জেনে নিন বাটোয়ারা আইনের নানা দিক

Print

কোন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি ন্যায়সংগতভাবে অথবা প্রচলিত আইন অনুসারে উপযুক্ত উত্তরাধিকারী বা মালিকগণের মধ্যে আপোষ-বন্টনমূলে স্থানীয় শালিসগণের মধ্যস্থতায় অথবা দেওয়ানী আদালতের মাধ্যমে ভাগ-বন্টন করে নেওয়ার নাম বাটোয়ারা। যৌথ মালিকানা বা উত্তরাধিকারের সম্পত্তি পৃথকভাবে ভোগ-দখলের রুপান্তর ঘটানো-ই বাটোয়ারার উদ্দেশ্য।

১) বাটোয়ারা কেন করবেন
যৌথ বা এজমালী সম্পত্তি ভোগ-দখলে, সহ-মালিক কর্তৃক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে বা আপনার ন্যায়সংগত হিস্যাংশ প্রাপ্তিতে অন্তরায় বা বাঁধা সৃষ্টি হলে, আপনি মৌখিক বা লিখিতভাবে আপনার অংশ ভোগ-দখল দাবি করার পরেও যদি তিনি/তাঁরা বুঝিয়ে না দেন বা অস্বীকার করেন, এমতাবস্থায় দেওয়ানী আদালতে বাটোয়ারার মামলা দায়ের করা আপনার আইনসংগত অধিকার। বাটোয়ারা অন্যের প্রতি অন্যায় নয়, বরং প্রচলিত আইন মোতাবেক নিগৃহীত ব্যক্তির অধিকার আদায়ের রক্ষা কবজ।
(এ.আই.আর.-১৯৫৪, এস.সি.-৫৭৫ ও এ.আই.আর.-১৯২৩, কলি-৫০১)

২) সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে বাটোয়ারা
বাটোয়ারা শুধুমাত্র সম্পত্তির ভাগ-বন্টন নয়। ব্যাপক অর্থে বাটোয়ারা এক ধরনের হস্তান্তর বটে। কেননা এ আইনে একই স্বত্ব পরবর্তীতে মালিকানার হিস্যানুযায়ী বিভিন্ন অংশে বিভক্তি তথা বিনিময় হয়। তবে, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১১৮ ধারা মোতাবেক কোন যৌথ সম্পত্তির বাটোয়ারা হস্তান্তর নয় (১০ সি.এল.জে.-৫০৩, ২০ সি.-২১০)। বাটোয়ারা সম্পত্তি হস্তান্তরের সাথে সম্পৃক্ত নয় (৪৯ সি.ডব্লিউ.এন.-৭৬৯ ও ৭৭৯, ১৯৫০ বোম্বে-২৪৭)

৩) দখলকারকে বহিস্কার সংক্রান্ত
একজন সহ-অংশীদার যদি কোন যৌথ সম্পত্তির সু-নির্দিষ্ট অংশে ভোগ-দখলকার থাকেন, তবে উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বা সকল সহ-মালিকের মধ্যে বন্টন ব্যতীত, তাঁকে বহিস্কার বা উচ্ছেদ করা যাবে না (পি.এল.জে.-১৯০০ লাহোর-২৩৪)

৪) বাটোয়ারায় পথাধিকার
কোন বিরুদ্ধ পথাধিকার প্রকাশ বা সুপ্ত মনোভাব না থাকলে সেক্ষেত্রে নিজ নিজ ভোগাধিকার অনুযায়ী পথাধিকার সুবিধা প্রদেয় বলে গণ্য হবে, যদি তা আবশ্যিক এবং অব্যহত বলে প্রতীয়মান হয় (১৪ বোম্বে-৪৫২, ১৪ সি.-৭৯৭, ২৬ সি.-৫১৬, সি.এল.জে-৪০৬)

৫) সহ-মালিকের একচ্ছত্র দখল
কোন যৌথ সম্পত্তির একটি সু-নির্দিষ্ট অংশ (লাভজনক), অন্যান্য সহ-অংশীদার বা সহ-মালিকগণের সম্মতি ব্যতীত কোন একজন অংশীদার একচ্ছত্র দখলকার হিসেবে দখল প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না (১৯৬০-১২ ডি.এল.আর-৭০৮)। উল্লেখ্য, যদি যৌথ মালিকানার সম্পত্তি হতে, কোন এক জনের সু-নির্দিষ্ট অংশ খরিদ করেন, তবে উক্ত সম্পত্তি বাটোয়ারা না হওয়া পযর্ন্ত তিনি (খরিদা মালিক) উক্ত সম্পত্তির দখল অধিকার প্রাপ্ত হবেন (১৯৫৯-১১ ডি.এল.আর. এস.সি.-৭৮)

৬) বিবাহ জনিত কারনে পৈত্রিক ভিটায় বোনের দখল
একজন উত্তরাধিকারিনী পৈত্রিক ভিটায় অবস্থিত কোন বসতগৃহ বা কুটিরে বিবাহ পযর্ন্ত সহ-অংশীদার হিসেবে বিবেচ্য হবেন। পরবর্তীতে উত্তরাধিকারিনীর (কন্যা সন্তান) অন্যত্র বিবাহ হলে, তিনি আগন্তুক হিসেবে বিবেচিত হবেন। তাই তিনি উক্ত পৈত্রিক ভিটায় অবস্থিত বসতগৃহ বা কুটিরের কোন একচ্ছত্র অংশ দাবী করতে পারেন না। এ কারনে বাটোয়ারা মামলায় উত্তরাধিকারিনীর (কন্যা সন্তান) বসতগৃহ বা কুটিরের অংশ বিশেষ প্রাপ্তির বিষয়টি বিবেচিত হয় না। কারন উক্ত সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী (পূত্র সন্তান) গণের মধ্যে বিবাদ বা বিরোধ বৃদ্ধি পাবে (১৯৬১-১৩ ডি.এল.আর-২৩০)

৭) বাটোয়ারার পর পরিত্যাক্ত সম্পত্তি বাটোয়ারা
কোন যৌথ মালিকানা বা উত্তরাধিকারের সম্পত্তি বাটোয়ারার পর যদি উক্ত বাটোয়ারার বাইরে, অন্য কোন যৌথ সম্পত্তির ভাগ-বন্টন অবশিষ্ট থাকে, তবে সেক্ষেত্রে পরবর্তী বাটোয়ারা মামলা দায়েরে আইনগত কোন বাঁধা নেই (২৮ সি.ডব্লিউ.এন.-১৮১; ১৭ সি.ডব্লিউ.এন.-৫২১; ৩৯ সি.জে.এল.-১৪০)। বাদী ও বিবাদীর মধ্যে কোন যৌথ সম্পত্তি থাকলে, তা বাটোয়ারা করা যাবে এবং উক্ত বাটোয়ারা থেকে কোন অংশ যদি বাটোয়ারা বহির্ভূত থাকে, পরে তা বাটোয়ারাতে কোন প্রতিকুলতা নেই (১৯৫৪ ডি.এল.আর.-৬ এফ.সি.-১৩৬)

৮) কোন সহ-অংশীদার কর্তৃক ইমারত নির্মানের মাধ্যমে সম্পত্তির উন্নয়ন সাধন করলে
কোন সহ-অংশীদার ইমারত নির্মানের মাধ্যমে সহ-মালিকানার সম্পত্তির উন্নয়ন সাধন করলে উক্ত সম্পত্তি বাটোয়ারা আইনে Equity (সমমূল্য, ন্যায় বিচার, নিরপেক্ষতা) নীতি অনুসৃত হয় এবং উক্ত সহ-অংশীদারকে প্রচলিত বাজারদর অনুযায়ী প্রাপ্য অংশটুকু দেওয়ার জন্য তাগিদ অনুভূত হয় (ডি.এল.আর.-৮ সি.এল.-২৭)। কোন যৌথ সম্পত্তিতে দখল এবং উন্নয়নের বিষয়টি Equity (সমমূল্য, ন্যায় বিচার, নিরপেক্ষতা) এর প্রেক্ষিতে বিবেচিত হয়ে থাকে (লাহোর-১৮, পি.টি.-১০)

০৯) বাটোয়ারায় নাবালকের অধিকার
বিজ্ঞ আদালত কোন নাবালকের স্বত্ব ও মালিকানার নিরাপত্তার স্বার্থে বাটোয়ারা মামলা নাকচ/খারিজ করতে পারেন (৩১ বোম্বে- ৩৭৩, ১৭ এম.এল.জে.-৩৪৩)। বাটোয়ারা ন্যায্য হলে, তা নাবালকের উপরও কার্য্যকর (৩১ এলাহা ৪১২, ২৩ সি.ডব্লিউ.এন.-১১৮)। অন্যথায় নিজ অধিকারের ব্যাত্বয় বা ক্ষতির প্রমান সাপেক্ষে একজন নাবালক কোন বাটোয়ারা ভঙ্গ বা অমান্য করতে পারেন (৭৩ আই.সি.-৭৬৩, ১৯২২ এম.ডব্লিউ.এন.-৭৩২)

১০) সহ-অংশীদার বে-দখল হলে
সহ-অংশীদার বা সহ-মালিক দখলচ্যুত হলে সেখানে একমাত্র সমাধান বাটোয়ারা মামলা। (ডি.এল.আর.-২১, ১৯৬৯-পৃঃ ৪২৩)

১১) বাটোয়ারা রেজিষ্ট্রি
কোন যৌথ সম্পত্তি পারিবারিক বা স্থানীয় শালিসগণের মাধ্যমে, সহ-অংশীদার বা সহ-মালিকগণ কর্তৃক স্বানন্দে নিজ ইচ্ছায় গৃহীত হলে, উক্ত মৌখিক বা লিখিত বাটোয়ারা অবশ্যই রেজিষ্ট্রেশন করতে হবে (২৫ কলি-২১০; ১০ সি.এল.জে-৫০২; ১৬৪ আই.সি.-৩৯২)। কোন মৌখিক বাটোয়ারার সমঝোতায় যদি কোন প্রকার শর্তের উল্লেখ থাকে, তবে উক্ত শর্তের উল্লেখ করে লিখিত সমঝোতাপত্র রেজিষ্ট্রেশন করতে হবে। এক্ষেত্রে উক্ত মৌখিক বা লিখিত বাটোয়ারা রেজিষ্ট্রেশন না হওয়া পযর্ন্ত কার্য্যকর বা অংশীদারগণের উপর বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণ্য হবে না (১৯৩৬ সি.ডব্লিউ.এন.-১১৬২; ১৯৩৭ অ থ- ৫৩)

১২) একজন সহ-অংশীদার কর্তৃক প্রাপ্যের অতিরিক্ত অংশ দখল করলে
একজন সহ-অংশীদার বা সহ-মালিক কর্তৃক প্রাপ্য হিস্যাংশের অতিরিক্ত অংশ দখল করলে, সেক্ষেত্রে বাটোয়ারা-ই তার একমাত্র সমাধান। তবে, একজন সহ-অংশীদার বা সহ-মালিককে যৌথ সম্পত্তির দখল হতে কেউ বহিস্কার বা উচ্ছেদ করতে পারেন না (ডি.এল.আর.-৫, ১৯৫৩ পৃঃ-৩৯)

১৩) বাটোয়ারা মামলায় সমুদয় সম্পত্তি অন্তর্ভূক্তকরণ
বাটোয়ারা মামলার সাধারন নীতি অনুযায়ী, বাটোয়ারাযোগ্য সমুদয় সম্পত্তি একই মোকর্দ্দমাভূক্ত করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনে ন্যায় বিচার ও অন্যান্য সুবিধাজনক দিক বিবেচনায় ক্ষেত্র বিশেষে তা শিথিলযোগ্য হতে পারে। (ডি.এল.আর.-৩৬, ১৯৮৪ পৃঃ-২৯০)

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 1067 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ