ত্রাণ ১০ কেজি, দেওয়া হয় ৮ কেজি!

Print

রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক পরিবার জানিয়েছে, প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী তারা আর্থিক সহায়তা পায়নি। বেশকিছু পরিবারের অভিযোগ, ১০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা থাকলেও তারা পেয়েছেন ৭-৮ কেজি করে চাল। এ চালও অনেকের ভাগ্যে জোটেনি। জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম হয়নি। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল থাকায় সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ত্রাণ দেওয়া যায়নি। সবাইকেই উপযুক্ত পরিমাণে ত্রাণ দেওয়া হবে।
রাজানগর এক নম্বর ওয়ার্ডের বোগাবিল এলাকায় পাহাড় ধসে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ মারা যান নজরুল ইসলাম। একই দুর্যোগে তার পাশের বাড়ির মো. আকবর হোসেনের ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত চার দিনে আকবর এক মুঠো চালও পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

আকবর হোসেনের অভিযোগ, ‘স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ত্রাণ দেওয়ার জন্য দুই থেকে তিন বার আমার নাম তালিকাভুক্ত করেন। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত এক কেজি চালও পাইনি।’
দুপুর দেড়টার দিকে আকবর হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে নিহত নজরুল ইসলামের বাড়িতে যান এ প্রতিনিধি। বাড়িটি পরিদর্শন করে ফেরার পথে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে একই গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী ডেকে বলেন, ‘আপনারা এসে দেখে গেলে কি আমাদের কপালে ত্রাণ জুটবে? পাহাড়ি ঢলে ঘর ভেঙে গেছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য এসে দেখেও গেছেন, তারপরও এখনও কোনও ত্রাণ পাইনি।’
ওই নারী আরও বলেন, ‘শুনেছি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সরকারিভাবে চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আমরা এখনও তা পাইনি, ভবিষ্যতেও পাব না কিনা তাও জানি না। ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়ার নাম করে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বররা ত্রাণ নিজেদের পকেটে ভরেছেন।’
বোগাবিল এলাকায় পাহাড় ধসে স্ত্রী-সন্তানসহ নিহত নজরুলের বড় মেয়ে লাকি আক্তার এখনও বেঁচে আছেন। ঘটনার দিন শ্বশুরবাড়িতে থাকায় তিনি বেঁচে যান। শনিবার দুপুরে লাকি আক্তারের শ্বশুরবাড়িতে গেলে তার শ্বশুর মো. ইয়াছিন বলেন, ‘বাবা, মা ও ভাই-বোনকে হারিয়ে ছেলে-বৌ এখন বাকরুদ্ধ। ঠিকমতো খাবারও খাচ্ছে না, কারও সঙ্গে কথাও বলে না।’ এ ঘটনায় তিনি নিজেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বলে জানান।
ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে মো. ইয়াছিন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মাত্র ২০ হাজার টাকা পেয়েছি। এর বাইরে আর কোনও সহায়তা পাইনি।’ তিনি আরও জানান, তার ছেলের বউ এখন তার চাচার বাড়িতে আছে। ওখানে কোনও ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে কিনা তার জানা নেই।
ত্রাণ বিতরণে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন রাণীরহাট এলাকার সুলতানপুরের বাসিন্দারা। ওই এলাকার একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, তারা এখনও পর্যন্ত ত্রাণের চাল পাননি। ওই এলাকার কয়েকজন ত্রাণ পেয়েছেন, তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পছন্দের লোক।
এই এলাকার ইদ্রিস আলম সর্দার বলেন, ‘পাহাড়ি ঢলে আমাদের অনেকের ঘর-বাড়ি ভেঙে গেছে। আমার নিজের ঘরও তছনছ হয়ে গেছে। এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছি। কোনও আর্থিক বা ত্রাণ সহায়তাও পাইনি।’
একই এলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, ‘ত্রাণ হিসেবে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করার কথা হলেও বাড়িতে চাল এনে মেপে দেখি ৮ কেজি ।’
ত্রাণ বিতরণে এসব অভিযোগ সর্ম্পকে জানতে চাইলে রাজানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সামশুল আলম তালুকদার বলেন, ‘সরকারিভাবে যে ত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে আমরা সেটাই ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করছি। এখানে কোনও অনিয়ম করা হচ্ছে না। ১০ কেজির জায়গায় ৭-৮ কেজি দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। সবাইকে ১০ কেজির একটি প্লাস্টিকের বালতিতে করে চাল দেওয়া হচ্ছে।’
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, ‘এখনও সব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ত্রাণ পায়নি, এটা ঠিক। ধীরে ধীরে আমরা সবার মাঝে ত্রাণ বিতরণ করছি। আজও (শনিবার) সারাদিন চাল বিতরণ করা হয়েছে। আজকের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের চাল পাওয়ার কথা। তারপরও যদি কেউ না পেয়ে থাকেন, আমরা কাল-পরশুর মধ্যে তাদের হাতে ত্রাণ তুলে দিতে পারব।’
নিহতদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা থাকলেও একই পরিবারের চারজন মৃত্যুর ঘটনায় ওই পরিবারকে মাত্র ২০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই পরিবার ৮০ হাজার টাকা পাবেন। সরকারি বরাদ্দ আসতে দেরি হওয়ায় আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের হাতে তা দিতে পারিনি। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পেলে অবশিষ্ট টাকা পরিবারগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 68 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ