জেনে নিন; নামজারির প্রকারভেদ ও পদ্ধতি

Print

Namjari-prokerved

নামজারিকরণের বিভিন্ন পদ্ধতি:

বিভিন্ন ক্ষেত্রে নামজারির প্রয়োজন হলে নিম্নবর্ণিত দুটি পদ্ধতিতে নামজারি ও জমা খারিজ করা হয়ে থাকে:
(ক) সরাসরি আবেদনের প্রেক্ষিতে নামজারি বা জমা খারিজ।
(খ) এল টি নোটিশের কারণে নামজারি।

(ক) সরাসরি আবেদনের প্রেক্ষিতে নামজারি বা জমা খারিজ

নামজারি মামলার শুরু হয় কোন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে অথবা ভূমি হস্তান্তর নোটিশ (এল টি নোটিশ) প্রাপ্তির পর থেকে এবং নিষ্পত্তি হয় একটি নতুন খতিয়ান খোলার মাধ্যমে। নিম্নে নামজারি মামলার বিভিন্ন পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো ঃ

১. আবেদনকারীর নিকট থেকে আবেদনপত্র/ভূমি হস্তান্তরের নোটিশ পাওয়ার পর তা বাছাই করতে হবে এবং বাছাই অন্তে সঠিক পাওয়া গেলে তা রেজিষ্টার-৯ এর প্রথম খণ্ডে/২য় খণ্ডে এন্ট্রি দিতে হবে।

২. আবেদনের উপর অর্ডারশীট লাগিয়ে আদেশ দ্বারা অথবা স্থানীয় তদন্তের জন্য প্রেরিত আবেদন রেজিঃ ১৪-এর মাধ্যমে এন্ট্রি দিয়ে তহশীলদাররের নিকট প্রেরণের লক্ষ্যে ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রেরণ করতে হবে।

৩. তহশীলদার আবেদনপত্র/হস্তান্তর নোটিশ পাওয়ার পর সরেজমিন তদন্ত করে নির্ধারিত মহাল পরিবর্তনের ফরম-এ (ফরম নং ১০৭৯)/ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের ৩১৭ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্ধারিত ফরম-এ (ফরম নং ১০৭৮) বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন।

তহশীলদার মহাল পরিবর্তনের ফরমের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ফাঁকা স্থানে অথবা প্রয়োজনে অতিরিক্ত কাগজ যুক্ত করে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে সম্বোধন করে নামজারি প্রস্তাবের যুক্তি এবং সর্বশেষ আইনানুগ রেকর্ডের ধারাবাহিকতায় বিক্রেতার জমির মালিকানা অর্জনের ধারাবাহিক ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে। একই সংঙ্গে প্রস্তাবিত জমি সরকারি খাস/অর্পিত/সমর্পিত/পাবলিক ইজমেন্ট/সায়রাতভুক্ত নয় মর্মে প্রত্যয়ন প্রদার করবেন।

৪. প্রতিবেদন পাওয়ার পর রেজিষ্টার অনুযায়ী মামলার নং উল্লেখ করতঃ রেজিষ্টার-১ অনুযায়ী রেকর্ডভুক্ত মালিক ও আবেদনকারী/হস্তান্তর গ্রহীতাকে নোটিশ দিতে হবে। নোটিশ প্রদানের প্রসেস ফি কোর্ট ফি এর মাধ্যমে আবেদনকারী বহন করিবেন। উক্ত নোটিশে শুনানির তারিখ উল্লেখ থাকবে।

৫. নির্ধারিত শুনানির তারিখে সহকারী কমিশনার (ভূমি) উপজেলা রাজস্ব অফিসার বিস্তারিত শুনানি গ্রহণ করবেন এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রাদি/প্রতিবেদন/রেকর্ড/দলিলপত্র/সনদপত্র ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবেন।

৬. বিস্তারিত শ্রবণান্তে ও পর্যালোচনান্তে সহকারী কমিশনার (ভূমি)/ উপজেলা রাজস্ব কর্মকার্তা নামজারি ও জমা খারিজের আদেশ প্রদান করবেন এবং কানুনগো/সার্ভেয়ার ও তহশীলদারকে উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের রেকর্ড সংশোধন করার আদেশ দিবেন।

৭. নির্ধারিত খতিয়ান ফিস আদায় করার পর কানুনগো/সার্ভেয়ার/খতিয়ান/পর্চা প্রস্তুত করে সহকারী কমিশনার (ভূমি)/উপজেলা রাজস্ব অফিসের স্বাক্ষর নিবেন ও রেজিষ্টার-৯ এর ১ম/২য় খণ্ডে হালনাগাদ করবেন।

৮. খতিয়ান/পর্চা তিন কপি প্রস্তুত করতে হবে এবং এক কপির মাধ্যমে উপজেলা ভূমি অফিসের রেকর্ড সংশোধন করতে হবে, ২য় কপির মাধ্যমে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের রেকর্ড সংশোধন করা হবে এবং ৩য় কপি জেলার রেকর্ড রুমে সংরক্ষণের জন্য প্রেরণ করতে হবে।

৯. মূল কপির অনুরুপ একটি কপি খতিয়ান ফি ২৫/- টাকা (বর্তমানে ২৫০/- টাকা) আদায়ের পর, নামজারি কেস আবেদনের গ্রহণের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলে আবেদনকারীকে প্রদান করতে হবে।

১০. ভূমি হস্তান্তর নোটিশের মাধ্যমে নামজারি হওয়ার খতিয়ান সংশোধন করতে হবে। প্রত্যেক হস্তান্তর বা উত্তরাধিকার বলে মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পৃথক নামজারি কেস রুজু করতে হবে।

১১. নতুন খতিয়ান নামজারি সংশোধনের মাধ্যমে সৃজিত হওয়ার পর উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ১, ২ ও ৯ নং রেজিষ্টার হালনাগাদ করতে হবে।

১২. রেজিষ্টার ২ হালনাগাদকরণের ফলে পুরাতন হোল্ডিং এ বর্ণিত জমির পরিমাণে হ্রাস বৃদ্ধি ঘটবে অথবা নতুন হোল্ডিং সৃষ্টি করতে হবে।

১৩. প্রজাবিলি অর্থাৎ ব্যক্তি বা সংস্থার মালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রে আদালতের ডিক্রি রেজিষ্ট্রিকৃত হস্তান্তর দলিলের অনুরুপ বলে গণ্য করতে হবে। ডিক্রি পরীক্ষা করে নামজারি আদেশ প্রদান করতে হবে।

১৪. উত্তরাধিকার বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নামজারির সঙ্গে সঙ্গে সংশোধিত খতিয়ানের একটি কপি সহকারী কমিশনার (ভূমি) সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট প্রেরণ করবেন এবং তিনি তাৎক্ষণিকভাবে খসড়া রেকর্ড প্রণয়নের সময় সংশোধিত খতিয়ানকেই ভিত্তি করে নতুন খতিয়ান প্রনয়ন করবেন।

১৫. সমবায় সমিতির ক্ষেত্রে প্রথমে সদস্যের নামে জমি বারদ্দ করবার পূর্বে সমবায় সমিতিকে প্রথমে অর্জিত সম্পত্তি স্বীয় নামে নামজারি করতে হবে। সাবেক মালিকের স্থলে প্রথমে সমিতির নামে নামজারি হওয়ার প্রয়োজন। সমিতির নামে নামজারি হওয়ার পর বরাদ্দকারীর নামে নামজারি করাতে হবে এবং নতুন খতিয়ান খুলতে হবে। সমিতি কর্তৃক নামজারির আবেদন দাখিল করবার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, নামজারির কেসসমূহ খতিয়ান/হোল্ডিংভিত্তিতে যেন দাখিল করা হয়।
নামজারি মামলার শুনানি:

নামজারি কার্যক্রম পরিচালনায় বিচারিক মনোভাব প্রয়োগের পাশাপাশি নিম্নোক্ত বিষয়াদি যথাযথভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে ঃ

১. আবেদনপত্র/এল, টি নোটিশ পরীক্ষা করতে হবে যেন উহাতে ভূমির সম্পূর্ণ বিবরণ আছে কিনা এবং আবেদনটি সংশ্লিষ্ট উপজেলা এলাকার কিনা;

২. আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট ভূমির ভোগদখলে আছেন কিনা এবং তাহা সরেজমিনে তদন্তের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে কিনা;

৩. প্রস্তাবিত ভূমির ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া আছে কিনা এবং অনাদায়ে কোন সার্টিফিকেট মামলা রুজু করা আছে কিনা;

৪. প্রস্তাবিত ভূমির উপর কোন স্বত্ব মামলা জড়িত আছে কিনা এবং ইহা সরকারি কোন স্বার্থকে আকৃষ্ট করে কিনা;

৫. প্রস্তাবিত ভূমিতে সরকারি কোন স্বার্থ জড়িত আছে কিনা অর্থাৎ কোন সম্পত্তি খাস/অর্পিত/সার্টিফিকেট মামলাভুক্ত ভূমি কিনা; প্রস্তাবিত ভূমি দেবোত্তর বা ওয়াকফ এস্টেটের ভূমি কিনা; প্রস্তাবিত ভূমি রাষ্ট্রপতির আদেশ ৯৮/৭২ এর আওতায় সমর্পিত ভূমি কিনা; প্রস্তাবিত ভূমি সরকারের কোন সায়রাত মহালভুক্ত ভূমি কিনা; প্রস্তাবিত ভূমি বিনিময় মামলার আওতাভুক্ত বিনিময়কৃত ভূমি কিনা তা যাচাই করা। এ মর্মে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার নিকট হতে প্রত্যয়ন গ্রহণ করা।

৬. ১নং রেজিষ্টারের রেকর্ডভুক্ত তফসিল ও রেজিষ্ট্রি দলিলের তফসিলের মধ্যে কোন গরমিল আছে কিনা;

৭. তহশীলদার কর্তৃক পরিচালিত সরেজমিনে তদন্তে কাহারো কোন সম্পত্তি পাওয়া গিয়েছে কিনা;

৮. দাগে থাকা ভূমির আংশিক নামজারি ক্ষেত্রে সার্ভেয়ার দ্বারা ডিমারকেশন প্রয়োজন আছে কিনা;

৯. প্রস্তাবিত ভূমি ‘ভূম সংস্কার অধ্যাদেশ ১৯৮৪’ এর আওতায় সরকার কর্তৃক অর্জিত ভূমি কিনা;

১০. প্রস্তাবিত ভূমি আবেদনকারীর নামে নামজারি ও জমাখারিজ করা হলে তার ৬০ বিঘা ভূমি সীমা অতিক্রম করবে কিনা;

১১. আবেদনকারী যে দলিলের মাধ্যমে নামজারির আবেদন করেছেন তা জরিপপূর্ব কোন সময়ের দলিল কিনা;

১২. তদন্ত প্রতিবেদনে প্রদত্ত তহশীলদারের মতামত সুস্পষ্ট কিনা;

১৩. ক্রয় দলিল এবং ক্রয়ের সূত্র দলিলের নম্বর ও তারিখ প্রস্তাব শীটের মন্তব্য কলামে উল্লেখ আছে কিনা;

১৪. উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারি ক্ষেত্রে কোন উত্তরাধিকারী বাদ পড়েছে কিনা, বিশেষ করে কোন মেয়ে উত্তরাধিকারী বাদ পড়েছে কিনা;

১৫. বাটোয়ারা দলিল বিবেচনায় আনয়ন করতে হলে দলিলটি রেজিষ্ট্রিকৃত কিনা তা বিবেচনায় আনয়ন করতে হবে;

১৬. সূত্র দলিল/ভায়া দলিলের ধারাবাহিকতা বিবেচনা আনয়ন করতে হবে;

(খ) এল.টি. নোটিশের ভিত্তিতে নামজারি ঃ

ভূমি হস্তান্তর নোটিশ প্রাপ্তির পর নামজারি কেস সৃজন করা হয়। এই হস্তান্তর নোটিশ প্রাপ্তির পর সৃজিত নামজারি কেস তদন্তের জন্য তহশীল অফিসে প্রেরণ করা হয়। তহশীলদার তার তদন্ত প্রতিবেদনে নিম্নোক্ত বিষয়াদি অবশ্যই উল্লেখ করবেন ঃ

১. প্রজাস্বত্বের প্রকৃতি, জমির পরিমাণ এবং রাজস্ব/ভূমি উন্নয়ন কর সঠিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কিনা;

২. হস্তান্তরকারী জমির দখলে আছেন কিনা এবং ভূমির মালিক হিসাবে খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত আছেন কিনা;

৩. ক্রেতা জমির দখল পেয়েছে কিনা;

৪. হস্তান্তরিত জমি অধিভুক্ত জোতের অংশ কিনা অথবা পৃথক প্লটভুক্ত অংশ হস্তান্তরিত হয়ে থাকলে দাগ নম্বর উল্লেখ করতে হবে। তা উল্লেখ আছে কিনা;

৫. এজমালী বা অধিভুক্ত জোতের অংশ হস্তান্তরিত হয়ে থাকলে গ্রহীতা জমা পৃথক করতে চাহেন কিনা; জমা পৃথকীকরণ করতে চাইলে প্রদেয় রাজস্ব/ভূমি উন্নয়ন কর পৃথকভাবে নির্ধারিত করতে কোন আইনগত বাধা আছে কিনা;

৬. এই জমি অন্য জোতের সাথে একত্রিত করা যায় কিনা;

৭. এই জমির রাজস্ব/ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া আছে কিনা এবং থাকলে সার্টিফিকেট মামলা চালু আছে কিনা।

ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের ৩১৮ নং অনুচ্ছেদে এল.টি নোটিশের ভিত্তিতে নামজারির ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, হস্তান্তরিত নামজারির ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। দলিলদাতাকে অবশ্যই খতিয়ানের মালিক হতে হবে। হালকরণকৃত খতিয়ানের মালিক ব্যতীত অন্য কোন সূত্রে মালিকানার দাবিদার এরুপ ব্যক্তি হস্তান্তর দলিল সম্পাদন করলে তার ভিত্তিতে নামজারি করা রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারার পরিপন্থী।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 723 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ