গ্রহিতাদের তালিকা খুলতেই লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো দূর্নীতির কালো বেড়াল

Print

ঝালকাঠির রাজাপুর প্রানী সম্পদ বিভাগে সরবরাহকৃত ২৮ হাজার হাঁস-মুরগি ভ্যাকসিন’র ২০ হাজার কলোবাজারে বিক্রি

আজমীর হোসেন তালুকদার, ঝালকাঠি:: ‘মোরা হাসপাতালে গ্যালে কোন ওষুধ পাইনা। ডাক্তার কয় বাইরে দিয়া কিনন্যা নেও। ওষুধ আইলেই ওরা বাইরে বেইচ্যা খায়। এসব বলে আহাজাড়ি করছিল ফাতেমা বেগম। কাছে গিয়ে জানা গেলো তার এগারোটি হাঁসের সবগুলো অসুখে মারা যাওয়ায় মুল্যবান কিছু হারিয়ে ফেলার ন্যায় কেঁদে কেঁদে এ বিলাপ করছিলো। তবে ঘটনা সেরকমই কারন অভাবের সংসারে ফাতেমা বেগমের কাছে এই হাঁসগুলো ছিল অনেক মূল্যবান। সম্প্রতি এ হাঁসগুলো প্রতিদিন গড়ে ৩/৪টি ডিম দিতে শুরু করে। আর তা বিক্রি করে শিশুপুত্রকে নিয়ে সংসার খরচের একাংশ চালাচ্ছিল স্বামী পরিত্যাক্তা ফাতেমা বেগম। ঝালকাঠির রাজাপুর সদরের গোরস্থান সড়ক এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি ও বাসা-বাড়ীতে কাজ করে একমাত্র সন্তান রাজা (৪) কে নিয়ে জীবন সংগ্রামে চালাচ্ছিল। অভাবের সংসারে বেঁচে থাকার প্রানপন লড়াইয়ে কিছুটা সহায়তা করছিল এই হাঁসগুলো। তার অভিযোগ উপজেলা প্রাণী সম্পদ কার্যালয়ে বারবার গিয়েও কোন ওষুধ না পাওয়ায় তার হাঁসগুলোর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে খোজ নিয়ে জানাগেছে, গত এক মাস ধরে রাজাপুর উপজেলা প্রাণীসম্পদ কার্যালয় থেকে হাঁস, মুরগি ও কবুতরের ভ্যাকসিন সরবারহ না করায় উপজেলা জুড়ে মুরগির রানীক্ষেত ও হাঁসের ডাকপ্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিগত বছেরর চেয়েও এবারও শীতের শুরু থেকে উপজেলার ৬ ইউনিয়নে এই রোগের প্রকোপে গৃহপালিত হাঁস, মুরগি ও কবুতর মারা যাওয়ার সংখ্যা আশংকা জনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে পল্ট্রি খামার মালিকসহ গৃহস্থালিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জেলা প্রানী সম্পদ অধিদপ্তর থেকে প্রতি বছর শীতের শুরুতে কবুতর-মুরগির রানীক্ষেত ও হাঁসের ডাকপ্লেগ রোগ প্রতিরোধে প্রতি উপজেলায় চাহিদা অনুসারে আর.ভি.ডি (রানীক্ষেত ভাইরাস ভ্যাকসিন) সরবরাহ করে থাকে। সে অনুযায়ী ইতিমধ্যে জেলা প্রানীসম্পদ দপ্তর থেকে গত নভেম্বরে ১৩০ ও ডিসেম্বরে ১৫০ সহ মোট ২৮০ ইমপুল আর.ভি.ডি সরবরাহ করে। যার ব্যবহারে ২৮ হাজার মুরগি বা কবুতরের টিকা দেয়া সম্ভব। প্রতি ইমপুল ভ্যাকসিন দিয়ে একশ মুরগি বা কবুতরকে টিকা দেয়া যায়। কিন্তু উপজেলা প্রানী সম্পদ কার্যালয়ে ভ্যাকসিন নিতে গিয়ে গত ৮ডিসেম্বর থেকে কোন আরভিডি ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছেনা।
উপজেলা প্রাণী সম্পদ কার্যালয়ের ভ্যাটেনারি সার্জন অলোকেশ কুমার সরকারের তথ্য মতে, জেলা প্রানীসম্পদ দপ্তর থেকে যে পরিমান ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে ইতিমধ্যে তা বিতরন করা হয়েছে।’ এমন দাবীর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ‘ভ্যাকসিন দেয়া গ্রাহকদের নাম ঠিকানা লিখে রাখার সুনির্দিষ্ট বিধান থাকলেও’ উপজেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগের কাছে গৃহিতাদের নামের তালিকা দেখতে চাইতেই লাফ দিয়ে থলে থেকে বেরিয়ে আসে দূর্নীতির কালো বেড়াল ।
জেলা প্রানীসম্পদ দপ্তর থেকে গত ডিসেম্বরে সরবরাহকৃত ১৫০ ইমপুলের মধ্যে মাত্র ৯ ইমপুল ভ্যাকসিনের হিসেব আছে তাদের কাছে তবে বাকি ১৪১ ইমপুল কোন হিসাব বা রেকর্ড ছাড়াই গায়েব হয়ে গেছে। ১৪১ ইমপুল দিয়ে ১৪হাজার একশত মুরগী বা কবুতরকে রানীক্ষেত রোগের প্রতিষেধক টিকা দেয়া যেত কিন্তু উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ও টিকা কর্মকর্তারা গোপনে কালোবাজারে বাইরে বিক্রি করে দেয়ায় ফার্মেসি থেকে চড়া মূল্যে ভ্যাকসিন কিনতে বাধ্য হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগিদের।
সরেজমিন পুটিয়াখালী আলিয়া মাদ্রাসার সহকারি শিক্ষক সোহরাব হোসেন জানায়, ‘গত ১৫দিনে তার এবং তার প্রতিবেশি হুমায়ুন কবির ও আওলাদ হোসেনের শতাধিক হাঁস মুরগি মারা গেছে। তিনি তিনবার পশু অফিসে এসেও কোন প্রকার ওষুধ পাইনি। কর্মকর্তারা তাকে অপেক্ষা করতে বলে চলে গেছে।’ টিএন্ডটি সড়কের বাসিন্ধা সঞ্জীব কুমার সিকদার বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে আমার ২২টি মুরগি মারা গেছে। বারবার প্রাণী সম্পদ অফিসে গেলে তারা ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার পরামর্শ দেন। তবে ফার্মেসিতে এসব ব্যাকসিনের মূল্য অত্যাধিক বেশি হওয়ায় টাকা জোগাড় করার আগেই আমার হাঁস-মুরগিগুলো শেষ।’
একই ভাবে সরকারি চাকুরিজীবি মো. মুরাদ হোসেন গাজী জানায়, সপ্তাহের ব্যাবধানে তার দু’শতাধিক কবুতর মারা গেলেও আমি প্রানী সম্পদ দপ্তর কোন ওষুধ দেয়নি। বাইরে থেকে কিনতে গিয়ে ফার্মেসির মালিকরা পরিচিত লোকের কাছে সরকারি ওষুধ বিক্রি না করায় সৃষ্টি হয় আরেক ঝামেলা। মনোহরপুর গ্রামের পল্ট্রী খামারি মো. রবিউল ইসলাম জানান, আমরা প্রানীসম্পদ অফিস থেকে কোন ভ্যাকসিন পাইনা বলে বাহির থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন কিনি। খামারি সোহরাব হোসেন বলেন, শীতের শুরুতে মুরগি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। শুধুমাত্র প্রানীসম্পদ অফিস কোন ভ্যাকসিন না দেয়ায় পৌষ ও মাঘ এ দু’মাস ফার্মে মুরগির বাচ্চা তুলিনি।
সরেজমিনে রাজাপুর প্রানী সম্পদ কার্যালয়ে গত রবিবার সকাল থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তিন দিন পর্যবেক্ষন করা হলে, ১শ ২৪জন ভুক্তভোগি উপজেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তরে ভ্যাকসিন নিতে এসে খালি হাতে ফিরে গেছেন। এর মধ্যে ৩৬জন ফার্মেসি থেকে ওষুধ ক্রয় করেছেন বাকী ৮৮ জনই ওষুধ ক্রয় না করে ফিরে গেছে। আর এ তিনদিনই অসীম ক্ষমতাধর রাজাপুর প্রানী সম্পদ বিভাগের নয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারির মধ্যে দুপুর বারোটার পর শুধু কম্পিউটার অপারেটর আলমগীর হোসেন ছাড়া আর কাউকে অফিসে পদধূলি দিতে দেখা যায়নি ।
আর ‘এই ইচ্ছামতি কার্যক্রম বিভাগের প্রধান’ উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা (ভ্যাটেনারী সার্জন) অলোকেশ কুমার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের ওষুধ সঠিকভাবে বিতরণ হয়। বাইরে ফার্মেসিতে বিক্রির কোন সুযোগ নেই। লোকজনের চাপ ও ভিড়ের কারনে আমরা অনেকের নাম খাতায় লিখতে পারিনা।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 60 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ