চলতি বছরে গুম ৮৮, চার বছরে ২৮৪ জন

Print

বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল নিখোঁজ ও গুমের ঘটনা। রাজনৈতিক দলের কর্মী, পেশাজীবী, ছাত্র, শ্রমিক কেউ বাদ নেই নিখোঁজ ও গুমের তালিকায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর এসব ব্যক্তির আর খোঁজ মেলেনি। আবার অনেকেই স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। ২০১৬-এর ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় স্মরণকালের নৃশংস হামলাকারী ৫ জঙ্গিও হামলার কয়েক মাস আগে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ছিল। পুলিশ সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে নিখোঁজ ৪০ যুবকের তথ্য। এ ছাড়া রহস্যজনক নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরে আসার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে।
অপরদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ক্রমাগতভাবেই আসছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ২৮৪ জন গুম হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে। দিনের পর দিন মাসের পর মাস এমনকি বছর গড়িয়ে গেলেও তাদের খোঁজ মেলেনি। প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয়নি স্বজনদের।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ২৮৪ জন গুম হয়েছে। এদের মধ্যে ২০১৩ সালে ৫৩ জন, ২০১৪ সালে ৮৮ জন, ২০১৫ সালে ৫৫ গুম হয়েছে। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত গুম হয়েছেন ৮৮ জন। এই ৮৮ জনের মধ্যে ৮ জনের লাশ পরবর্তীতে উদ্ধার হয়েছে। ফেরত এসেছে তিনজন ও গ্রেফতার হয়েছে ২০ জন। অপর ৫৭ জনের কোনো হদিস মেলেনি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও নিজস্ব অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে আসকের ডকুমেন্টেশন বিভাগ জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র একজন, জামায়াতে ইসলামীর একজন, ছাত্র শিবিরের দুইজন, ব্যবসায়ী ছয়জন, আইনজীবী একজন, গৃহকর্মী একজন, চাকরিজীবী দুইজন, যুবলীগের তিনজন, বিআইডব্লিউটিসির ওয়ার্কার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক একজন, ছাত্র ১৫ জন, কৃষক একজন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা একজন, আওয়ামী লীগের একজন, ছাত্রলীগের একজন, শ্রমিক লীগের একজন, মসজিদের মোয়াজ্জিন একজন, শ্রমিক আটজন, মাদ্রাসা শিক্ষক ছয়জন, বিদ্যুৎ মিস্ত্রি একজন, কাঠমিস্ত্রি একজন, অটোরিকশাচালক একজন, পরিচয় জানা যায়নি ৩০ জনের।
এদিকে অপর মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৩ সালে ৫৩ জন, ২০১৪ সালে ৩৯ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন ও চলতি বছরের ১১ মাসে ৪৮ জন গুম হয়েছে। চলতি বছর গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে জানুয়ারিতে সাত, ফেব্রুয়ারিতে এক, মার্চে নয়, এপ্রিলে ১০, মে মাসে ১৩, জুনে ১৪, জুলাইতে চার, আগস্টে সাত, সেপ্টেম্বরে চার, অক্টোবরে সাত ও নভেম্বরে আটজন গুম হয়েছে।
এসব গুম-অপহরণের ক্ষেত্রে র‌্যাব, পুলিশ কিংবা ডিবি পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে ভিক্টিমদের স্বজনেরা। এই অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান মঙ্গলবার বলেন, ‘র‌্যাব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আসামি গ্রেফতার করে। কোনো আসামিকে গ্রেফতারের সময় র‌্যাব সদস্যরা নিজেদের পরিচয় দেন এবং গ্রেফতারের পর আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করেন। এক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। দুর্বৃত্তরা অনেক সময় র‌্যাব বা ডিবি পরিচয় দিয়ে অপহরণ করে থাকতে পারে। অপহরণ মামলায় বিভিন্ন সময়ে আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর র‌্যাব অনেক সময়ই জানতে পারে যারা গ্রেফতার করেছে তারা ভুয়া র‌্যাব বা ডিবি। এমন অনেক প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। তাই যারা র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ আনে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ সবসময় নিজেদের পরিচয় ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আসামি গ্রেফতার করে। গুম-অপহরণ জাতীয় অভিযোগের সঙ্গে কোনোভাবেই পুলিশ বা গোয়েন্দা পুলিশ সম্পৃক্ত নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা অপকর্মের কৌশল হিসেবে ডিবি বা পুলিশের পরিচয় ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।’
গত ৬ নভেম্বর দিনাজপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন কোলাবাড়ি দাখিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণীর ছাত্র মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান (১৫) ও দশম শ্রেণীর ছাত্র মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের পরিবার। আকতারুজ্জামানের বাবা সারোয়ার হোসাইন ও হাফিজুরের বাবা জিল্লুর রহমান দাবি করেন তাদের সন্তানকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য পরিচয়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে। সারোয়ার হোসেন জানান, ২৮ সেপ্টেম্বর রাত ১টার সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে তার ছেলে ও কোলাবাড়ি দাখিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণীর ছাত্র আক্তারুজ্জামানকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ মেলেনি। থানায় জিডি করার পরও পুলিশ আকতারুজ্জামানের কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। একইভাবে হাফিজুরের বাবা জিল্লুর রহমান অভিযোগ করেন ৪ অক্টোবর তার ছেলেকে অপরিচিত কিছু ব্যক্তি তুলে নিয়ে যায়। সে কোলাবাড়ি দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণীর ছাত্র। এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি।
গত ১৪ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৩টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে সাদা পোশাকে একদল যুবক ডাক্তার ইকবাল মাহমুদকে তুলে নেয়। সিসিটিভি ফুটেজে সেখানে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়ি দেখা যায়। ঘটনার ২ মাস পেরিয়ে গেলেও ডাক্তার ইকবাল মাহমুদের কোনো খোঁজ মেলেনি বলে দাবি করেন তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম। বরাবরই তার দাবি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা ছেলেকে আটক করেছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বরাবরই বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে।
গত ১৪ এপ্রিল শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের গজনী গ্রাম থেকে প্রভাত মারাক, বিভাস সাংমা ও ওরাজেস মারাককে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন পর্যন্ত এই তিন ছাত্রের কোনো হদিস মেলেনি বলে তাদের পরিবার যুগান্তরকে জানিয়েছে।
২০১৫ সালের ১৬ মার্চ ফকিরাপুলের বাসা থেকে ছাপাখানা ব্যবসায়ী মাজহারুল ইসলাম রুবেলকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তুলে নেয়া হয়। এর ৪ দিন পর ২০ মার্চ ফকিরাপুল পানির ট্যাংকির কাছ থেকে ছাপাখানা কর্মচারী রাজু ইসলাম ও শাওনকে একইভাবে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। রাজুর স্ত্রী রুমানা মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘এখনও আমার স্বামীকে ফেরত পাইনি।’ রুমানার দাবি ‘ডিবি বলছে তারা ধরে নিয়ে যায়নি।’ একইভাবে সন্ধান মেলেনি শাওনেরও।
এদিকে স্বেচ্ছায় বা রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে ১ জুলাই গুলশান হামলার পর। গুলশানে হামলাকারী যুবকরা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ছিল। একইভাবে নিখোঁজ ছিল শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত তরুণও। রাজধানীর কল্যাণপুর, রূপনগর, আজিমপুর, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া ও গাজীপুরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে নিহত জঙ্গিরাও নিখোঁজ ছিল। ‘নিখোঁজ’ থেকেই তারা বড় ধরনের হামলা ও নাশকতার চেষ্টা করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, এ বছর দেখা গেছে দেশের নব্য জেএমবির সদস্যরা কথিত হিজরতের নামে গৃহত্যাগ করে ও দেশান্তরী হয়। এসব নিখোঁজ ব্যক্তি জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাদের অনেকেই এখনও নিখোঁজ আছে।
গত ৩১ আগস্ট আইজিপি একেএম শহীদুল হক সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেন, সারা দেশে নিখোঁজ যুবকদের বিষয়ে বিশদ খোঁজখবর নেয়া হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তাদের মধ্যে ৪০ জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বছরের শেষ দিকে এসে বনানী থেকে ৫ তরুণসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় এক ডজন তরুণ নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
গুম প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়গুলো সব দেশের সরকারই অস্বীকার করে। যারা গুম হন তাদের বিষয়ে বলে থাকে হারিয়ে গেছে, নিখোঁজ আছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিখোঁজ বা গুম থাকা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা।
বছরজুড়েই গুমের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ভিক্টিমের আত্মীয়স্বজন প্রমাণ দিয়ে বলছেন, তাদের স্বজনকে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এটা বরাবরই অস্বীকার করছে। আমি মনে করি গুম বা অপহরণ যাই হোক এটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। আর কেউ স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হলে তাদেরকে খুঁজে বের করার দায়িত্বও পুলিশের।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল আলম বলেন, ‘গুম বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। গুমের কোনো অভিযোগ আসা মাত্রই অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়ে নিরপেক্ষভাবে তার তদন্ত করতে হবে। ভিক্টিম পরিবারকে তার স্বজনের অবস্থানের বিষয়ে জানাতে হবে।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিচালক নূর খান বলেন, ‘রাষ্ট্রের নাগরিকরা গুম হলে তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। এক্ষেত্রে সরকার একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে। ভিক্টিমের পরিবার, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীসহ সবাই তাতে সাক্ষ্য দেবেন। যাতে এসব গুমের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান বলেন, যাদের নাম করে এসব ব্যক্তিকে তুলে নেয়া হচ্ছে সেই আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীরই দায়িত্ব গুমের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। আমরা যদি ধরেও নেই অপরাধী চক্র আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভুয়া পরিচয়ে বিভিন্ন জনকে অপহরণ করছে বা তারা (ভিক্টিম) স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হচ্ছে তাহলেও তাদেরকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর। আর কেউ স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হলে তাদেরকেও খুঁজে বের করতে না পারলে তারা যে কোনো সময় বড় ধরনের নাশকতা ঘটাতে পারে। তিনি আরও বলেন, পুলিশের পোশাক, হ্যান্ডকাফসহ পুলিশের ব্যবহৃত সামগ্রী অবাধে বিক্রির বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 89 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ