ঘুষ ছাড়া মেলে না নতুন সংযোগ

Print

চট্টগ্রাম ওয়াসায় অব্যাহত দুর্নীতি সকল অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। রাজস্ব বিভাগের দুর্নীতি ওয়াসাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। নতুন সংযোগ অনুমোদনে টেবিলে টেবিলে ঘুষ আদায়, গুদামে কয়েক হাজার মিটার মজুদ থাকলেও বছরের পর বছর ১২ হাজার সংযোগে গড়ে বিল আদায় করা হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পড়ে থাকা প্রায় ৫২ কোটি টাকা বকেয়া আদায় ও পানি চুরি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় রাজস্ব বিভাগের কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত লোককে অবৈধ পন্থায় আর্থিক সুবিধা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, সঠিক পদক্ষেপের অভাবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির উত্সগুলো কাজে লাগাতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। রাজস্ব বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে কুক্ষিগত করে রেখেছে এক দুষ্টচক্র।
কর্ণফুলী পানি শোধনাগার নির্মাণের পর নগরীতে পানি সরবরাহ বেড়েছে। বর্তমানে দৈনিক ২৮ থেকে ২৯ কোটি লিটার পানি সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। ফলে নতুন সংযোগের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য আবেদন ওয়াসায় জমা পড়ছে। সংযোগ নিতে গ্রাহককে টেবিলে টেবিলে বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে। বিক্রি শাখায় আবেদন করার পর সংযোগের আকার অনুসারে এমডি ও ডিএমডি (অর্থ) চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেন; কিন্তু অনেকেই অভিযোগ করেছেন ওয়াসা ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত রাজস্ব বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তার স্বাক্ষর নিতে প্রতি ফাইলে এক হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হয়। আর বিক্রি শাখার দুই জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর আনা ফাইল স্বাক্ষরে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এই কর্মকর্তা। জানা যায়, গত ডিসেম্বর মাসে প্রায় ৫০০ নতুন সংযোগ অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ওয়াসার বর্তমান এমডি ২০০৯ সাল থেকে ওয়াসার চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে এমডির দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ওয়াসায় দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট উন্নয়নমূলক অনেক প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়ন তার মেয়াদে সম্পন্ন হয়েছে। যার ফলে নগরীতে পানি সংকট অনেকাংশে লাঘব হয়েছে; কিন্তু রাজস্ব বিভাগের অনিয়ম ও দুর্নীতি সমস্ত অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে।
ওয়াসায় প্রায় ৬৫ হাজার পানির সংযোগ রয়েছে। মিটার পরিদর্শকের ৫৫টি পদের মধ্যে ৫০টি শূন্য। মিটার পরিদর্শকের লোভনীয় পদ নিয়ে চলছে দীর্ঘদিন যাবত্ অরাজকতা। বাধার কারণে শূন্য পদে লোক নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। সহকারী পাম্প অপারেটর ও সাধারণ শাখা থেকে ডেপুটেশনে লোক দিয়ে মিটার পরিদর্শকের কাজ চালানো হচ্ছে। এখন আবার এসব লোক পূর্বের পদে ফিরে যেতে চাচ্ছে না। বর্তমান পদ স্থায়ীকরণের দাবি তুলেছে তারা। তবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি মিটার পরিদর্শকের শূন্য পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন।
ওয়াসা সূত্র জানায়, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৫২ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। এসব বকেয়া আদায়ে সম্প্রতি ওয়াসা পরিচালনা বোর্ডের সভায় তাগিদ দেয়া হয়েছে; কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। জানতে চাইলে সিআরও পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তৌহিদুল আলম বলেন, ‘এসব বকেয়া আদায় নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কমিটি করা হয়েছে। কিছু বকেয়া ইতিমধ্যে আদায় হয়েছে।’
ওয়াসায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ ও ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বকেয়া আদায়ে মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চললেও বড় অংকের বিল খেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া থাকা সত্ত্বেও ‘কোনো অদৃশ্য কারণে’ তাদের সংযোগ চালু রাখা হয়েছে।
কর্ণফুলী পানি শোধনাগার চালু হওয়ার পর পানি বাবদ আয় অনেক বেড়েছে। নগরীতে ওয়াসার লাইসেন্স ছাড়া ব্যক্তিগত নলকূপ বসানো যায় না। অথচ হাজারো নলকূপ বিনা লাইসেন্সে বসানো হয়েছে। এগুলো লাইসেন্সের আওতায় আনা গেলে রাজস্ব আয় অনেক বৃদ্ধি পাবে; কিন্তু এ ব্যাপারেও ওয়াসার কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
বর্তমানে নগরীতে ১২ হাজার সংযোগ রয়েছে মিটারবিহীন। অথচ ওয়াসার স্টোরে কয়েক হাজার মিটার দীর্ঘদিন যাবত্ মজুদ রয়েছে। তাদের মিটার প্রদান কেন করা হচ্ছে না জানতে চাইলে ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক বিশ্বজিত্ ভট্টাচার্য বলেন, সবাইকে মিটারের আওতায় আনা হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 175 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ