ছাত্রজীবনে টিউশনির বিকল্প কী?

Print
ছাত্রজীবনে পড়াশোনাই যেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। ফাইল ছবিছাত্রজীবনে নিজ স্বপ্নের চারাগাছে যত্নের সময়টুকু নামমাত্র মূল্যের বিনিময়ে অন্যের স্বপ্নবীজ বোনার নামই টিউশনি। এই টিউশনি ঢাকা কিংবা মফস্বল শহরে লাখো ছাত্রছাত্রীর টিকে থাকার চাবিকাঠি। অনেকে একের অধিক টিউশনি করে সংসারও চালান। পাশাপাশি থাকে পড়াশোনার হ্যাপা। এ দুইয়ের মাঝে পড়ে শিক্ষার্থীদের জীবন চিড়ে-চ্যাপটা।

অথচ টিউশনির বিকল্প কর্মসংস্থানও রয়েছে, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী লেখাপড়ার পাশাপাশি একই সময়ে নিজস্ব ক্যারিয়ারও দাঁড় করাতে পারেন। যদিও এটা সত্য যে শিক্ষাজীবনে টিউশনি এখনো সবচেয়ে ভালো বিকল্প শিক্ষার্থীদের জন্য। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইদানীং অন্যান্য বিকল্পও জনপ্রিয়তা হতে শুরু করেছে। নতুন সম্ভাবনা হিসেবে তৈরি হচ্ছে আরও কিছু কর্মক্ষেত্র।

এসব কাজে যুক্ত হওয়ার সুবিধা হলো, এটি আপনার জন্য ক্যারিয়ারের প্রস্তুতিও হয়ে উঠতে পারে। এই অভিজ্ঞতা কর্মজীবনে কাজে লাগবে। পূর্ব অভিজ্ঞতা হিসেবে আপনি সিভিতে এর উল্লেখ করতে পারবেন; টিউশনির ক্ষেত্রে যেটা সম্ভব নয়।

ফ্রিল্যান্সিং
দেশের ৬৫ শতাংশই তরুণ। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেকার। যেহেতু পর্যাপ্ত চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না, সেহেতু বর্তমান সময়ে বিকল্প ক্যারিয়ার হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। অনলাইনের এ পেশা সম্মানজনক এবং মুক্ত। এক জরিপমতে, বাংলাদেশে এখনই ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক। সংখ্যাটা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিভাগ নেই। ধরে নেওয়া যাক, আপনি আঁকতে ভালোবাসেন, তাহলে গ্রাফিকস ডিজাইন শিখুন। গণিতে ভালো হলে শিখতে পারেন প্রোগ্রামিং কিংবা ওয়েব ডিজাইনিং। কিংবা ফটোগ্রাফিও শিখতে পারেন। তবে কোনো কিছুই বেসিক লেভেলে শিখবেন না। কেননা, বেসিক লেভেলের কোনো কাজ পাওয়া যায় না। যেকোনো কিছুই শিখুন না কেন, শিখতে হবে পেশাদার পর্যায়ে।

এ ব্যাপারে যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁদের পরামর্শ নিন কীভাবে শুরু করবেন, কী করবেন আর কী করবেন না।

বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ আছে শিক্ষার্থীদের। ফাইল ছবিঅনুবাদ
বিদেশি ভাষার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আপনি ঘরে বসেই আয় করতে পারেন। ইন্টারনেটে অনেকেই পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ভালো অনুবাদ খুঁজে থাকেন। এ ছাড়া ঢাকায় অনেক অনুবাদ কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে বেশির ভাগ মানুষই আসেন দুই-এক পৃষ্ঠা অনুবাদ করতে। প্রতি পৃষ্ঠায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা সম্মানী পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া নানা রকম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে খণ্ডকালীন অনুবাদের সুযোগ। এখানে আট থেকে কুড়ি হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। এ জন্য স্নাতক সম্পন্ন করার দরকার নেই, প্রয়োজন শুধু ভাষার সঠিক ব্যবহার।

প্রোডাক্ট রিভিউয়ার
পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের একটি বড় উৎস হতে পারে প্রোডাক্ট রিভিউয়ারের কাজ। এটা অ্যাফিলিয়েটেড মার্কেটিংয়ের অন্তর্ভুক্ত। অনলাইন শপিং দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় প্রোডাক্ট রিভিউ সাইটগুলোর জনপ্রিয়তাও হু হু করে বাড়ছে। অ্যামাজন কিংবা ই-বের কোনো পণ্য কেনার আগে মানুষ সাধারণত অনলাইনে সেসব পণ্যের রিভিউ পড়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চায়। আপনি এসব খ্যাতনামা অনলাইন শপিং জায়ান্টের পণ্যের রিভিউ লিখে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করতে পারেন। এ জন্য অবশ্য ইংরেজিতে ভালো হওয়া জরুরি। আপনার পর্যালোচনা পড়ে কোনো ক্রেতা অ্যামাজনের পণ্য কিনলে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কমিশন পাবেন। প্রোডাক্ট রিভিউ অ্যাফিলিয়েটেড মার্কেটিংয়ের অন্যতম মাধ্যম। এক জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৮০ শতাংশ ভোক্তার মত, প্রোডাক্ট রিভিউ তাদের কেনাকাটার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

ইউটিউব বা ইন্টারনেটে আছে আয়ের অনেক সুযোগ। ফাইল ছবিইউটিউব থেকে আয়
অনলাইনে আয়ের হাজারো পদ্ধতির মধ্যে ইউটিউব ভীষণ জনপ্রিয়। ইউটিউবে নিজের একটি চ্যানেল খুলে মজাদার ও শিক্ষণীয় ভিডিও আপলোড করে আয় করতে পারেন। চ্যানেল জনপ্রিয় হলে ইউটিউবের অ্যাডসেন্স পার্টনারশিপ থেকে অফার পেতে পারেন। ওদের অংশীদার হতে পারলে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জন সম্ভব। তবে এক ভিডিওর নামে অন্য ভিডিও দিয়ে প্রতারণা করলে আয় তো হবেই না, উল্টো চ্যানেল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কয়েক মাস আগে গুগল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব চ্যানেলে ১০ হাজারের কম ভিউ রয়েছে, সেসব চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে না। তবে ইউটিউবের নিয়ম মেনে ঠিকমতো চ্যানেল চালাতে পারলে ভালো অঙ্কের অর্থ আসবে।

লেখালেখি
ভালো লেখার হাত এবং ভালো জানাশোনা থাকলে এটা ছাত্রজীবনে টিউশনির দারুণ বিকল্প হতে পারে। ইন্টারনেটে সবকিছুই আসলে কনটেন্টনির্ভর। আপনি ইন্টারনেটে যা কিছু পড়ছেন, তা আপনার মতোই কেউ লিখেছে। অর্থাৎ, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পার্টটাইম কিংবা ফুলটাইম কনটেন্ট রাইটার রয়েছে। এ খাতে বেশ ভালো অঙ্কের অর্থ আয়ের সুযোগ আছে। ধরে নেওয়া যাক, আপনি অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার, মানে এ শাখায় আপনার ভালো জ্ঞান আছে। আপনি বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে লিখতে পারেন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। লেখালেখির বিষয় আসলে যেকোনো কিছুই হতে পারে।

অনলাইন ছাড়াও নানা পত্রপত্রিকা কিংবা ম্যাগাজিনে লিখতে পারেন। দৈনিক পত্রিকায় পেশাদার কলাম লেখকদের বেশ কদর। বাংলাদেশের বাইরেও নানা পত্রিকায় লিখতে পারেন। সে জন্য অবশ্য ভাষার দক্ষতা জরুরি। পত্রিকাগুলো নিয়মিত সাংবাদিকের বাইরে প্রচুর প্রদায়ক নিয়ে থাকে। প্রদায়ক হিসেবে কাজ করলে লেখার বিনিয়মে আয় করার পাশাপাশি এখানে আপনার ক্যারিয়ারও তৈরি হতে পারে।

খণ্ডকালীন চাকরি
বিভিন্ন নামকরা রেস্টুরেন্ট, ফ্যাশন হাউস নিয়মিত কর্মীর চেয়ে খণ্ডকালীন কর্মীর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। এসব প্রতিষ্ঠানে নিজের সুবিধামতো সময় বেছে নেওয়ারও সুযোগ থাকে। পারিশ্রমিকও মন্দ নয়।

প্রতি ঈদে প্রচুর খণ্ডকালীন কর্মী নেয় আড়ংয়ের মতো ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলো। ফাইল ছবি

 

ছোটখাটো ব্যবসা
আগামী উদ্যোক্তা হতে চাইলে ছাত্রজীবন থেকেই ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, পড়াশোনার কোনো ক্ষতি যেন না হয়। বাসায় বসে স্বল্প পুঁজিতে যেসব ব্যবসা করা যায়, সেসব নিয়ে কাজ করা ভালো। যেমন টি-শার্টের ডিজাইনিং ও বিক্রি, ইলেকট্রনিকস পণ্য মেরামত করে বিক্রি, অ্যাকুরিয়াম বানানো, বই বাঁধানো, এমনকি ছোটখাটো খামারও করতে পারেন। তবে গ্রামের ছাত্ররা ছোট পরিসরে খামার করার কার্যক্রম হাতে নিতে পারেন।

ঘরের বাইরেও এমন কিছু ব্যবসা রয়েছে, যেখানে স্বল্প পুঁজিতে টিকে থাকা যায়। ঢাকার রাস্তাঘাটে চায়ের দোকানের অভাব নেই। কিংবা ছোটখাটো খুপরি রেস্টুরেন্টও প্রচুর। দু-তিনটি চায়ের টং দোকান কিংবা একটি খুপরি রেস্টুরেন্ট নিশ্চিত করতে পারে আপনার টিকে থাকার ভিত্তি। মনে রাখবেন, লাভ-ক্ষতি ব্যবসারই অংশ। ছাত্রজীবনে সৃজনশীল ব্যবসায় মেধা খাটালে ক্ষতির ঝুঁকি কম।

তবে মনে রাখবেন
যা-ই করুন না কেন, মনে রাখবেন, পড়াশোনা যেন সব সময় আপনার অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে থাকে। নিজের পড়াশোনার ক্ষতি হয়—এমন কাজ থেকে বিরত থাকবেন। আরও বেশি আয়ের লোভে কাজে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে পড়াশোনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 67 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ