কড়াকড়ির প্রভাব ফলে

Print

001328n1

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার গত বছরের তুলনায় এবার বাড়লেও সামগ্রিক ফলাফল এর আগের কয়েক বছরের সাফল্যের ধারায় ফিরতে পারেনি। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার বাড়লেও অন্যান্য সূচকে অবনতি ঘটেছে।
ooooo

অনুসন্ধানে ফলাফল সাফল্যের ধারায় ফিরতে না পারার কয়েকটি কারণ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, অন্যান্য বছর শিক্ষার্থীদের খাতা কিছুটা উদারভাবে দেখার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হলেও এবার সে রকম কিছু ছিল না। শিক্ষার মান নিয়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রশ্ন ওঠার কারণে খাতা দেখার ব্যাপারে কিছুটা কড়াকড়ি অবলম্বন করা হয়। এ ছাড়া আগের চেয়ে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগও এবার কম ছিল। অসদুপায় বন্ধের জন্য পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তনও আনা হয়। এবারই

প্রথমবারের মতো নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা আগে নেওয়া হয়েছে। এ কারণে নকলের সুযোগও কম ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এবার যে ফল হয়েছে সেটাই স্বাভাবিক। ফল বিশ্লেষণে আরো কয়েকটি কারণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে—মানবিকের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে গণিত পরীক্ষা দ্বিতীয়বারের মতো দেওয়াটাও প্রভাব ফেলেছে ফলাফলে। এ ছাড়া বরিশাল ও মাদ্রাসা বোর্ডের খারাপ ফলের কারণেও গড় পাসের হার কমেছে।

আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডসহ দশ বোর্ডের এবারের গড় পাসের হার ৮৮.২৯ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৮৭.০৪ শতাংশ। পাসের হার বেড়েছে মাত্র ১.২৫ শতাংশ। জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দুই হাজার ১৪০ জন কমেছে। কমেছে শতভাগ পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। বেড়েছে একজনও পাস না করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। তাই শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা এবারের ফলকে সামগ্রিকভাবে অবনতি হিসেবেই দেখছে।

বিগত কয়েক বছরে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ক্রমশ উন্নতির দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু গত বছর এর ছন্দপতন ঘটে। পাসের হার কমে যায় ৪.৩০ শতাংশ। তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর কারণ হিসেবে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধের কথা উল্লেখ করে। কিন্তু এবার রাজনৈতিক কোনো অস্থিরতা না থাকলেও পরীক্ষার ফল সাফল্যের ধারায় ফিরতে পারেনি। গত বছরের আগের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে পাসের হার ছিল ৯১.৩৪ শতাংশ। তারও আগে ২০১৩ সালে ৮৯.০৩ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮৬.৩৭ শতাংশ।

সামগ্রিকভাবে ফল ভালো না হওয়া সম্পর্কে শিক্ষাসচিব মো. সোহরাব হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, প্রশ্ন ফাঁস না হওয়া এবং নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা আগে নেওয়ার কারণে অসদুপায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফলাফলে একটি প্রভাব পড়তে পারে। তিনি এ বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘নকলের প্রবণতা নেই, প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেষ্টাও নস্যাৎ করা হয়েছে। ইংরেজি ও গণিতের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিশেষ ক্লাস নেওয়া হয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীরা যেভাবে লিখেছে, সেভাবেই ফল পেয়েছে। এখানে অন্য কিছু ঘটেনি। অবশ্যই চাইব, শিক্ষার্থীরা আরো ভালো করুক। তবে যে ফল হয়েছে, তাতেও আমি সন্তুষ্ট।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছরই যে ফলাফল এক হবে, এর নিশ্চয়তা নেই। কারণ আমাদের প্রশ্ন করার পদ্ধতি এখনো আমরা সঠিক স্ট্যান্ডার্ডে আনতে পারিনি। আমরা অবশ্যই চাইব, আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন ফেল না করুক। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা যোগ্যতা অর্জন না করে পাস করুক। আর সবাইকে কৃতকার্য করার মতো শিক্ষাব্যবস্থাও আমরা পরিচালনা করতে পারছি না। এখন আমাদের ফলাফলে সংখ্যাগত দিক ঠিক আছে তবে গুণগতমান বাড়াতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাও সারিয়ে তুলতে হবে।’

বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষকদের খাতা দেওয়ার সময় এবার কড়াভাবে বলা হয়েছে, যেমন লিখবে, সেভাবেই নম্বর দেবেন। এমনকি প্রধান পরীক্ষককে বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিংয়ের জন্য বলা হয়েছে।

জানা যায়, দুই বছর ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার মান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় পড়ে। শিক্ষাবিদ ও মন্ত্রী-এমপিরাও মান নিয়ে কথা বলেন। তাঁদের দাবি, পাসের হার বাড়লেও মান মোটেই বাড়ছে না। তাই মানসম্মত শিক্ষার দিকে এগোতে উদারহস্তে খাতা দেখার নীতি থেকে সরে আসে মন্ত্রণালয়।

এত দিন আগে নেওয়া হতো রচনামূলক পরীক্ষা, এরপর নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা। কিন্তু এবার প্রথম আগে নৈর্ব্যক্তিক ও পরে রচনামূলক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, যা ফলাফলের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। কারণ পরীক্ষা শুরুর দেড় থেকে দুই ঘণ্টা আগেই কেন্দ্রগুলোতে সাধারণত প্রশ্ন পৌঁছে যায়। আর পরে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা হওয়ায় কিছু শিক্ষক এই প্রশ্নের প্যাকেট খুলে এর ছবি মোবাইলের মাধ্যমে বাইরে পাঠিয়ে দিতেন, যা সমাধান হয়ে চলে যেত শিক্ষার্থীদের হাতে। ফলে নৈর্ব্যক্তিকে পুরো নম্বরই তারা তুলে নিত। এভাবে প্রশ্ন ফাঁস করার চিত্র ঢাকা শিক্ষা বোর্ড হাতেনাতেও ধরেছে। তাই এবার যাতে স্বল্প সময়ে নৈর্ব্যক্তিক সমাধান হয়ে না আসতে পারে এ জন্য আগে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় নেওয়া হয়।

এ ছাড়া আগের বছরগুলোতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এমনকি সাজেশন আকারে যে প্রশ্ন পাওয়া যেত এর ৬০ থেকে ৮০ শতাংশেরই মিল পাওয়া যেত। এবার এই সাজেশন আকারের প্রশ্ন ফাঁস কঠোর হস্তে দমন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার এ ধরনের অভিযোগ অনেক কম ছিল। যার প্রভাব পড়েছে এবারের ফলাফলে।

শাখাভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এবার মানবিকের শিক্ষার্থীরা খারাপ ফল করেছে। গত বছরের তুলনায় মানবিকে তাদের পাসের হার ৪ শতাংশ বাড়লেও ২০১৪ সালের তুলনায় এবার প্রায় ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কম পাস করেছে। এবার মানবিকে পাসের হার ৮৩.৩৬ শতাংশ, যা গড় পাসের তুলনায় ৪.৯৩ শতাংশ কম। এবার বিজ্ঞানে পাসের হার ৯৫.৮৯ শতাংশ, যা গত বছরের চেয়ে দশমিক ৩৬ শতাংশ কম। ব্যবসায় শিক্ষায় এবার পাসের হার ৮৮.৯৮ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৮৬.৯৩ শতাংশ।

cdsc

বোর্ডওয়ারি ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ পাস করেছে রাজশাহী বোর্ডে ৯৫.৭০ শতাংশ আর সর্বনিম্ন বরিশাল বোর্ডে ৭৯.৪১ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে ৮৮.৬৭ শতাংশ, কুমিল্লা বোর্ডে ৮৪ শতাংশ, যশোর বোর্ডে ৯১.৮৫ শতাংশ, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৯০.৪৪ শতাংশ, সিলেট বোর্ডে ৮৪.৭৭ শতাংশ, দিনাজপুর বোর্ডে ৮৯.৫৯ শতাংশ, মাদ্রাসা বোর্ডে ৮৮.২২ শতাংশ ও কারিগরি বোর্ডে ৮৩.১১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। মূলত বরিশাল বোর্ডে গড় পাসের তুলনায় ৮.৮৮ শতাংশ কম পাস করায় গড় ফলে পাসের হার কমেছে। এ ছাড়া কারিগরি ও সিলেট বোর্ডেও গড় পাসের তুলনায় কম পাস করেছে।

এ ছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডে গত বছরের তুলনায় পাসের হার ও জিপিএ ৫ দুটিই কমেছে। এবার ৮৮.২২ শতাংশ পাস করলেও গত বছর ছিল ৯০.২০ শতাংশ। জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় পাঁচ হাজার ৪৪৩ জন কমেছে। এবার ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি পাস করেছে। ছেলেদের পাসের হার ৮৮.২০ শতাংশ ও মেয়েদের পাসের হার ৮৮.৩৯ শতাংশ। তবে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির দিক দিয়ে ছেলেরা এগিয়ে। ছেলেরা জিপিএ ৫ পেয়েছে ৫৭ হাজার ৭২৭ জন। আর মেয়েরা জিপিএ ৫ পেয়েছে ৫২ হাজার ৩৪ জন।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর আমাদের পাসের হার ছিল ৮৩ শতাংশ। এবার তা কমে ৭৯.৪১ শতাংশ হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য এই ফল খারাপও বলা যাবে না। মূলত আমাদের ছেলেমেয়েরা গণিতে খারাপ করেছে। বিশেষ করে মানবিকের ছেলেমেয়েরাই গণিতে বেশি খারাপ করেছে। এ জন্যই খারাপ ফল হয়েছে। এখনো আমাদের শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল গণিত রপ্ত করতে পারেনি। আর বিজ্ঞানের ছেলেমেয়েদের ভালো ফলই অন্য বিভাগকে টেনে তুলে। কিন্তু আমাদের বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মাত্র ২৪ শতাংশ। এটা ফল খারাপের একটি কারণ। আমরা উপকূলীয় অঞ্চলের স্কুলগুলোয় অঙ্ক ও ইংরেজির অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা কাটিয়ে উঠানোর চেষ্টা করছি।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 68 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ