তেলের দাম কমার সুবিধা দিতে হবে জনগণকেও

Print
গ্রিসের বিখ্যাত গল্পকার ঈশপের শেয়াল ও সারস পাখি নিয়ে লেখা নীতিগল্পটি যে বাংলাদেশের জন্য চিরন্তন এবং সর্ব যুগোপযোগী, তা আবারও প্রমাণিত হলো। প্রথমে গল্পটির কাহিনী আমরা আরেকবার স্মরণ করি। একদিন এক শেয়াল নিমন্ত্রণ করল এক সারস পাখিকে। নিমন্ত্রণের দিন  শেয়াল খুব যত্ন করে পায়েস রান্না করল। ঐদিন শেয়াল আর সারস পাশাপাশি খেতে বসল।  শেয়াল তার লম্বা জিভ দিয়ে সুড়ুত্ সুড়ুত্ করে চেটে চেটে প্লেটের সব পায়েস শেষ করে ফেলল। কিন্তু সারস বেচারা তার ছুঁচালো লম্বা ঠোঁটটা কয়েকবার প্লেটে ডোবানোর চেষ্টা করল কিন্তু মুখে পায়েস উঠল না। এ দৃশ্য দেখে শেয়ালের মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সারসকে জব্দ করতে পেরে তার খুশির যেন শেষ নেই। সারস শেয়ালের চালাকি বুঝতে পারল এবং শেয়ালকে তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য দাওয়াত দিল এবং কিছুক্ষণ পর চলে গেল। পরদিন  শেয়াল গেল সারসের বাড়ি। কিছু গল্প-আলাপ করার জন্য শেয়াল আর সারস আরাম করে চেয়ারে বসল। টেবিলের দিকে তাকিয়ে  শেয়ালের তো চক্ষুস্থির! টেবিলে সাজানো আছে দুটো সরু কলসি। তাতে কানায় কানায় ভর্তি করে ঢালা হয়েছে রসালো পায়েস। সারস শেয়ালকে উদ্দেশ্য করে বলল,“জানি-তুমি পায়েস খেতে ভালোবাসো তাই আজ খুব যত্ন করে পায়েসই রাঁধলাম।”-এই বলে সারস কলসিতে লম্বা ঠোঁট ডুবিয়ে পায়েস খেতে মন দিল। কিন্তু শেয়াল বেচারা গোমরামুখে বসে রইল। তার তো আর সারসের মত লম্বা ঠোঁট নেই যে, কলসেতে তা ডুবিয়ে পায়েস খাবে? কিছুক্ষণের মধ্যে সারস সব পায়েস খেয়ে সাবাড় করে ফেলল। এরপর ঢেঁকুর তুলে বলল, আরে একি শেয়ালভায়া! তুমিতো কিছুই খেলে না। সব পায়েসই তো পড়ে রইল। সারসের কথাগুলো শেয়াল কি জবাব দেবে ভেবে পেল না। সারসের সঙ্গে সে যে প্রতারণা করেছে তার জবাব  পেয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইল। এখন বাংলাদেশেও চলছে ঈশপের নীতিগল্পের যুগ। বাংলাদেশ সরকার অবশেষে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়েছে। গত ২৪ এপ্রিল রাত ১২টার পর থেকে অকটেন ও পেট্রলের দাম লিটারে ১০ টাকা কমিয়ে ৮৯ ও ৮৬ টাকা এবং সাধারণ মানুষের ব্যবহূত ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে মাত্র ৩ টাকা কমিয়ে ৬৫ টাকা করা হয়েছে। ডিজেলের দাম মাত্র ৩ টাকা কমানোর কারণে ডিজেলচালিত যানবাহনে যাত্রীভাড়া বা সেচের পানির দাম কমার সম্ভাবনা আমরা দেখছি না। এরফলে দাম কমার কারণে লাভবান হবে পরিবহন বা সেচপাম্পের মালিকেরা। প্রতিলিটার ডিজেলের দাম ৩ টাকা কমানো হলেও সেচ ও যানবাহনের ব্যয় কিছু কমবে। কিন্তু তার পরিমাণ এতই কম হবে যে যানবাহনের ভাড়া কমবে কি না, তাতে আমরা নিশ্চিত নই। তাহলে সাধারণ মানুষের লাভ কী হলো। সরকারি হিসাবে এবছর সেচে ডিজেল ব্যবহূত হবে ৯ লাখ টনেরও বেশি। প্রতিলিটার ৩ টাকা কমায় এই ৯ লাখ টন ডিজেলের জন্য সেচপাম্প মালিকদের কিন্তু সাশ্রয় হবে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। কিন্তু ডিজেলের দাম কমার কারণে যে টাকা সাশ্রয় হবে সে টাকা কৃষকের পকেট থেকে চলে যাবে সেচপাম্প মালিকের পকেটে। অর্থাত্ ডিজেলের দাম কমানোর সুবিধা সাধারণ কৃষক পাবেন না। কারণ, সেচের জন্য সাধারণ কৃষক ডিজেল কেনেন না। তাঁরা কেনেন সেচপাম্পের মালিকের কাছ থেকে পানি। পানির দাম নির্ধারণ করে দেন ওই মালিক। আবার সরকারি হিসাবে দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ এখনো বিদ্যুত্ পাচ্ছে না। এরা সবাই কেরোসিন ব্যবহার করে। কেরোসিনের দাম যদি আরেকটু কমানো হতো তবে তা ২৭ শতাংশ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হতো। তাতে সরকার তথা বিপিসির মোটেই লোকসান হতো না। মুনাফা কিছুটা কমতো মাত্র। অর্থাত্ তেলের দাম কমার সুবিধা সর্বস্তরের জনগণ পাবে না। আমি কি প্রশ্ন করতে পারি গল্পটিতে শিয়াল তার ভুলের মাশুল দিয়েছিল কিন্তু দেশের সাধারণ জনগণ কোনো ভুলের মাশুল দিচ্ছে। তাই আমরা মনে করি ডিজেল ও কেরোসিনের দাম আরো কমিয়ে সরকার যদি সেচের, পানির দাম ও যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় তবে তেলের দাম কমার সুবিধা সর্বস্তরের জনগণ পাবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ৩য় বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়  nazmul.14022325@gmail.com

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 70 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ