ঘুমের ওষুধের ভয়ঙ্কর ছোবল

Print

সামছুদ্দিন আহমেদ। বয়স ৩০। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সারা দিন কাজের চাপ, নানান চিন্তায় রাতে ভালো ঘুম হয় না তার! আবার সকাল হলেই ছুটতে হয় জীবিকার তাগিদে। তাই ঘুম পুষিয়ে নিতে তিনি প্রতিরাতে অল্প মাত্রার ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে যান। এভাবে চলার সপ্তাহখানেক পর তিনি লক্ষ করলেন আগের মাত্রার ঘুমের ওষুধেও ঘুম হচ্ছে না। তাই ওষুধের মাত্রা বাড়াতে হয়। এভাবে একটা সময় ঘুমের ওষুধের ওপর পুরোপুরি আসক্ত হয়ে পড়লেন তিনি। শুধু সামছুদ্দিন নন, দেশে এখন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনেকেই ঘুমের জন্য ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হন। এছাড়া সাধারণত রোগীদের ঘুমের সমস্যা দূর করতে ডাক্তাররা ঘুমের ওষুধ নেয়ার পরামশ দেন। মানসিক চাপ, অবসাদ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে ভালো ঘুমের আশায় অনেকেই ঘুমের ওষুধ নিয়ে থাকেন। তবে ঘুমের উদ্দেশ্যে নিয়মিত নেয়া হলে একটা সময় শরীর ওই ওষুধটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ঘুম ভালো হওয়ার উদ্দেশ্যে ঘুমের ওষুধ নেয়া হলেও এ অভ্যাসের দীর্ঘকালীন প্রভাব পড়ে শরীরে ওপর। আর সেটি অত্যন্ত খারাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা আরো বলেন, ঘুম না হওয়ার সহজ সমাধান হিসেবে কাজ করে ঘুমের ওষুধ। তবে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান এটি নয়। বরং ঘুমের ওষুধ গ্রহণের অভ্যাস লিভার ও কিডনির ক্ষতি করে বলে তারা উল্লেখ করেন।
চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ফার্মেসি থেকে কেনা যাচ্ছে প্যাথেড্রিন থেকে শুরু করে এটিভেন, মাইলাম, ডর্মিকামের মতো উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও রাজধানীর আজিমপুর, পলাশী, শ্যামলীসহ আরো কিছু এলাকার ফার্মেসিতে গিয়ে নাম বলতেই কেনা যাচ্ছে ওষুধগুলো। সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিনা প্রেসক্রিপশনে বিক্রেতারা দিচ্ছেন এ জাতীয় ওষুধ। পুরান ঢাকার বাসিন্দা জসিম দু’টো মাইলাম, একপাতা উচ্চরক্তচাপের ওষুধ বাইজোরান কিনতে আসেন পলাশী ফার্মেসিতে। বিক্রেতা তাকে ব্যবস্থাপত্রের কথা তো জিজ্ঞেস করেইনি বরং কোনটা খেলে আরো বেশি মাথা ঝিমঝিম করবে, কিছুটা নেশা ভাব হবে সেটার পরামর্শ দিলেন! এখানে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রি হয় এপিট্রা ও নক্টিনের মতো ওষুধও। তবে সেক্ষেত্রে আগে খাতির জমাতে হবে দোকানির সঙ্গে। অপর কাজী ফার্মেসি দোকানি বলেন, তার ফার্মেসিতে ঘুমের ওষুধ নিতে ক্রেতারা প্রেসক্রিপশন নিয়ে আসে না। ক্রেতারা মাইলাম ওষুধ চান বেশি।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিষণ্নতায় ভোগার পরিমাণ কিছুটা বেশি। আর এই মানসিক অবসাদ থেকে বাঁচতে তারা ঘুমের ওষুধের সাহায্য নেয়। তবে একবারে বেশি ঘুমের ওষুধ খাওয়া হলে তা লিভার এবং কিডনির গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। আর দীর্ঘদিনের অভ্যাস খুব ধীরে ক্ষতি করবে। ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে উঠার পরেও অনেক সময় সারাদিন এর প্রভাব থেকে যায়। যা কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। যারা গাড়ি চালান তাদের জন্য এটি খুবই বিপদজনক। কারণ কিছু ঘুমের ওষুধে পরের দিন পর্যন্ত অনুভূত হয়ে থাকে। আর মাতালভাব নিয়ে গাড়ি চালানো বা রাস্তায় হাঁটাচলা করা একেবারেই নিরাপদ নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধে রোগী মারা যেতে পারে কিংবা সারা জীবনের জন্য হারিয়ে ফেলতে পারে শারীরিক সক্ষমতা। চিকিৎসকরা বলছেন, এপিট্রার মতো ওষুধ অতিরিক্ত সেবনে তিন-চার দিন পর্যন্ত ঘুম নাও ভাঙতে পারে এবং ভাঙার পর কিছু সময়ের স্মৃতি হারিয়ে ফেলারও আশঙ্কা থাকে।
চিকিৎসকরা বলেন, ঘুমের ওষুধ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে দিতে পারে। এর ফলে বিভ্রান্তির মতো সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া ঘুমের ওষুধে আসক্ত হয়ে পড়লে তা পানির পিপাসা কমিয়ে দেয়, এতে করে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। ফলে তা কিডনিতে প্রভাব ফেলে। এ কারণে অনেক সময় হেপাটাইটিস ধরনের রোগও হতে পারে। সব ধরনের ঘুমের ওষুধ একই ধরনের প্রভাব ফেলে না। ঘুমের ওষুধের প্রভাব ভেদে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। এক ধরনের ওষুধ মস্তিষ্কে উদ্দীপনা জাগায়। অপরটি হিপনোটিপ বা ওই ওষুধগুলোর কারণে গ্রহণকারীর হ্যালুশিনেশন বা ভ্রান্তির সমস্যাগুলো দেখা দেয়। আর অপর ধরনের ঘুমের ওষুধের তালিকায় রয়েছে বহুল প্রচলিত নেশা দ্রব্যগুলো। এগুলো গ্রহণে খুব সহজেই আসক্ত হয়ে যায়। কিছু কিছু ঘুমের ওষুধের আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য ওষুধ পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ আসক্তি থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে অন্য ওষুধ তেমন একটা কাজ করে না। এক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছা এবং পরিবারের সাহায্যই বেশি জরুরি। চিকিৎসকরা বলেন, মৃগী রোগের চিকিৎসায় মাইলাম সাময়িকভাবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে কম্বিনেশন করে এটি সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার হয়ে থাকে কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো চিকিৎসায় ব্যবহার করলে স্মৃতিলোপের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে, শ্বাসের সমস্যা হতে পারে, রক্তচাপ কমে যাবে। নিজেরাও ইচ্ছামতো ওষুধ খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালযের মেডিসিন অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুুল্লাহ এ প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, ঘুমের ওষুধ বাদই ভালো। কোনো ক্রমেও দেয়া উচিত না। ডাক্তার যদি একেবারে জরুরি মনে করেন তাহলে দিতে পারেন। একবার এই ওষুধ খেয়ে খারাপ অভ্যাস হলে তা থেকে ফেরানো মুশকিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির (বিসিডিএস) হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ওষুধের দোকান রয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার। ব্যবস্থাপত্র দেখে ওষুধ বিক্রি করে মাত্র ১৩ শতাংশ বিক্রেতা। চিকিৎসকরা বলেন, ওষুধ বিজ্ঞানের ভাষায়, প্রেসক্রাইবড ও ননপ্রেসক্রাইবড দুই ধরনের ওষুধ রয়েছে। জ্বর, ডায়রিয়া, মাথাব্যথা, ভিটামিন, মলম-জাতীয় কিছু সাধারণ ওষুধই মূলত ননপ্রেসক্রাইবড। অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ জটিল রোগের ওষুধগুলো প্রেসক্রাইবড। ওষুধের দোকানগুলোয় এ দুই ধরনের ওষুধ পৃথক স্থানে রাখা এবং বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়ম মানার বিধান থাকলেও বাংলাদেশে তা মানা হচ্ছে না।
সূত্র মতে, ওষুধ নীতি ২০১৩-এর চূড়ান্ত খসড়ায় ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার বিধানটি রাখা হয়েছে। নতুন এই নীতিমালায় জীবনরক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় ২৮৬ ওষুধের তালিকা করা হয়েছে। চিকিৎসা ছাড়পত্র ছাড়াও যেসব ওষুধ খুচরা দোকানে বিক্রি করা হয় তার তালিকা তৈরির কাজেও হাত দিয়েছে প্রশাসন। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র দেখে ওষুধ বিক্রির বিভিন্ন শর্ত তুলে ধরা হবে।
ঘুমের ওষুধের ক্ষতিকর দিক: চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ঘুম না হওয়ার সহজ সমাধান হিসেবে কাজ করে ঘুমের ওষুধ। তবে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান এটি নয় বরং বেশিদিন ঘুমের ওষুধ গ্রহণের অভ্যাস লিভার এবং কিডনির ক্ষতি করে। যদি ভুল সময়ে আপনি ঘুমের ওষুধ খান তাহলে আপনার শরীরে তা প্রভাব ফেলতে পারে। যদি আগের দিন রাতে আপনি ঘুমের ওষুধ খাওয়ার পরেও ভালো ঘুম না হয়, তার প্রভাব পরের দিন বেলা পর্যন্ত থাকতে পারে। কিংবা অনেক রাতে ওষুধ খেলেও পরের দিন সকাল পর্যন্ত তার ঘোর থাকতে পারে, অর্থাৎ তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব থাকতে পারে। বিশেষ করে গাড়ি চালানোর সময়, রাস্তায় পারাপারের সময় বিপদে পড়ার আশঙ্কা আরো বেড়ে যায়। অনেক সময় ঘুমের ওষুধের নিয়মিত সেবন মানুষের আচার-ব্যবহারে পার্থক্য তৈরি করতে পারে। খিটখিটে মেজাজ প্রভৃতি নানা রকমের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে খেতে ওই ধরনের ওষুধে শরীর অভ্যস্ত হয়ে যায়, ফলে একটা সময়ের পর ওষুধ শরীরে কাজ করা বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওষুধের মাত্রা বাড়াতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এমনটা চলতে থাকলে তা সত্যিই শরীরের পক্ষে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে থাকলে তা শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকেও খারাপ করতে থাকে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 235 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ