চর কুকরি মুকরির তথ্য ও ভ্রমণ আনন্দ

Print

যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। দৃষ্টিকে সম্মোহন করে হাতছানি দিতে থাকে টুকরো টুকরো নিবিড় বনভূমি। একদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, বৈরী বাতাস আর জলোচ্ছ্বাসের গর্জন আর অন্যদিকে দেশের মূলভূখন্ডের সঙ্গে জেগে ওঠা সবুজ দ্বীপ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। ওটাই চর কুকরি মুকরি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ৯৯ বছর আগে অর্থাৎ ১৯১২ সালে এই দ্বীপের জন্ম। প্রমত্তা মেঘনা যেখানে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলেছে, সেই সঙ্গমস্থলেই চর কুকরি মুকরি জেগে ওঠে।

চরটি জেগে ওঠার পর থেকেই এখানে নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি, তরুলতা জন্মাতে থাকে। ১৯৭৪ সালে উপকূলীয় এলাকায় বনায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এরপরই বন বিভাগ এখানে পরীক্ষামূলকভাবে বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই কর্মসূচিই পরবর্তী সময়ে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে সৃজিত বনসমূহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কয়েক শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে দায়িত্ব পালন করছেন।

জেগে ওঠার পরেই এখানে নিবিড় লালচে সবুজের সমারোহ চোখে পড়ে। সে সময়ের জার্মানির যুবরাজ প্রিন্স ব্রাউন জনমানবহীন এ দ্বীপে জাহাজ নিয়ে বেড়াতে আসেন। তার আসার উদ্দেশ্য ছিল শিকার করা। কিন্তু এখানে তিনি শিকার করতে এসে দেখতে পান কেবল কয়েকটি কুকুর ও বিড়াল ছোটাছুটি করছে। নির্জন এ দ্বীপটিকে তাই তিনি কুকরি মুকরি নামে ডাকতে থাকেন। তা থেকেই এ দ্বীপের নাম হয়ে যায় চর কুকরি মুকরি। এরপর কয়েক বছর এখানে পর্তুগিজ ও ওলন্দাজরা ঘাঁটি গেড়ে দস্যুপনায় মেতে ওঠে।

ভোলা জেলা শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে কুকরি মুকরির অবস্থান। এখন এটি একটি ইউনিয়ন। তিনটি চর রয়েছে এ ইউনিয়নে ঢাল চর, চর পাতিলা ও কুকরি মুকরি। ইউনিয়নটিতে ৩০ হাজার লোকের বাস। চারদিকে সাগরের নীল পানি। তাই সেখানে যেতে হয় ইঞ্জিন চালিত ট্রলার বা নৌকায়।

চরফ্যাশন উপজেলা থেকে বাসে দক্ষিণ আইচা গিয়ে সেখান থেকে রিকশায় এক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কচ্ছপিয়া হয়ে আঁকাবাঁকা নৌপথে যেতে হয় চর কুকরি মুকরি। চর কচ্ছপিয়ার বেড়িবাঁধে দাঁড়ালেই চর কুকরি মুকরি ও চর পাতিলার বিস্তৃত বনভূমি দেখা যায়। দু’ভাবে যাওয়া যায় চর কুকরি মুকরিতে- কচ্ছপিয়া থেকে সরাসরি অথবা চর পাতিলা হয়ে। তবে দুই ক্ষেত্রেই ভরসা সেই ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। চর কুকরি মুকরির ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে একটি খাল। খালটির নাম ভাড়ানি খাল। মেঘনার বিশাল বুক থেকে বয়ে গিয়ে খালটি পড়েছে বঙ্গোপসাগরে।

এখানকার ধু-ধু বালিয়াড়ির ওপর দাঁড়ালে সাগরের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাবে না। একটু সামনে এগোলেই ঢাল চর। এরপরই বঙ্গোপসাগর। এখানে উত্তাল ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখলেই মনে পড়ে যাবে কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের কথা। স্থানীয় মানুষ এ স্পটটিকে বালুর ধুম নামে ডাকে। তবে কুকরি মুকরির প্রধান আকর্ষণ সাগরপাড়। এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত কিংবা সূর্য ডোবার দৃশ্য ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করবে।

চর কুকরি মুকরির এ সৌন্দর্য খুব টানে পর্যটকদের। এখানকার ম্যানগ্রোভ বনে রয়েছে চিত্রাসহ নানা প্রজাতির হরিণ। নিঃশব্দে এগিয়ে গেলে হরিণের ছোটাছুটি দেখা যাবে। অন্যান্য দ্বীপের চেয়ে এটি ভিন্ন ধারার। তাই এখানে পর্যটনশিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, দেশের অন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যা রয়েছে তার সিংহভাগই এখানে অনুপস্থিত। নৌকা নিয়ে সারাদিন ভ্রমণ করা যায়। সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় নয়নাভিরাম নৈসর্গিক সৌন্দর্য। এখানে আসলে দেখা যায় উপকূলের সাহসী মানুষদের প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এক সংগ্রামী প্রেরণা ও প্রেয়সীর স্বপ্নের ঘর বাধার অপরুপ বাসনা। একটু চেষ্টা করলে চর কুকরি মুকরি হতে পারে পর্যটকদের এক অনিবার্য আকর্ষণ। এখান থেকে সরকারও রাজস্ব আয়ের এক স্থায়ী উৎস খুজে পেতে পারে। তাই এই দ্বীপটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 369 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ