গুলশানে নারী খুন , সিসি ক্যামেরায় খুনির গতিবিধি

Print

 

শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২ মিনিট। রাজধানীর গুলশান ২-এর ৪৩ নম্বর সড়কের মোবারক সালেহা হাইটস, ফোর সিজনস ও ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলামের নির্মাণাধীন ভবনঘেঁষা মোড়ের কোণে ওয়াকওয়ের মেহগনি গাছের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে মাঝবয়সী এক নারী। তার কাঁধে ঝোলানো ভ্যানিটিব্যাগ, পরনে সালোয়ার কামিজ। এক মিনিট পর ফোর সিজনস ভবনের পাশ দিয়ে হেঁটে আসেন ওই নারী। পায়চারী করেন মিনিটদুয়েক। কারো জন্য হয়তো তার অপেক্ষা।

১২টা ৫ বেজে ৩২ সেকেন্ড। ধীরগতিতে কালো রঙের একটি নোহা মাইক্রোবাস দাঁড়ায় মোবারক সালেহা হাইটস ভবনের পাশে। গাড়ি থেকে নামেন ২৫-৩০ বছরের দুই যুবক। হেঁটে আমিনুল ইসলামের নির্মাণাধীন ৩৮ নম্বর বাড়ির পাশের গলি ধরে কিছুটা হাঁটেন। আবার চলে যান গাড়ির কাছে। সেখান থেকে ইশারা দিতেই দাঁড়িয়ে থাকা ওই নারী দ্রুত কালো গাড়িটির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কী ভেবে মোড়ের মাঝখান থেকে আবার ফিরে আসেন, দাঁড়ান মেহগনি গাছের গোড়ায়। যুবকরা তখনো দাঁড়িয়ে গাড়ির পাশে। নারীটি হেঁটে ওই গাড়ির কাছে গিয়ে ফিরে আসেন। এবার যুবকরা আসেন নারীর কাছে। কিছু বাক্যালাপের পর তারা চলে যান। নারীটি দাঁড়িয়েই থাকেন সেখানে। যখন ১২টা বেজে ১২ মিনিট। মাইক্রোবাসটি মোড় ঘুরে আমিনুল ইসলামের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়ায়। চলেও যায়। এর পর চারদিক নীরব।

১২টা ১৫ মিনিট। মোড় ঘুরে ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল দুটি কালো-সাদা রঙের প্রাইভেটকার। মোড়েই থমকে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর গাড়ি দুটি চলে যায় দুদিকে।

৩৮ নম্বর বাড়ির সামনে কিছু একটা যে ঘটেছে গতকাল- ফোর সিজনস ভবনের বাইরে লাগানো সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা সে সময়ের ফুটেজ দেখে এটাই বোঝা যায়। শুক্রবার গভীর রাতে ৪৩ নম্বর সড়কের ৩৮ নম্বর ভবনের সামনে থেকেই উদ্ধার করা হয় রানী বেগম (৩৫) নামে এক নারীর গুলিবিদ্ধ মরদেহ। পুলিশ প্রথমে ধারণা করে, দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন ওই নারী। পরে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যে ভুল ভাঙে তাদের।

এ ঘটনায় শনিবার রাতে গুলশান থানায় অচেনা কয়েকজনের নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের ভাই মুরাদ হাসান। মামলা নম্বর-৩০। তবে গতকাল রাতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনায় সাবেক স্বামীর সম্পৃক্ততা, প্রেমঘটিত কারণ ছাড়াও কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা, তা প্রাধান্য পাচ্ছে তদন্তে। গতকাল এমনটাই জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

এদিকে আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তার চাদরে বেষ্টিত কূটনীতিকপাড়া গুলশানে ব্যস্ত রাস্তায় এক নারীকে গুলি করে হত্যা বা অন্যত্র হত্যার পর এখানে লাশ ফেলে দুর্বৃত্তদের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ফের প্রশ্নবিদ্ধ করে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে।

জানা গেছে, অভিজাত গুলশানের বিভিন্ন পয়েন্টে রয়েছে পুলিশের ৭০০ সিসি ক্যামেরা। গুলশান পুলিশ ফাঁড়িতে ইউনিট গড়ে সেগুলো রাত-দিন মনিটরিং করছেন ২ এসআই, ২ এএসআই ও ৬ কনস্টেবল। স্পর্শকাতর এই থানা এলাকায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থায়ী-অস্থায়ী ১৪টি চেকপোস্ট। এ ছাড়া প্রকাশ্যে ও গোপনে সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন র‌্যাব, ডিবি ও নিয়মিত পুলিশ ছাড়াও, এপিবিএন, আনসার, কূটনৈতিক নিরাপত্তা বাহিনী, সেনসারি পুলিশ, এসবিসহ আরও কয়েকটি বাহিনীর সদস্যরা। এত নিরাপত্তার মধ্যেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। তাদের অভিযোগ, যেখানে লাশ মিলেছে তার পাশেই দুমাস আগে পুলিশ সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য বাক্স লাগিয়ে গেছে। কিন্তু কোনো ক্যামেরা লাগানো হয়নি। যদি আগেই ক্যামেরা স্থাপন করা হতো তাহলে দ্রুত রানী বেগমের খুনিদের শনাক্ত করা যেত।

কারা রানী বেগমকে হত্যা করতে পারে, এমন প্রশ্নে গত সন্ধ্যায় নিহতের ভাই মুরাদ হাসান আমাদের সময়কে বলেন, কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তা তিনি ধারণা করতে পারছেন না। তবে রানীর আগের স্বামী ড্রাইভার আলমের অসংলগ্ন কথাবার্তায় সন্দেহের ডালপালা ছড়াচ্ছে। তার বোনের লাশ উদ্ধারের রাতেই (৩টা) রানীর মোবাইল ফোন নম্বর থেকে সিলেটে থাকা তাদের আরেক বোন তানিয়াকে আলম ফোন করে জানায়, রানী দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ঘটনার পর কেউ না জানলেও তিনি এত তাড়াতাড়ি কীভাবে বিষয়টি জানলেন তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি আলম। তা ছাড়া আলমই জানিয়েছে রানী তাকে তালাক দিয়ে আরও একটি বিয়ে করেন, যা জানা ছিল না মুরাদ হাসানসহ তাদের পরিবারের কারো। এ হত্যাকা-ের সঙ্গে আলমের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে মামলার বাদী মুরাদ হাসান জানান।

নিহতের বোন শাহনাজ জানান, রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় মেয়েকে নিয়ে শাহনাজের বাসার পাশেই থাকতেন রানী বেগম। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে তার বাসায় মেয়ে নন্দিনীকে রেখে কাজ আছে বলে বের হন রানী। এর পর তার লাশ মেলে গুলশানে। প্রায় রাতেই কাজের উদ্দেশ্যে বের হতেন রানী বেগম। ফিরতেন সকালে বলেও জানান শাহনাজ।

রানী হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই ফারুক আলম জানান, যে ভবনের সামনে লাশ পাওয়া গেছে সে ভবনে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। তাই কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে তদন্তে। ঘটনায় জড়িত কাউকে এখনো আটক করা যায়নি। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে সেগুলো খতিয়ে দেখা হবে। কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে বলেও এসআই ফারুক জানান।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 156 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ