চট্টগ্রামের ক্রীড়াপ্রেমীরা মাঠের অভাবে এক মাঠে ২০-২৫টি ক্রিকেট ম্যাচ খেলে

Print

মাঠের অভাবে যেখানে চট্টগ্রামের ক্রীড়াপ্রেমীরা এক মাঠে ২০-২৫টি ক্রিকেট ম্যাচ খেলে সেখানে চট্টগ্রাম আউটার স্টেডিয়ামের অর্ধেক দখল করে সুইমিংপুল কমপ্লেক্স নির্মাণ মেয়র হিসেবে নাছিরের অর্বাচীনতারই প্রমাণ !

চট্টগ্রাম আউটার স্টেডিয়ামের আয়তন প্রায় চার একর। এর পুরোটাই খোলা মাঠ। সুইমিং কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই মাঠের অর্ধেক টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। এতে কিশোর-তরুণদের খেলার জন্য খোলা জায়গা কমে গেছে। মাঠে সুইমিং কমপ্লেক্স করা না-করা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে চলে আসা বিতর্কের মধ্যেই নির্মাণকাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার নির্মাণকাজ বন্ধ করা নিয়ে ছাত্রলীগের কর্মসূচিকে ঘিরে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।
এই মাঠে একসময় জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, নুরুল আবেদিন নোবেলরা অনুশীলন করেছেন। এই মাঠের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশও নিয়েছেন তাঁরা। এই মাঠে স্টার যুব ও নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট হতো একসময়। এই মাঠ থেকে হাতেখড়ি নিয়ে সর্বশেষ জাতীয় দলে ঠাঁই পেয়েছিলেন আফতাব আহমেদ চৌধুরী ও তামিম ইকবাল।
কিন্তু মাঠে সুইমিং কমপ্লেক্স নির্মাণ করার বিষয়টির সঙ্গে দলীয় রাজনীতি যুক্ত হয়ে যাওয়ায় এ নিয়ে স্থানীয় কোনো ক্রিকেটাররা মন্তব্য করতে চাননি।
চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের এক পক্ষ এই মাঠে যে করেই হোক সুইমিং কমপ্লেক্স নির্মাণ করতে চায়। তারা বলছে, চট্টগ্রামের মতো একটি বিভাগীয় শহরে সুইমিংপুলের প্রয়োজন রয়েছে। অন্য পক্ষ বলছে, সুইমিং কমপ্লেক্স দরকার, তবে তা মাঠ ধ্বংস করে নয়।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অর্থায়নে ৭০ হাজার ৩৮০ বর্গফুটের (৩০৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৩০ ফুট প্রস্থ) সুইমিং কমপ্লেক্স নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। নয় মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। আউটার স্টেডিয়ামের তত্ত্বাবধায়ক চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা (সিজেকেএস) এই পুলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবে। সিজেকেএসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগেরও সাধারণ সম্পাদক।
গতকাল বিকেলে আউটার স্টেডিয়ামের খোলা মাঠের এক পাশে অনুশীলন করেছিল কয়েকটি ক্রিকেট একাডেমির শিক্ষার্থীরা। একই সময়ে স্টেডিয়াম সংলগ্ন আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ছেলেরাও ছোট ছোট বেশ কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে মাঠের বিভিন্ন অংশে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলছিল।
পোর্ট সিটি ক্রিকেট একাডেমির ক্রিকেটার সামিউর রহমান বলেন, আগে মাঠের দক্ষিণ পাশে তাঁরা অনুশীলন করতেন। ওই দিকে সুইমিংপুলের কাজ শুরু হওয়ায় এখন উত্তর পাশে অনুশীলন করছেন তাঁরা।
আনোয়ার হোসেন নামের এক কিশোর বলে, এখানে প্রতিদিন খেলতে আসে তারা। তবে কখনো মেলা হলে খেলা বন্ধ থাকে।
ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ মোমিনুল হক বলেন, ‘এই মাঠে পাড়ার ছেলেরা খেলে। আমরা অনুশীলন করি। এখন সুইমিংপুল হলে বোঝা যাবে মাঠ কতটা কমেছে। আর যে পাশে সুইমিংপুল হচ্ছে, ওই দিকে দুটি একাডেমি অনুশীলন করত। দুটির একটি এখন সাগরিকা স্টেডিয়ামে চলে গেছে। অপরটি আউটার স্টেডিয়ামের উত্তর পাশে অনুশীলন করছে।’
খেলাধুলার পাশাপাশি এই মাঠে প্রতিবছর কয়েকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে বিজয় মেলা, গাড়িমেলা, তাঁতবস্ত্র মেলা, বৃক্ষমেলা উল্লেখযোগ্য। বিজয় মেলার জন্য প্রায় দুই মাস ধরে মাঠ খেলার অনুপযোগী থাকে বলে সিজেকেএস কর্মকর্তারা জানান।
প্রতিবছর ডিসেম্বরে মাসব্যাপী এই মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলার উদ্যোক্তা চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী। বিজয় মেলা পরিষদের মহাসচিব মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ‘একসময় সার্কিট হাউস মাঠে মেলা করতাম। সেখানে এখন পার্ক। আউটার স্টেডিয়ামে করে আসছিলাম। কিন্তু এখন সেখানে সুইমিংপুল নির্মাণের কারণে মেলার কিছুটা ক্ষতি হবে। আর এই মেলা নতুন প্রজন্মের জন্য দরকার। এভাবে ভবিষ্যতে অন্য কিছু নির্মাণ করে মেলাটি তুলে দেওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। তাই মেয়রের কাছে অনুরোধ করব, যেন বিজয় মেলার দিকটি ভেবে দেখেন তিনি।’
সিজেকেএস কর্মকর্তারা বলেন, সুইমিংপুলের স্থান নির্ধারণের জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও পরিকল্পনা কমিশন থেকে পৃথক দল এলাকাটি পরিদর্শন করেছিল। প্রথম দিকে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়ামের সামনে সুইমিংপুল নির্মাণের কথাবার্তা হলেও পরে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় সেটি হয়নি। এরপর আউটার স্টেডিয়ামকে নির্ধারণ করা হয়।
সিজেকেএসের কোষাধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন জাহাঙ্গীর বলেন, চট্টগ্রামের মতো জেলায় একটি সুইমিংপুল নেই, সেটা মানা যায় না। তবে মাঠও দরকার। কিন্তু সুইমিংপুলের বিকল্প জায়গা কোথাও নেই। আর এই পুলের জন্য মাঠও পুরোটা লাগবে না। মাঠের আয়তন প্রায় চার একর। অর্ধেকের বেশি মাঠের জন্য থাকবে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ স্টেডিয়াম এলাকা ছাড়া কোথাও সুইমিংপুল করতে রাজিও হবে না। কারণ এটির রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। তা করবে সিজেকেএস।
শুরু থেকেই আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিংপুল নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরী। তাঁর অনুসারী চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম বলেন, সুইমিংপুল দরকার। তবে তা খেলার মাঠে নয়, অন্য কোথাও হোক। মাঠের অভাবে যেখানে চট্টগ্রামের ক্রীড়াপ্রেমীরা এক মাঠে ২০-২৫টি ক্রিকেট ম্যাচ খেলে সেখানে চট্টগ্রাম আউটার স্টেডিয়ামের অর্ধেক দখল করে সুইমিংপুল কমপ্লেক্স নির্মাণ মেয়র হিসেবে নাছিরের অর্বাচীনতারই প্রমাণ !

এদিকে গত মঙ্গলবার আউটার স্টেডিয়ামে ছাত্রলীগের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর থেকে সুইমিং কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানান প্রকল্প প্রকৌশলী আওলাদ হোসেন।
এ বিষয়ে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, যেকোনো মূল্যে আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিংপুল হবে। চট্টগ্রামের জন্য সুইমিংপুলের দরকার রয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 125 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ