ঝিনাইদহ সদর ভূমি অফিস সত্যি কি জনবান্ধব অফিস ?

Print


স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহঃ
অফিসে প্রবেশ পথে একটি বিলবোর্ডে চোঁখ আটকে গেল। তাতে লেখা ঝিনাইদহ সদর উপজেলা ভূমি অফিস সম্পূর্ণ রূপে ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি ও দালাল হতে মুক্ত। সারা দেশে ভূমি অফিসে যেখানে দুর্নীতি আর দালালের দৌরাত্মের কারণে মানুষের হয়রানীর নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। সেখানে এই ভূমি অফিসের গেটে এমন বিলবোর্ড প্রথমে সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হলো। বিষ্ময় নিয়ে একটু এগিয়ে গেলাম, তাতে বিষ্ময় আরো বেড়ে গেল। সম্পূর্ণ অফিস অসাধারণভাবে টাইলস, রং, ফুলের টব, পাপোষ ইত্যাদি দিয়ে পরিপাটিভাবে সাজানো-গোছানো, যা সচরাচর কোন সরকারি দপ্তরে দেখা যায় না।

অফিসের গেটের পাশে দেখা গেল, বিশাল একটি সিটিজেন চার্টার। যেখানে রয়েছে অফিসের যাবতীয় সেবার নাম, সেবা প্রাপ্তির সময়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নির্ধারিত সরকারি ফি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, নির্ধারিত সেবা না পেলে করণীয়সহ বিস্তারিত তথ্য। গেট দিয়ে অফিসের বারান্দায় প্রবেশ করতেই দেখা গেল ডিজিটাল হাজিরার একটি ডিভাইস। জানা গেছে, অফিসের কর্মচারীদের ডিজিটাল ডিভাইসে প্রেস করে অফিসে প্রবেশ এবং অফিস শেষে এই ডিভাইসে প্রেস করে অফিস ত্যাগ করতে হয়।

বারান্দার একপাশে দেখা গেল ‘ফ্রন্টডেস্ক কাম ভূমি তথ্যকেন্দ্র’ নামে চমৎকার একটি ডেস্ক, সেখানে একজন কর্মচারী বসে আছেন। তিনি সাধারণ মানুষের কথা শুনছেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছেন এবং নামজারিসহ বিভিন্ন আবেদনপত্র লিখে দিতে সহযোগিতা করছেন। বারান্দার অন্যপাশের একটি কক্ষে ‘নাগরিক সেবাকেন্দ্র’ লেখা দেখে এগিয়ে গেলাম।

রুমে প্রবেশ করে দেখা গেলো একটি বড় টেবিলে কাউন্টার তৈরি করা হয়েছে। যেখানে দুইটি কম্পিউটারে দুইজন কর্মচারী কাজ করছেন। তার একজন নামজারি আবেদন গ্রহণ করছেন। তিনি নামজারি আবেদন গ্রহণ করে সাথে সাথেই আবেদনকারীকে শুনানীর তারিখ জানিয়ে দিচ্ছেন। নামজারি আবেদন জমাদানকালে কোন টাকা লাগছেনা বলে কয়েকজন আবেদনকারী কাছ থেকে জানা গেল।

বারান্দায় একটি বড় বোর্ডে অফিসে কর্মরত সব কর্মচারীর নাম, পদবী, ছবি ও দায়িত্ব সম্বলিত একটি বোর্ড দেখা গেল। সাধারণ মানুষ যাতে সহজেই অফিসের সকল কর্মচারীকে চিনতে পারেন এবং তাদের কার কি দায়িত্ব তা জানতে পারে সে জন্য এ বোর্ড তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেল। যা গ্রামের সাধারণ মানুষের হয়রানী ও দালালের খপ্পর থেকে রেহাই পেতে অনেকটা সহায়ক হয়।

অফিসের কর্মচারীদের কক্ষে প্রবেশ করেই অবাক হতে হলো। এত গোছানো আর পরিপাটি কোন সরকারি অফিসের কর্চারীদের কক্ষ দেখা যায় না। সরকারি দপ্তরে সাধারণত ভাঙ্গা চেয়ার-টেবিল, আলমারী, নোংরা ফাইলের স্তুপ চোখে পড়ে। কিন্তু এখানে অবস্থা সস্পূর্ণ বিপরিত। কর্চারীদের সুন্দর চকচকে চেয়ার-টেবিল, টেবিলের দুই পাশে কম্পিউটার রাখার আলাদা জায়গা, ফাইল রাখার জন্য আলাদা র‌্যাক, দরজা-জানালায় পর্দা, কক্ষের সামনে কর্মচারীর নাম-পদবী সম্বলিত নেম ট্যাগ, চোখে পড়ছে না ফাইলের স্তুপ। সকল কর্চারীর গলায় ঝুলছে পরিচয় পত্র।

অফিসের বারান্দায় একটি উদ্বোধনী ফলক চোখে পড়ল, তা দেখা গেল ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মাহবুব আলম তালুকদার ২২ ধরণের উদ্ভাবনী ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। এছাড়াও পরবর্তীতে সব মিলিয়ে শুরু করা হয়েছে ৩২ প্রকারে উন্নয়নমুলক কাজ। কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৫ দিনে বাড়ীতে বসে নামজারি পর্চা প্রাপ্তি। ষাট বছরের রেকর্ড সালওয়ারী সজ্জিতকরণ ও রেকর্ডরুম সংস্কারসহ আধুনিকায়ন, দেড় লক্ষ আর.এস পর্চা স্ক্যান করে সংরক্ষণ ও ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থাপনা।, নামজারীর আবেদন অনলাইনে গ্রহণ ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে (খধহফ ওহভড়ৎসধঃরড়হ ধহফ ঝবৎারপব ঋৎধসবড়িৎশ) এর আওতায় অটোমেশন সিস্টেম চালু, ফ্রন্টডেক্স-কাম- ভূমি তথ্যকেন্দ্র স্থাপন, ১৮ টি ইউনিয়ন ও পৌর ভূমি অফিসে ল্যাপটপ বিতরণ, নাগরিক সেবাকেন্দ্র-কাম-কাউন্টার স্থাপন।,

তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ অনুসারে তথ্য ইউনিট গঠন, মহিলাদের নামাজ ঘর তৈরি, ভূমি তথ্য বোর্ড স্থাপন, নামজারির শুনানীর তারিখ মাসের শুরুতে একসাথে নোটিশ বোর্ড ও ফেসবুকে প্রকাশ, অফিসের শোভা বর্ধনে ফুলের বাগান তৈরি, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নে সেবা গ্রহীতাদের নিয়ে সভা আহবানসহ ৩২ ধরনের কাজ।
জানা গেল এসিল্যান্ড উসমান গনি যোগদান করার পর গত এক বছরে গতানুগতিক কাজের বাইরে জনবান্ধন ভূমি অফিস তৈরি করতে এসব উদ্বোগ বাস্তবায়ন করেছেন। দোতলায় উঠার সিঁড়িঘর এর নিচেই দেখা গেল ‘মহিলাদের নামাজের স্থান’ নামে একটি নামাজ ঘর তৈরি করা হয়েছে। আরো জানা গেল, আগে এই জায়গাটা অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে ছিল। এই জায়গাটি ঘিরে একটি সুন্দর নামাজ ঘর তৈরি করা হয়েছে।

অফিসের প্রধান সহকারী রাজিয়া খানম জানান, অফিসে চারজন মহিলা কর্মচারী থাকলেও আগে তাদের নামাজের জায়গা ছিল না। বারান্দায় আরো একটি বোর্ড চোখে পড়ল। সেখানে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য প্রাপ্তির জন্য করনীয় বিষয়গুলো লেখা আছে, এছাড়া উক্ত বোর্ডে তথ্য কর্মকর্তার নাম লেখা আছে। সহকারী কমিশনার(ভূমি) এর কক্ষে প্রবেশেরমুখে ‘গণশুনানীর’ আরো একটি বোর্ড দেখা গেল। এর মাধ্যমে সপ্তাহের প্রতি বুধবার সাধারণ মানুষের কথা শোনা হয় এবং তাৎক্ষণিক সমাধান দেয়া হয়। এত সুন্দর কর্মপরিবেশ পেয়ে অফিসের সকল স্টাফ অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁরা বলেন, সুন্দর কর্মপরিবেশে কাজের উৎসাহ ও আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়।

অফিসের রেকর্ড রুমের গত ৬০ বছরের রেকর্ড সালওয়ারী সজ্জিত করা হয়েছে। রেকর্ড রুমে প্রবেশ করে দেখা গেল অত্যন্ত গোছানো ও পরিপাটি একটি কক্ষ। সেখানে ১৯৫৬-৫৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সকল মিসকেস, হিসাব বাতিল কেস, সার্টিফিকেট নিলাম কেস, মিসকেস, নামজারি কেসের নথি সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

অফিসের কমর্রত স্টাফ মোশাররফ হোসেন জানান, আগে এই রেকর্ড রুম এতটাই নোংরা আর অগোছালো ছিল যে, এখানে মাস্ক না পরে প্রবেশ করা যেত না। তিনি বলেন, এই স্যার যোগদান করার পর প্রথমেই রেকর্ড রুম গোছানোর কাজ শুরু করেন। আগে যে নথি খুঁজতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেত বা কখনও খুঁজে পাওয়া যেতনা, এখন তা মাত্র এক মিনিটেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

এছাড়া ভূমি অফিসের দেড় লক্ষ আরএস খতিয়ান স্ক্যান করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এতে রেকর্ড ভলিউম ছিঁেড় বা হারিয়ে গেলেও মানুষের সহজেই রেকর্ড প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। অফিসের অটোমেশন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। নামজারি আবেদন অনলাইনে গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য এলআইএসএফ সিস্টেম এর পাইলটিং শুরু হয়েছে। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

শক্তিশালী রাউটার দিয়ে ওয়াই-ফাই জোন তৈরি করা হয়েছে। অফিসের ডিজিটাল নেম বোর্ড ও বড় ডিজিটাল ঘরি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া পরামর্শ ও অভিযোগ বাক্স, দর্শনার্থীদের বসার জন্য গোল ঘর তৈরি করা হয়েছে। ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থা তরান্বিত করার লক্ষ্যে ১৮টি ইউনিয়ন/পৌর ভূমি অফিসে ল্যাপটপ প্রদান করা হয়েছে।

এতসব কাজ যিনি করেছেন, তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের এসিল্যান্ড উসমান গনি। তিনি ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর এ ভূমি অফিসে যোগদান করেন। যোগদানের পর হতে তিনি ভূমি অফিসের ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি, দালালের দৌরাত্ম বন্ধ, অফিসের কর্মপরিবেশ উন্নয়নসহ ভূমি অফিসের সার্বিক সেবার মানোন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেন।

সহকারী কমিশনার ভূমি উসমান গনি বলেন, ‘‘সরকারি কর্মচারী হিসাবে আমাদের মূল দায়িত্ব সেবা গ্রহীতাদের প্রাপ্ত সেবাটা সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া। এ কাজের বিনিময়ে সরকার আমাদের পর্যাপ্ত বেতনভাতা প্রদান করেন। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার আগে আমাদের চিন্তা করা উচিত সরকার যে পরিমাণ টাকা দেয় সে পরিমাণ কাজ আমরা করছি কিনা’’। তিনি আরো বলেন, ‘‘ঝিনাইদহ সদর উপজেলা ভূমি অফিস এখন সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। অফিসের সকল স্টাফ এখন মন থেকে অনুধাবন করছে যে, সাধারণ মানুষের সেবা করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব এবং শুধু এ কারণেই সরকার তাদের বেতন প্রদান করছেন।
তিনি বলেন, ‘‘খুলনার বিভাগীয় কমিশনার আব্দুস সামাদ ভূমি সেবার মানোন্নয়নে বারবার আমাদের ডেকে নিয়ে নিদের্শনা দিয়েছেন, অনুপ্রাণিত করছেন এবং ভূমি অফিসের নামে বরাদ্দ প্রদান করেছেন। এছাড়া জেলা প্রশাসক মাহবুব আলম তালুকদার ভূমি অফিসের সেবার মান বৃদ্ধি ও মানুষের হয়রানী লাঘবে সব সময় পরামর্শ প্রদানসহ সার্বক্ষণিক কার্যক্রম তদারকি করছেন, এছাড়া তিনি জনবান্ধব ভূমি অফিস তৈরির জন্য আর্থিক বরাদ্দ প্রদান করেছেন। এছাড়াও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যক্রম সম্পাদনে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন বলে তিনি জানান।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সেবার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, শুধু উদ্ভাবনী ও সংস্কারমূলক কাজই নয়, এসিল্যান্ড সাধারণ মানুষের বিভিন্ন কাজও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পাদান করে দেন। সর্বোচ্চ ৩০ দিনে নামজারি মামলার কার্যক্রম শেষ করা হয়। এসিল্যান্ড যোগদান করার পর গত এক বছরে ৮হাজার সাধারণ নামজারি কেস, ৬০০টি ভিপি খ তফসিল নামজারি কেস, ২৫০টি মিসকেস, ৩৫টি রেন্ট সার্টিফিকেট কেস নিষ্পত্তি করেছেন। এছাড়া ৪৮টি ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়েছে। এসিল্যান্ড অফিস এখন জনবান্ধব অফিসে তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ কোন হয়রানি, ঘুষ ছাড়াই তাদের কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন।

অফিসে আগত সেবা গ্রহীতা অরবিন্দ কুমার বসাক এর সাথে আলাপকালে জানা যায়, আগে এই অফিসেই কাজ করতে দালালের খপ্পরে পড়ে অনেক ঘোরাঘুরি করে অনেক ঘুষ দিয়ে কাজ করাতে হতো। আগে অফিসের স্টাফরাও খারাপ আচরণ করত। অথচ এখন সবকিছুই পরিবর্তন হয়েছে। অফিসের স্টাফদের অত্যন্ত ভাল ব্যবহার। কেউ কোন টাকাও দাবী করছে না। ভূমি অফিসের এমন পরিবেশ তারা সবসময় আশা করে।

সদর উপজেলার হাটগোপালপুর এলাকার আইয়ুব হাসান বলেন, এর আগে আমার জমির নাম পত্তনের জন্য কয়েক মাস ঘুরতে হয়েছিল। নাম জারির কারণে অফিস কর্মচারীদের ঘুষও দিতে হয়েছিল। তবুও সময়মত কাজ হয়নি আমার। কিন্তু বর্তমান এসিল্যান্ড যোগদান করার পর আমি আরও একটি কাজ করেছি। এবার আগের মত ঘুরতে হয়নি বা ঘুষ দিতেও হয়নি।

আরেকজন সেবা গ্রহীতা নিলুফার ইয়াসমীন বলেন, দেশের প্রত্যেকটি ভূমি অফিস যদি এমন হতো তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো।

ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি ও দালালমুক্ত জনবান্ধব ভূমি অফিস তৈরির জন্য সহকারী কমিশনার(ভূমি) উসমান গনি বিভিন্ন সময়ে স্বীকৃতিও পেয়েছেন। কিছুদিন আগে দেশ সেরা এসিল্যান্ড হিসাবে ‘জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পুরস্কার-২০১৬’ অর্জন করেছেন। এছাড়া এর আগে তিনি খুলনা বিভাগের সেরা এসিল্যান্ড পুরস্কার লাভ করেছেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 46 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ