ট্রেনের ধাক্কায় চূর্ণ প্রাইভেট কার ৪ জনই এক পরিবারের

Print

৫ নিহতের ৪ জনই এক পরিবারের

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে প্রাইভেট কারে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত (বাঁ থেকে) সোনিয়া আক্তার, তহসিন আহম্মেদ তালহা, নুসরাত জাহান লাকি ও মেয়ে রুবাইদা নুসরাত রিভা, মিনহাজ। ২. লাইনচ্যুত ট্রেন। ৩. দুমড়েমুচড়ে যাওয়া প্রাইভেট কার। ছবি : কালের কণ্ঠ

 গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোয়ালবাথান এলাকায় রেলওয়ের লেভেলক্রসিং নেই। যে সড়কটি রেলপথ অতিক্রম করে গেছে সেটি একসময় কাঁচা ছিল, এখন পাকা।
কিন্তু নিরাপত্তার জন্য এই পথে কোনো গেট দেওয়া হয়নি। ছিল না কোনা গেটম্যান। এই লেভেলক্রসিংয়ে গতকাল রবিবার সকালে ট্রেনের ধাক্কায় একটি প্রাইভেট কার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে একটি পরিবারের চার নারী ও শিশুসহ পাঁচজন। এক বছর আগে এখানেই ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারিয়েছিল চারজন।ঢাকা থেকে কলকাতাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি ধাক্কা দেওয়ার পর প্রাইভেট কারটি এর সঙ্গে আটকে যায়। প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে একটি রেল সেতু থেকে চূর্ণবিচূর্ণ গাড়িটি ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই  প্রাইভেট কারের চার যাত্রী ও চালক প্রাণ হারান। ট্রেনটির একটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে গিয়ে থেমে যায়। এর পর থেকে জয়দেবপুর-রাজশাহী রেলপথে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন চলেনি।

নিহত পাঁচজন হলেন গোয়ালবাথান এলাকার শফিকুল ইসলাম বিদ্যুতের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার তাহমিদা (৩০) ও তাঁদের ছেলে তাহসিন আহম্মেদ তালহা (৬), বিদ্যুতের চাচাতো ভাই রিপন মাহমুদের স্ত্রী লাকী আক্তার (৩০) ও তাঁদের মেয়ে রুবাইদা আক্তার রিভা (৫), বিদ্যুতের প্রাইভেট কার চালক একই এলাকার ওয়াহেদ আলীর ছেলে মিনহাজ উদ্দিন (৪৫)।

নিহতদের পরিবার, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তালহা বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে উপজেলার গোয়ালবাথান এলাকায় অ্যাডভেন্টিস্ট ইন্টারন্যাশনাল মিশন স্কুলে (এইমস) নার্সারিতে এবং তার চাচাতো বোন রিভা একই স্কুলের প্লে শ্রেণিতে লেখাপড়া করত। গতকাল সকাল ৯টার দিকে দুই শিশু তাদের মায়েদের সঙ্গে প্রাইভেট কারে করে স্কুলে যাচ্ছিল।

ওই সূত্রগুলো জানায়, জয়দেবপুর-রাজশাহী রেললাইনের গোয়ালবাথানে অরক্ষিত লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা কলকাতাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন প্রাইভেট কারটিকে ধাক্কা দেয়। ট্রেনটি প্রাইভেট কারটি প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। ভোঙ্গাবাড়ী এলাকায় ঘাটাখালী নদীর রেল সেতুর ওপর থেকে চূর্ণবিচূর্ণ গাড়িটি ছিটকে নিচে পড়ে। একপর্যায়ে ট্রেনের এডি-৪ নম্বর বগিটি সেতুর ওপরই লাইনচ্যুত হয়। এ অবস্থায় প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে বাজ হিজলতলী এলাকায় গিয়ে সেটি থেমে যায়।

কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াছিন সাংবাদিকদের বলেন, অরক্ষিত গোয়ালবাথান লেভেলক্রসিংয়ে কলকাতাগামী ট্রেনের ধাক্কায় প্রাইভেট কারের চালকসহ পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে ট্রেনের কোনো যাত্রী আহত হয়নি। তিনি জানান, ট্রেনের লাইনচ্যুত বগিটি সরিয়ে নিতে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। দুপুর ২টার দিকে আবার ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ওসি ইয়াছিন জানান, তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই স্বজনরা লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এ ছাড়া যে অবৈধ অরক্ষিত লেভেলক্রসিং আছে, সেগুলোর ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার অপূর্ব বল জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ট্রেন-প্রাইভেট কারের সংঘর্ষের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারদল ও অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে তিনি সেখানে যান। নিহতদের মধ্যে প্রাইভেট কারের চালক মিনহাজ উদ্দিনের লাশ ঘটনাস্থলে পেয়েছেন। অন্য চারজনের লাশ তাঁরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই পরিবারের লোকজন নিয়ে গেছে। এ ছাড়া চূর্ণবিচূর্ণ প্রাইভেট কারটি উদ্ধার করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রাসেল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন, পৌরসভার মেয়র মজিবুর রহমান, কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াছিন, কালিয়াকৈর থানার ওসি আব্দুল মোতালেব মিয়া ও রেলওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান।

স্বজনদের আহাজারি : দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ তাদের বাড়িতে পৌঁছলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয়। তাদের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, সেখানে স্বজনের আহজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশীরা ভিড় করছে, সান্ত্বনা জানাচ্ছে। একমাত্র মেয়ে রিভা ও স্ত্রী লাকীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় রিপন মাহমুদ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, ‘আল্লাহ, তুমি একি করলা। আমি কেন মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করালাম। আমি কী নিয়ে বাঁচব!’ মেয়ের লাশের ওপর পড়ে বারবার চুমু দিচ্ছিলেন রিপন। এ দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিল ওই বাড়িতে আসা আশপাশের এলাকার লোকজন। একই অবস্থা বিদ্যুতের বাড়িতে। স্ত্রী সোনিয়া ও ছেলে তালহাকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শফিকুল ইসলাম বিদ্যুৎ। প্রাইভেট কারের চালক মিনহাজের বাড়িতেও চলছিল স্ত্রী-সন্তানদের আহজারি।

পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন চলেনি : কলকাতাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস লাইচ্যুত হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ওই ট্রেনে বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিকসহ প্রায় ৩৮৭ জন যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়ে। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রেলওয়ের উদ্ধারকর্মীরা ওই ট্রেনের পেছনের ইঞ্জিনসহ ছয়টি বগি উদ্ধার করে পাশের রেলওয়ে স্টেশন কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক নিয়ে আসেন। পরে  ট্রেনের ইঞ্জিনসহ লাইচ্যুত বগিটি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর রেলস্টেশনে সরিয়ে নেওয়া হয়। দুর্ঘটনার কারণে আশপাশের স্টেশনগুলোতে ধূমকেতু, নীলসাগর, সুন্দরবন এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেন আটকা পড়ে।

অবৈধ ও অরক্ষিত লেভেলক্রসিং : স্থানীয় লোকজন ও জয়দেবপুুর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, শুধু কালিয়াকৈর উপজেলার গোয়ালবাথান লেভেলক্রসিং নয়, জয়দেবপুর থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার রেললাইনে লেভেলক্রসিং রয়েছে ৮১টি। প্রথম দিকে গেটম্যান দেওয়া হয়েছিল ১৭টিতে। পরে টাঙ্গাইলে কয়েকটি বড় রেল দুর্ঘটনা ঘটার পর জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে আরো পাঁচটি লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যান দেওয়া হয়। কিন্তু বাকি ৫৯টি লেভেলক্রসিং রয়েছে সম্পূর্ণ অরক্ষিত। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেক অবৈধ লেভেলক্রসিং। যার কারণে মাঝেমধ্যেই ওই অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ে ঘটছে প্রাণহানি।

স্থানীয়রা বলছে, এক বছর আগে গোয়ালবাথান লেভেলক্রসিংয়ে বাবা-মেয়ে ও দাদা-নাতি ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায়। এখানে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই লেভেলক্রসিং দিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের লোকজন চলাচল করে। প্রাণহানি রোধে জরুরি ভিত্তিতে এ লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যান ও গেট ব্যারিয়ার দেওয়ার দাবি জানায় তারা।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 316 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ