ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী: আ’লীগ ও বিএনপিতে প্রাথী যারা

Print

আনিসুল হকের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রধান দুই দলের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী প্রার্থীর তালিকা বড় হচ্ছে। এরই মধ্যে দলীয় টিকিট পেতে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন দলের অনন্ত ১২ জন নেতা মেয়র প্রার্থী হতে দলীয় টিকিট চান। বিএনপির টিকিটে মেয়র প্রাথী হতে চান পাঁচ নেতা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপনির্বাচন একাধিক কারণে উভয় দলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। এবারই প্রথম এখানে দলীয় প্রতীকে সরাসরি ভোটের লড়াই হবে নৌকা আর ধানের শীষের মধ্যে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগে স্থানীয় সরকারের অধীনে এ উপনির্বাচনটিই সর্বশেষ ভোটের লড়াই।  এ নির্বাচনের ফলাফল আসন্ন  জাতীয় নির্বাচনকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন দুই দলের নীতি নির্ধারকরা। তাই  ঢাকায় বিজয় নিশ্চিত করতে জাতীয় নির্বাচনের শুভ সূচনা করতে চায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকার জয় দিয়ে প্রাক-নির্বাচনী প্রস্তুতিতে এগিয়ে থাকতে চায় মাঠের বিরোধী দল বিএনপি।

আওয়ামী লীগের ১২ মনোনয়ন প্রত্যাশী
ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখনো দলীয় ফোরামে আলোচনা করেনি। তবে ব্যক্তিপর্যায়ে নেতাদের আলোচনা  থেকে ধারণা করা যায়, তাঁরা এই নির্বাচনকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচন মনে করছেন।  মেয়র হিসেবে প্রয়াত আনিসুল হক মানুষকে যেভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর মানুষ যেভাবে ভালোবাসা দেখিয়েছে, তাতে দলের আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতাদের জন্য পরবর্তী মেয়র পদে প্রার্থী বাছাই কঠিন হয়ে গেছে। আনিসুল হকের মতো কাউকে বাছাই না করতে পারলে ভোটে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে। তা ছাড়া এই নির্বাচনের পরিবেশ, ভালো-খারাপ সবদিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। এর ফলাফলের একটা প্রভাব অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনে পড়বে। ফলে হঠাৎ হাজির হওয়া এ নির্বাচন সরকারি দলকে কিছুটা ভাবনায় ফেলেছে।

প্রার্থী বাছাইয়ের এই সংকট উত্তরণে আনিসুল হকের পরিবারের কাউকে বেছে নেওয়াকে ভালো মনে করছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা।  তাই সরকারি দলের সম্ভাব্য প্রাথী তালিকায় শুরুতেই রয়েছেন প্রয়াত মেয়েরের স্ত্রী  রুবানা হক এবং একমাত্র ছেলে নাভিদুল হক। রুবানা হক সেভাবে কখনোই সরাসরি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ছিলেন না, তাই তিনি প্রাথী হতে রাজি না হলে প্রয়াত মেয়রের একমাত্র ছেলে হয়ে ওঠতে পারেন আওয়ামী লীগের প্রথম পছন্দ। প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা না দিলেও নাভিদুল হক ইতোমধ্যেই পিতার অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে প্রধানমন্ত্রীর যে কোনো নির্দেশনা দিলে, তিনি ও তার পরিবার তা মেনে নেবেন বলে জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশিদের তালিকায় প্রায় একডজন নাম শোনা গেলেও আনিসুল হকের পরিবারের পর জোড়ালো প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি ও ঢাকা-৯ আসনের এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ এমপি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক  সাদেক খানও প্রার্থী হতে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

আগের সিটি নির্বাচনেই ঢাকা উত্তরে মেয়র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।  পুত্র ও জামাতার কারণে দলীয় রাজনীতিতে খানিকটা ব্যাকফুটে থাকা  সিনিয়র নেতা মেয়র হয়ে আবারও লাইমলাইটে ওঠে আসতে চাইছেন।  প্রত্যক্ষভোবে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলে দেশের দুই আলোচিত ব্যাক্তি ঢাকা উত্তরের মেয়র হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তারা হলেন, সাবেক ফুটবলার ও বিজিএমইএয়ের সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শিদী এবং এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ও হালের গায়ক  মাহফুজুর রহমান।

উল্লেখিত আট মনোনয়ন প্রত্যাশীর বাইরেও আনিসুল হকের মৃত্যুর পর প্যানেল মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ২১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. ওসমান গণিও প্রার্থী হতে আগ্রহী হয়ে ওঠেছেন।  ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থী হতে আরো আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সাবেক এমপি ডাক্তার এইচ বি ইকবাল,  ঢাকা মহানগর উত্তরের সহসভাপতি  ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবুল কাশেম মোল্লা এবং ঢাকা-১৫ আসনের এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলছেন, ডিএনসিসির উপনির্বাচনে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাই প্রার্থী চুড়ান্ত করবেন। তারা মনে করছেন। গত সিটি নির্বাচনের মতোই উত্তরের প্রার্থী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বড় কোনো চমক দিতে পারেন।

বিএনপির সম্ভাব্য ৫ প্রার্থী
দীর্ঘদিন ক্ষমতা ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি ঢাকা উত্তরের সিটি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে বেশ সাবধানতা অবলম্বন করছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও এতে ধানের শীষের প্রার্থী কে হবেন-  তা এখনই বলতে নারাজ দলটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা। দলীয় ফোরামের বাইরে জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেই প্রার্থিতা ঘোষণা করবে দলটি। আসন্ন রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। ঢাকাসহ আরো যে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হবে, তাতেও অংশ নিতে  প্রস্তুতির  মধ্যে আছে দলট।   বিএনপির বর্তমান কৌশল হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারকে বিনা চ্যালঞ্জে ছেড়ে দেবো না। দলীয় নেতারা মনে করছেন, সুষ্ঠ নির্বাচন হলে সব সিটিতেই বিএনপির প্রার্থী জয় ছিনিয়ে নেবে।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা উত্তরে নির্বাচন করতে দলীয় টিকিট পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠেছেন অন্তত পাঁচ নেতা। তবে বিগত মেয়র নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবারও দলীয় মনোনয়নের প্রথম দাবিদার। ঋণখেলাপি মামলা থাকায় গত নির্বাচনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ায় বাবার জায়গায় প্রার্থী হয়েছিলেন তাবিথ। ঋণখেলাপির ওই মামলার আইনগত জটিলতা থেকে এরই মধ্যে নিজেকে মুক্ত করে নেওয়ায় আবদুল আউয়াল মিন্টুই এবার মেয়র প্রার্থী হতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকেই।

পিতা-পুত্রের পরেই জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক গোলরক্ষক, অধিনায়ক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক আমিনুল হক মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। দলীয় প্রার্থিতায় চমক সৃষ্টির জন্যই সারাদেশে পরিচিত মুখ আর ক্লিন-ইমেজের অধিকারী আমিনুলকে নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে দলের একটি সূত্র জানিয়েছে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের বিপরীতে সাংস্কৃতিক আর ক্রীড়াঙ্গনের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে চাইছেন তারা। সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সংসদের ওই আসন থেকে  একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক এমপি এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর (অব.) কামরুল ইসলামের নামটিও আলোচনায় ওঠে এসেছে।  এছাড়াও দলের সাবেক এমপি এবং  বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টকশোর পরিচিত মুখ মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানও ডিএনসিসির উপ নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির টিকিট চাইতে পারেন বলেন জানা গেছে।

উল্লেখিত তিন নেতা এবং আউয়াল পরিবারের বাইরে ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রাথী হতে ২০ দলীয় জোটের শরীক দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ  আগ্রহী হয়ে ওঠেছেন। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায়  উচ্চ শিক্ষিত ও ধনাঢ্য এ তরুণনেতাকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়াইয়ে নামতে দেখা যেতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।

সদ্য গঠিত যুক্তফ্রনেটর ব্যানারে মান্না
প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বাইরে ঢাকা উত্তরের মেয়র পদে প্রাথী হতে দেখা যেতে পারে নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। গত নির্বাচনে বিকল্পধারার  যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন। এবার তাকে ভোটে মাঠে দেখা না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বরং সম্প্রতি বি.চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত চার দলীয় জোট যুক্তফ্রন্টে প্রাথী হয়ে মেয়র পদে মাহমুদুর রহমান মান্না লড়তে নামবেন বলে জানা গেছে।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিষ দুই  সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে সরাসরি দলীয় প্রতীক ভোটের মাঠে নামার সুযোগ ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে মেয়র নির্বাচিত হন আনিসুল হক।দায়িত্ব পালনের মধ্যেই চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যে গিয়ে হাসপাতাল ভর্তি হন সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিসে আক্রান্ত মেয়র। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি গত ৩০ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আনিসুল হকের মৃত্যুতে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ শূন্য ঘোষণা করে গত ১ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশা করা হয়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯ অনুযায়ী মেয়র পদ শূন্য পদে তিনমাসের মধ্যে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই অনুযায়ী আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মেয়র পদে উপনির্বাচন সম্পন করতে হবে নির্বাচন কমিশনের।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 1438 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ