই এই রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্তাপ ছড়ায়। ৫ মে জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে সংসদ সদস্যরা বিচারপতিদের বিরুদ্ধে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেন। তারা সংসদীয় ৩০০ বিধিতে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য দাবি করেন। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘হাইকোর্টের এই রায় সংবিধান পরিপন্থী।’ তিনি আগাম নিশ্চিত করেন যে, আপিল বিভাগে এই রায় টিকবে না। আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে সংবিধানের এই সংশোধনী এনেছি কিন্তু, ওনারা রায়ে বলে দিলেন এটা অবৈধ। এখন আমি বলি, এটা মোটেও অবৈধ নয়। ওনারা যেটা বলছেন, সেটাই বরং গ্রহণযোগ্য নয়।’ প্রধান বিচারপতিসহ উচ্চ আদালতে বিচারকদের কড়া সমালোচনামূলক বক্তব্য দেন সংসদ সদস্যরা। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘এ সংসদ সার্বভৌম। আমরাই বিচারপতিদের নিয়োগ দিয়েছি। হাইকোর্ট সংসদ প্রণীত আইন বাতিল করলে এটা খারাপ দৃষ্টান্ত হবে। এটা হতে পারে না। তিনি আরো বলেন, যারা বিচারক, তাদের আমরা চিনি। আমরা ক্ষমতায় বলেই তারা ক্ষমতায়। তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।’ শেখ ফজলুল করীম সেলিম বলেন, ‘এই রায়ের পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। রাষ্ট্রপতি অপরাধ করলে সংসদ তাকে অপসারণ করতে পারলে বিচারপতিরা কোথা থেকে এসেছেন যে তাদেরটা করা যাবে না।’ তিনি প্রশ্ন করেন, বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর আইন যদি আমরা পাস না করি, তাহলে তারা কি এই আইন পাস করতে পারবেন? সরকারি দলের এসব বক্তব্য রূঢ় হলেও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যা অস্বাভাবিক তা হলো তথাকথিত বিরোধী দলের বক্তব্য। যারা বিরোধী দল বলে দাবি করেন তারা জনগণের ভাষায় কথা বলবেন এবং জনগণের মনের কথা বুঝবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাবিন্দ্রীক প্রবাদ ‘পারিষদ বলে তার শত গুণ’ প্রত্যয়টি সত্য করে সরকারি দলের চেয়েও তারা কড়া মন্তব্য করেন। স্পিকার আইনমন্ত্রীকে বিচারপতিদের বেতন-ভাতার বিল দ্বিগুণকরণ-সংক্রান্ত বিলটি উত্থাপনের অনুরোধ জানালে জাতীয় পার্টির সদস্যরা উচ্চকণ্ঠে এর বিরোধিতা করেন। অবশেষে তারা ওয়াকআউট করেন। উল্লেখ্য যে, বিচারপতিদের বেতন-ভাতাসংক্রান্ত বিলটি পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। সংসদ বিধি অনুযায়ী বিলটি বিবেচনার জন্য তিন মাস সময় লাগতে পারে। অথচ একই সময় মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা বাড়ানোসংক্রান্ত বিলটি তাৎক্ষণিকভাবেই পাস হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদে বিচার বিভাগ সম্পর্কে এ ধরনের আলোচনা বিরল। এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন পক্ষ বিচারপতিদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নির্ণয় করলেন।
প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি হাইকোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, এই রায়ের মধ্য দিয়ে আবার ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা মানুষের মধ্যে সুগভীরভাবে নিশ্চিত হলো। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন মন্তব্য করেন, ‘আর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে যেখানে প্রধান বিচারপতি ও দু’জন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন, তার পরিবর্তে আজ যদি সংসদে ফ্লোর ভাগ্যনিয়ন্তা হয়, তাহলে তো ভয়ানক ব্যাপার ঘটবে। রায়ের পরে আমরা যা দেখলাম, তাতে আশঙ্কা করি কেউ রায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদে এসে খড়গহস্ত হওয়ারই প্রবণতা দেখতে পাবেন।’ খন্দকার মাহবুব আরো বলেন, আমাদের বর্তমান যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেখানে যদি এই ক্ষমতা সংসদের কাছে যায় তাহলেও বিচারকদের ওপর একটি রাজনৈতিক চাপ থাকবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, বর্তমানে অনেক রাজনীতিকই আইন পেশায় আসেন, যখন তারা প্রতিকার পাবেন না তখন তারা সংসদে গিয়ে নানা অভিযোগ তুলতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তারা শালীনতা হারাতে পারেন।
স্মরণ করা যেতে পারে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার কিছু বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শাসক দলের সাথে বিচার বিভাগের দূরত্বের সূচনা ঘটে। ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বিষয় প্রধান বিচারপতির কার্যব্যবস্থায় সম্ভবত ক্ষমতাসীন দল বিব্রতবোধ করে। পরবর্তীকালে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নে আপিল বিবেচনা করতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি প্রসিকিউশন টিমের বিরুদ্ধে একটি মন্তব্য করেন। মন্তব্যের জের ধরে ক্ষমতাসীন দলে দু’জন মন্ত্রী প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন মন্ত্রীদের দণ্ড দেন। এ ঘটনায় ক্ষমতাসীনদের প্রধান বিচারপতির ওপর সদয় হওয়ার নিশ্চয় কোনো কারণ ঘটেনি। এখন হাইকোর্টের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট কী রায় দেয় সেটাই সবার উৎসুক্যের বিষয়। অবশ্য আইনমন্ত্রী সংসদকে নিশ্চিত করেছেন যে, প্রদত্ত রায় সুপ্রিম কোর্টে টিকবে না। এ ধরনের আগাম মন্তব্য প্রকাশ্যেই বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হলে আইনমন্ত্রীর জবাব কী হবে- সেটি জনগণের আগ্রহের বিষয়।
আগেই বলা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে গতানুগতিক রাজনৈতিক দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে। উভয়পক্ষে যুক্তি-তর্ক প্রকাশিত হচ্ছে। নিরপেক্ষ ও নির্মোহ দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনা করলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে। বিতর্কটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে- বিচারক অপসারণের ব্যবস্থা কি বিচার বিভাগে থাকবে, নাকি আইন বিভাগে যাবে? খুব সাধারণভাবে বলা যায়, বিষয়টি যদি আইনগত কাঠামো বা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’-এর মাধ্যমে মীমাংসিত হয় তাহলে বিচারিক ক্ষমতার আওতায় তা সীমিত থাকে। অপর দিকে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয় যদি আইনসভার সিদ্ধান্ত মাফিক হয় তাহলে তা রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করবে। পৃথিবীর এমন কোনো আইনসভা নেই যা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করে না। সুতরাং আইনসভা রাজনৈতিক বিবেচনা দিয়ে প্রভাবিত হওয়া স্বাভাবিক। সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে কোনো কোনো আইনসভা বিচারকদের বিচার করার ক্ষমতা ধারণ করলেও সেসব সংসদ একটি দীর্ঘ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা করতে পারে। অপর দিকে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সেই ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা কোনো ক্রমেই আশা করা যায় না। বিশেষত বর্তমান সংসদ জনগণের বৈধ প্রতিনিধিত্ব দাবি করতে পারে না। যে সংসদ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্নে বিদ্ধÑ ভবিষ্যতেও সে ধরনের কোনো সংসদ বিচারকদের বিচার করার নৈতিক অধিকার রাখে না। তথ্য এসেছে যে, বেশির ভাগ কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রে আইনসভার মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণ করা হয় না। ৬৩ শতাংশ কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রে অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল অথবা স্থায়ী অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল অথবা স্থায়ী শৃঙ্খলা পরিষদের মাধ্যমে বিচারপতিদের বিচার করা হয়। রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তথা ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি নিশ্চিত করতে এসব পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশ্চাত্যের জাতীয় সংসদগুলোর তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যাবে, সেখানকার সদস্যরা অধিকতর স্বাধীন। তারা নিজ নিজ বিবেক অনুযায়ী কথা বলতে পারেন। অপর দিকে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্যরা সে অধিকার থেকে বঞ্চিত। সংবিধানে বর্ণিত ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজ বিবেক বিবেচনা এবং স্বাধীনতা অনুযায়ী তারা কথা বলতে সক্ষম নন। সে ক্ষেত্রে তারা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সদস্যপদ হারাবেন। এ অবস্থায় সংসদ সদস্যরা স্ব স্ব রাজনৈতিক দলের কাছে জিম্মি। এটা স্পষ্ট যে, আইনসভা কর্তৃক বিচারপতিদের অভিশংসন বা অপসারণ করা হলে তারা রাজনৈতিক দলের ক্রীড়ানকে পরিণত হবেন। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা মনে করেন, সর্বোচ্চ বিচার আদালতকে রাজনীতির প্রভাবাধীন করা ঠিক হবে না। এই মামলার এমিকাস কিউরি ড. কামাল হোসেন এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ষষ্ঠদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে হেয় করা হয়েছে এবং নাজুক অবস্থায় ফেলে দেয়া হয়েছে। তাই বিচারপতি অপসারণের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ নিঃসন্দেহে উত্তম পদ্ধতি।
পৃথিবীর সর্বত্র অনুসৃত রীতি-রেওয়াজ ও নিয়মনীতি এ রকম যে, বিচারকেরা সহজভাবে কোথাও অভিশংসিত এবং অপসারিত হন না। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারায় ওই রক্ষাকবচ নিশ্চিত করা হয়েছে। ব্রিটেনে বিচারকেরা যাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণাধীন না হয়ে পড়েন সেজন্য তাদের দেয় বেতন-ভাতাদি সংসদীয় পর্যালোচনা থেকে রেয়াত দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের জন্য তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অর্থব্যবস্থা কার্যকর করা যেতে পারে। এই রায় প্রকাশ করতে গিয়ে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। তা হচ্ছে- বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের সতত আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরতা। সাধারণ প্রকাশিত মতামতে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, বিচার বিভাগ রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে নয়। মানুষের ধারণা হচ্ছে, যদি বিচার বিভাগ স্বাধীন না হয় তাহলে তারা ঠিকে থাকতে পারবে না। সুতরাং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে মানুষের ধারণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে হবে।

লেখক : সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
mal55ju@yahoo.com

– See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/118306#sthash.XnGUf032.dpuf

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 256 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ