জঙ্গিবাদ : সমস্যা ও উত্তরণ ভাবনা

Print

আহমেদ ফরিদ, রাবি প্রতিনিধি
জঙ্গিবাদ। বর্তমান সময়ে একটি আতঙ্কের নাম। এটি এখন আন্তর্জাতিক সমস্যার পাশাপাশি আঞ্চলিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজধানীসহ সারাদেশের ইংলিশ মিডিয়াম কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদে।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণে সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক-প্রতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-ছাত্রনেতা ও অভিভাবকরা।

বৃহস্পতিবার জঙ্গি সন্দেহে তিন শিক্ষার্থীকে পুলিশে সোপর্দ করে রাবি ছাত্রলীগ। ওই তিনজনের একজন সাংবাদিকদের কাছে জিহাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেছেন, ফেসবুকে কিছুদিন ধরে কয়েকজনের জিহাদী পোস্ট পড়ে আন্তরিকভাবে ‘মহব্বত’ চলে আসে। চার-পাঁচদিন আগে তারা আমার বন্ধু হয়েছে। তাদের মাধ্যমেই জিহাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছি। জিহাদ ও জঙ্গীবাদ সম্পর্কে জানতে পারছি। তাদেরকে আমি চিনি না বা কখনও দেখাও হয়নি। তারা আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইরাক-আমেরিকার যুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিত।

শুধু গতকালের ঘটনায় নয়, এর আগের জঙ্গি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে বলে জানা গেছে। সমস্যা যাতে আর ছড়িয়ে না পড়ে তার জন্য এখন থেকেই সচেতন হওয়াও পরামর্শ বিশ্লেষকদের।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুজন মিয়া মনে করেন, বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার সহজলভ্য হওয়ার সাধারণ শিক্ষার্থীরা অনায়েসেই ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেটে ‘একটি শ্রেণি’ ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা সহজেই জঙ্গিবাদে জড়িয়েও পড়ছে। আর একজন শিক্ষার্থী যখন এসব কাজে উদ্ভুদ্ধ হচ্ছে বা জড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা দেখা দিচ্ছে তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ওই শিক্ষার্থীকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

জানতে চাইলে রাবি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, জঙ্গিবাদ বর্তমান সময়ে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের বিষয় বর্তমানে বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। প্রধান সমস্যা ধর্মীয় শিক্ষানীতি। ধর্মীয় শিক্ষানীতির কারণে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের প্রতি সমর্থন দিচ্ছে না। যার ফলে তাদের মধ্যে উগ্রতা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা যদি অসাম্প্রদায়িক হয় এবং তার চর্চা করা হয় তাহলেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, শিক্ষার পাশাপাশি যদি সংস্কৃতি চর্চা না করা হয় তাহলে উগ্রতা বৃদ্ধি পাবে। আর একটি বিষয় হচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের প্রসার হচ্ছে। অনলাইনের এ প্রসার কমাতে সরকারকে আইসিটি আইনের ব্যস্তবিক প্রয়োগ করতে হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক তমাশ্রী দাস বলেন, জঙ্গিবাদ একটি সামাজিক সমস্যা। এটাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে। এটার পেছনে সচেতনতা কোনো বিষয় না। রাষ্ট্র বা সমাজ যেভাবে ইন্ধন দিচ্ছে তাতে শিক্ষার্থীদের পছন্দ হচ্ছে এবং তারা আগ্রহী হচ্ছে।

যারা প্রগতিশীলতার চিন্তা করে তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যেসব সাধারণ শিক্ষার্থী চায় না যে মানুষ ধর্মীয় মৌলবাদে উদ্বুদ্ধ হোক তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়েই এসবের মোকাবেলা করতে হবে। এছাড়া এটার আর কোনো সমাধান নেই বলে মনে করেন তিনি। ক্যাম্পাসে যে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চলছে সুস্থধারার রাজনৈতিক চর্চা, প্রগতিশীল রাজনৈতিক চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা এগুলোকে সান্ধ্য আইন দিয়ে অবরুদ্ধ করা হচ্ছে। এসব কারণে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। সেই সঙ্গে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করছে পশ্চিমা বিশ্ব। ইসলামকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য পবিত্র কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। যার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম ধর্মের কথা শুনে অনায়াসেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে।

কোন ধরণের পরিবেশের পরিস্থির মধ্যে একজন তরুণ বেড়ে উঠেছে, তার বিশ্বাসের জায়গাগুলো কিভাবে তৈরি হয়েছে, কোন বিষয়ে তার আগ্রহ বেশি জন্মেছে, সেসব বিষয় আমাদের প্রথমে বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবা কানিজ কেয়া। তিনি বলেন, মানুষ সাধারণত দুইভাবে শেখে। প্রথমত, কাউকে আদর্শ ভাবার জায়গা থেকে তার কাছ থেকে শিখতে পারে। দ্বিতীয়ত, পরিবারের শিক্ষা অর্থাৎ সে কোন পরিবেশে বড় হয়েছে তা থেকে।

একজন শিক্ষার্থী হঠাৎ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেই জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হবে বলে আমার মনে হয় না। তার আগ্রহের জায়গা থেকেই সে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ সামাজিক মাধ্যমে কিছু দেখলেই তাতে আকৃষ্ট হতে পারে না। তার অধিক আগ্রহের জায়গা থেকেই এটি ঘটে। এর জন্য সে যে পরিবেশ থেকে বেড়ে ওঠছে সেটা বড় বিষয় বলে মনে করেন তিনি।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান বলেন, মূলত হতাশা থেকেই সাধারণত শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষাজীবনে এসে যেকোনো কারণে রেজাল্ট ভালো না করলে তখন শিক্ষার্থীদের মন দুর্বল হয়ে পড়ে। শুধু রেজাল্টের কারণেই নয়, আর্থিক কারণও থাকতে পারে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ‘একটা গোষ্ঠী’ তাদের নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। এই গোষ্ঠী একটা ধর্মীয় ইমোশনে ফেলে। আবার অনেক সময় তারা শিক্ষার্থীদের অর্থ দিয়েও সহযোগিতা করে। যখন শিক্ষার্থীরা সহজেই অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে পারছে তখন ওই গোষ্ঠীর দিকে একটা বিশ্বস্থতা তৈরি হচ্ছে। এভাবেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদের দিকে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি আরো বলেন, জঙ্গিবাদ সমস্যা সমাধানে তিনটা লেভেল থেকেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্রথমত পারিবারিক লেভেল থেকে। শিক্ষার্থী কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তার খোঁজ-খবর রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিকভাবে। সমাজেরও একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। সমাজের যারা শিক্ষিত মানুষ রয়েছে তাঁদেরও এই বিষয়গুলো দেখতে হবে। আর তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় রাষ্ট্রেরও প্রতিষ্ঠানিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। বিভাগের শিক্ষকদের এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতে হবে। যখন দেশে জঙ্গিবাদ সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণার আয়োজন করতে পেরেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবসময় জঙ্গিবাদ সমস্যা সমাধানে সজাগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 128 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ