থাইল্যান্ড বা কেরালা নয়, ঘুরে আসুন বরিশাল-পিরোজপুরে

Print
থাইল্যান্ড বা কেরালা নয়, ঘুরে আসুন বরিশাল-পিরোজপুরে

যারা ভ্রমণ বা ঘুরতে যাওয়ার কথা বলতেই বিদেশের কথা বলে। তাদের জেনে রাখা উচিত- বিদেশে যে দৃশ্য দেখতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সেই একই দৃশ্য বা তার চেয়ে ভালো দৃশ্য আমাদের দেশেই রয়েছে।

যারা থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট বা ভাসমান বাজার নিয়ে আগ্রহ দেখান। যারা কেরালার ব্যকওয়াটার এর ছবি দেখে আফসোস করেন তারা দেখে আসুন বরিশাল আর পিরোজপুরের জলের এক স্বর্গ রাজ্য। আশা করা যায় এসব জায়গা পরিদর্শন করে গর্ব ভরে যাবে বুক। দেশে এমন সুন্দর জায়গা আছে দেখলে আপনি অবাক হবেন। ট্রিপ টু বাংলাদেশ নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি ট্রাভেলারদের প্রতিমাসে ৫-৬ টি ট্যুর পরিচালনা করছে বরিশাল-পিরোজপুরের জন্য।

বরিশাল-পিরোজপুরের-ঝালকাঠির নদী আর গ্রামের ভেতর বয়ে যাওয়া অসংখ্য খাল রয়েছে। ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল- একথাতো পরিচিত। কিন্তু অনেকেই জানেন না এ নদী-খালের মধ্যে কি অপরিসীম স্বর্গীয় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

বরিশালে প্রতি এলাকায়ই একটি নদী নিদেন পক্ষে একটি খাল রয়েছে। ভরা বর্ষায়তো বটেই, শীতকালেও এসব খালে পানি প্রবাহ থাকে। তাই বছর ভর ঘুরে বেড়ানো যায় শান্ত স্নিগ্ধ এ এলাকায়। ছোট খালের দুপাশে কোথাও ফসলের মাঠ, কোথাও পতিত ভুমি কোথাও বা বসতবাড়ি- সব কিছুই ছবির মতো মনে হবে আপনার কাছে। কিচুক্ষন পর পর আছে গ্রামীন ছোট বাজার। আর সে বাজারের আছে টাটকা সব শাক সবজি। দুপুরে খেতে চাইলে আছে তারও ব্যবস্থা।

সবচেয়ে আকর্ষনীয় যে জিনিষটি আপনার মন কেড়ে নেবে তা হল ফ্লোটিং মার্কেট বা ভাসমান বাজার। পানিপ্রধান অঞ্চল বলে স্বভাবতই এখানকার জীবনযাত্রায় নৌকার ভুমিকা প্রবল। কতোটা প্রবল তা এখানে না এলে বোঝা যাবেনা। কিছু কিছু এলাকার অধিবাসীদের বাণিজ্যের বেশ বড় অংশ চলে জলে বসে। আর এ কারণেই বরিশাল, পিরোজপুর আর ঝালকাঠিতে গড়ে উঠেছে অনেকগুলো ভাসমান বাজার।

বরিশালের বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীতে প্রতি শনি এবং মঙ্গলবার বসে বিশাল ধান আর চালের ভাসমান বাজার। খুব সকাল থেকেই কয়েকশ নৌকায় করে কারবারি এবং গৃহস্থরা ধান চাল নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। অনেকে আসেন খালি নৌকা নিয়ে চাল কিনতে। পুরো প্রক্রিয়াটাই চলে নদীতে বসে।

ধানের বাজার ছাড়াও আছে ভাসমান সবজি বাজার। নাজির পুর এর বৈঠাকাঠা, উজিরপুর এর হারতা, মাহমুদকাঠি সহ বেশ কটি জায়গায় আছে এ সবজি বাজার। এখানেও স্থানীয় মানুষজন তাদের শাক সবজি নৌকায় করে নিয়ে এসে নৌকায় করেই বিক্রি করে থাকেন। সকাল থেকেই জমে ওঠে এ বাজার। স্থানীভাবে উৎপাদিত লাল শাক, পালং শাক, পুই শাক, কলা, চিচিংগা, বরবটি, শশা, টমেটো, ঢেরশ, মুলা ইত্যাদি নানান সবজি দিয়ে ভরপুর থাকে এসব নৌকায়। অসাধারন ফটোজেনিক জায়গা এটি। বলা যায় ফটোগ্রাফারদের স্বর্গরাজ্য। শান্ত জলের মাঝে সবজি বোঝাই নৌকাগুলোতে বেচা কেনা চলে হরদম।

আর আপনি যদি যান জুলাই থেকে অক্টোবর এর মাঝে তবে দেখা পাবেন অসম্ভব সুন্দর এক বাজারের। সেটা হলো ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজার। বাংলাদেশের উৎপাদিত মোট পেয়ারার প্রায় ৮০ ভাগই উৎপাদিত হয় ঝালকাঠির বিভিন্ন গ্রামে।

আটঘর, কুরিয়ানা, ডুমুরিয়া, বেতরা, ডালুহার, সদর ইত্যাদি এলাকার প্রায় ২৪,০০০ একর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়। আর এ পেয়ারা বেচা কেনার জন্য ঝালকাঠির ভিমরুলিতে জমে ওঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান বাজার। প্রতি মৌসুমে এ বাজারে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়।

প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে কেনা বেচা। অনেক দূর দূরান্ত থেকে পেয়ারা চাষীরা তাদের ক্ষেতের পেয়ারা নিয়ে আসেন এ বাজারে। আর ক্রেতারাও আসেন অনেক দুর থেকে। সাধারনত নৌকায় থাকা পুরো পেয়ারাই এক লটে কেনা বেচা হয়। ভরা মৌসুমে এ নৌকা পেয়ারা মাত্র ৩০০ টাকায়ও কিনে নেয়া যায়।

তো যদি স্রেফ ২ রাত ১ দিন সময় পান হাতে, দেখে আসুন দক্ষিন বাংলার অপার সে সৌন্দর্য, অনুভব করে আসুন বাংলার রুপ।

কোন দিনে কোথায় বাজার বসে:

– বানারীপাড়ার চালের বাজার: শনিবার এবং মঙ্গলবার
– উজিরপুরের হারতার সবজি বাজার: রবি এবং বুধবার
– নাজিরপুর এর বৈঠাকাঠা সবজি বাজার: শনি এবং মঙ্গলবার
– ঝালকাঠির ভিমরুলির পেয়ারা বাজার: প্রতিদিন (জুলাই থেকে অক্টোবর)

বাজার দেখতে হলে উপরের এ দিন মিলিয়ে যাওয়াই ভালো। সবগুলো বাজারই খুব সকালে বসে এবং দুুপরের মধ্যে শেষ হয়ে যায় তাই সকালে যাওয়াই উত্তম। আর শুধু জলভ্রমণ করতে হলে যে কোন দিনই যাওয়া যায়।

কি করে যাবেন:
ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭ টায় ঞুলারহাট এর উদ্দেশ্যে ২-৩ টি লঞ্চ ছেড়ে যায়। এতে উঠে পরদিন সকাল ৬ টার দিকে বানারীপাড়া নেমে যাবেন। ভাড়া নেবে ডেক ১৮০ টাকা, কেবিন: ১০০০ টাকা (সিংগেল) আর ডাবল ১৮০০ টাকা।

এছাড়া ঢাকার গাবতলি থেকে স্বরুপকাঠির উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। এতে উঠে বানারীপাড়া যাবেন। ভাড়া নেবে ৫০০ টাকা।

বরিশাল হয়েও যেতে পারেন। লঞ্চ এ বা বাসে বরিশাল গিয়ে আবার বাসে বা অটোতে করে বানারীপাড়া।

কিসে ঘুরবেন:
বানারীপাড়া পৌঁছাবেন সকাল ৬ টার মধ্যে। এরপর যে কেন একটি রেষ্টুরেন্ট এ নাস্তা করে আবার নদী তীরে চলে আসুন। একটি বড় ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করুন। বলবেন আপনি ৬-৭ ঘন্টা ঘুরবেন এভাবে: বানারীপাড়া-আটঘর-কুড়িয়ানা, ভিমরুল ও মাহমুদকাঠি অথবা বানারীপাড়া-হাড়তা বা বৈঠাকাঠা।

১০-১৫ জন বসার মত একটি ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া নেবে ১৫০০ টাকার মত। দুপুরে কুড়িয়ানার বিখ্যাত বৌদির রেষ্টুরেন্ট (সকাল সন্ধ্যা) এ খেয়ে নিতে পারেন। আগে অর্ডার করলে ভালো খাবার রান্না করে রাখবেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এ বাজারটির ছোট বৌদির রেষ্টুরেন্ট এ কয়েকশ বিদেশী খাবার খেয়েছেন।

ফেরার সময় বানারীপাড়া থেকে বাসে করে চলে আসুন গুঠিয়া। গুঠিয়ার বিখ্যাত বায়তুল আমান জামে মসজিদ দেখে অটো নিয়ে চলে যান দুর্গাসাগর। দুর্গাসাগর দেখে বাসে উঠে চলে যান বরিশাল শহরে। এখানে আপনি প্রতি আধা ঘন্টা পরই বাস পাবেন। নথুল্লাবাদ নেমে রিক্সা বা অটো নিয়ে লঞ্চ ঘাট। এ ঘাট থেকে ৮.৩০ থেকে ৯ টার মধ্যে ৩-৪ টি লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

যারা ১ রাত থাকতে চান: তারা স্বুরপকাঠির মিয়ার হাটে হোটেল ইফতি থাকতে পারেন। একদম নদীর পাড় ঘেষে গড়ে ওঠা সাধারন মানের এ হোটেলটিতে থাকাও হবে একটা অভিজ্ঞতা।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 231 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি