জনপ্রিয় প্রার্থীর খোঁজে আওয়ামী লীগ

Print

আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জিং মনে করে যোগ্য প্রার্থীর সন্ধানে নেমেছে আওয়ামী লীগ। অস্তিত্বের সংকটে পড়া বিএনপির ‘নির্বাচনী কামড়’ মাথায় রেখেই জনপ্রিয় প্রার্থী খুঁজছে টানা দুবার ক্ষমতায় থাকা দলটি। ইতোমধ্যে বিতর্কিত ও জনপ্রিয়তায় তলানিতে নামা শতাধিক এমপির আসনে নতুন মুখের সন্ধান পেয়েছে তিন ক্যাটাগরির জরিপকারী দল। চুলচেরা বিশ্লেষণের পরই চূড়ান্ত হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একাদশ নির্বাচনে কে হচ্ছেন নৌকার প্রার্থী।
দলীয় মনোনয়ন নিয়ে কাজ করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের এমন কয়েক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের মনোনয়ন নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের শীর্ষ কয়েক নেতাকে ‘জনপ্রিয় প্রার্থী’ তালিকা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ নিয়ে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা নিজ নিজ বিভাগে জরিপ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্যাটাগরি ঠিক করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, এলাকায় বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্নদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে জানিয়ে বলেন, কে কী করছে তার রিপোর্ট আমার হাতে আছে।

আগের নির্বাচনগুলোয় দলীয় সভানেত্রীর তিন শর্তকে প্রাধান্য দিয়ে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান তারা। শর্ত তিনটি হলো যেসব নেতাকর্মী শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকা- করেছেন তারা প্রার্থী হতে পারবেন না। কোনো রাজাকার ও তার সন্তান নৌকা প্রতীক পাবে না। পূর্বে দল থেকে বহিষ্কৃত কাউকে দলে এনে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না।’ সেই সঙ্গে কারা আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্য তা যাচাই করতে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও দলের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে চালানো হয়েছে বিশেষ জরিপ। কয়েক দফায় চালানো এসব জরিপে শতাধিক আসনে নতুন ও ক্লিন ইমেজের নেতার নাম এসেছে। আগামীতে আরও দুই-একবার জরিপ চালিয়ে চূড়ান্ত বাছাই তালিকা করার কথা জানিয়েছেন তারা।
আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জিং উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক গতকাল বলেন, আগামী নির্বাচনে আমাদের জিততেই হবে। এজন্য অধিকতর জনপ্রিয় ও ক্লিন ইমেজের প্রাথী খোঁজা হচ্ছে। যারা দলের মনোনয়ন নিয়ে এমপি হয়ে দলের নীতি-আদর্শ ও নির্দেশনা ঠিক রাখতে পারেননি, দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করেননি, ক্ষমতায় থেকে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন তারা যত বড় নেতাই হোন মনোনয়ন পাবেন না। যারা দলের আদর্শের প্রতি আস্থাবান, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ অনুসরণ করেন, দেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তারাই মনোনয়ন পাবেন। এ ছাড়া দলীয় মনোনয়ন পেতে সাংগঠনিক রিপোর্টের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি জরিপও গুরুত্ব পাবে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের বদ্ধমূল ধারণা অস্তিত্বের সংকটে পড়া বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে এবং এই নির্বাচনের মাধ্যমে দলের ইমেজ পুনরুদ্ধার ও ক্ষমতাসীন হওয়ার চেষ্টা করবে। ফলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে কোনোভাবেই যাচ্ছেতাই প্রার্থী দেবে না আওয়ামী লীগ। এজন্য যেসব আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এমপি হয়ে যারা দলের ইমেজ ক্ষুণ করেছে, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ঘটিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছে, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করেছে তারা মনোনয়নবঞ্চিত হবে। এমন বিতর্কিত শতাধিক দলীয় আসনে নতুন মুখের সন্ধান করছে আওয়ামী লীগ।
লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের বর্তমান এমপি মো. আব্দুল্লাহ। তিনি এবারই প্রথম নির্বাচিত হয়েছেন। এমপি হওয়ার পর থেকে এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীর বাইরে আত্মীয়স্বজন দিয়ে একটি নিজস্ব বলয় সৃষ্টির অভিযোগ আছে। একই সঙ্গে মনোনয়নবাণিজ্য ও চাকরির নামে অর্থ লেনদেন, বাসস্ট্যান্ড ও নৌঘাটে চাঁদাবাজির অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। আসনটিতে এবারের জনপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে ফরিদুন্নাহার লাইলীর নাম উঠে এসেছে। লাইলী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি প্রার্থী হিসেবে এলাকায় প্রচার চালিয়ে যচ্ছেন কুয়েত প্রাবসী কাজী সহিদুল ইসলাম পাপন। আসনটিতে জাতীয় পার্টির এমপি মোহাম্মদ নোমান।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনে আনোয়ার খান মেডিক্যাল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার খান মনোনয়ন পেতে পারেন। ইতোমধ্যে তিনি প্রচারের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। আসনটির বর্তমান এমপি তরিকত ফেডারেশনের এমএ আউয়াল।
ফেনী-১ আসনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন আলাউদ্দিন আহমেদ নাসিম। আসনটির বতর্মান এমপি জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার।
শরীয়তপুর-২ আসনের বর্তমান আওয়ামী লীগের এমপি শওকত আলী। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হওয়ায় দলীয় কর্মকা-ে তিনি নিষ্ক্রিয়। আসনটিতে এবার মনোনয়ন পেতে কাজ করছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম।
নরসিংদী-৫ আসনের বর্র্তমান এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু। আসনটিতে মনোনয়ন পেতে কাজ করছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবীর কাওছার।
ঢাকা-২ আসনে মনোনয়ন পেতে কাজ করছেন প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য দুবারের শ্রেষ্ঠ জাতীয় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ। কেরানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়কও তিনি। আসনটির বর্তমান এমপি খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। তিনি আবারও মনোনয়ন পেতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
ঢাকা-৭ আসনে এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে পারেন হাজী সেলিম। আসনটিতে দলীয় মনোনয়ন পেয়েও বিদ্রোহী প্রার্থী হাজী সেলিমের কাছে পরাজিত হন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। আসনটিতে তিনি আবারও দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রেখেছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন সাবেক এমপি আবদুল্লাহ-আল-কায়সার।
খুলনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি পঞ্চানন বিশ্বাস। এলাকায় অনেকটাই নিষ্ক্রিয় তিনি। এ আসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক শেখ সোহেলের নির্বাচন করার কথা রয়েছে। তিনি প্রয়াত শেখ আবু নাসেরের ছেলে।
খুলনা-২ আসনে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন মিজানুর রহমান। দখলবাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপকর্ম ও দুষ্কৃতকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এ আসনে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলামের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
খুলনা-৩ আসনে বর্তমান এমপি মন্নুজান সুফিয়ান। আসনটিতে এবার মনোনয়ন পেতে পারেন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম কামাল।
খুলনা-৫ আসনে বর্তমান এমপি নারায়ণচন্দ্র চন্দ। তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী। এ আসনে প্রবাসী প্রফেসর ড. মাহবুবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতা অজয় সরকার দলীয় প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
খুলনা-৬ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি মো. নুরুল হকের বিরুদ্ধে ঘের দখল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের নামে অর্থ আদায়সহ নানা বিতর্কিত কর্মকা-ের অভিযোগ আছে। তার বড় পুত্র শেখ মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইটভাটা, জমি দখল সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। অন্যদিকে বিগত সংসদ সদস্য সোহরাব আলী সানা একই বিতর্কে বিতর্কিত। আসনটিতে এবার প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান মনোনয়ন পেতে পারেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ থেকেও সে দাবি জোরালো হচ্ছে।
নীলফামারী-১ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মো. আফতাবউদ্দিন সরকার। আসনটিতে মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত আমিনুর সরকার। প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হওয়া নীলফামারী-৩ আসনের এমপি গোলাম মোস্তফার স্থানে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।
আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী  বলেন, সব দলের অংশগ্রহণে সেই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিপূর্ণ করতে আওয়ামী লীগ কাজ করছে। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে দলে জনপ্রিয় প্রার্থীর সন্ধানে নেমেছি। আশা করি আগামী নির্বাচনে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আবার সরকার গঠন করবে আওয়ামী লীগ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 88 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ