দরপত্র ছাড়াই বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্বে

Print

যমুনা নদীতে ১৯৯৮ সালের জুনে নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুতে সবচেয়ে বেশি টোল আদায় করে সরকার। দুই দফায় দরপত্র বাতিল, পছন্দের অপারেটর নিয়োগে দরপত্রে মনগড়া শর্তারোপের অভিযোগসহ নানা ঘটনা-নাটকীয়তা শেষে প্রতিযোগিতাহীন ঠিকাদার হিসেবে সরাসরি কাজ দেওয়া হয়েছে সিএনএস নামের প্রতিষ্ঠানকে।
‘অন্তর্বর্তীকালীন’ হিসেবে আগামী ৬ মাস দেখিয়ে দরপত্রহীন অপারেটর হিসেবে সিএনএসকে কাজ দেয় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। গত ২৭ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়েছে। প্রস্তুতিগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরুর কথা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তবে এর আগে একই প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৮ গুণ বেশি অর্থে কাজ পাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতে সম্মতিও ছিল একটি মহলের। বিষয়টি গণমাধ্যমে জানাজানি হলে নানা দেনদরবার এবং হিসাব কষে আগের অপারেটরের হারেই কাজটি দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল সূত্র তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কবীর আহমেদ বলেন, সেতুর টোল আদায় নিয়ে সিএনএসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে; এটা ঠিক। তবে কাজ শুরুর বিষয়টি ১৫ জানুয়ারি বা অন্য তারিখ থেকেও হতে পারে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অপারেটর সিএনএসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনীর উজ জামান চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ১৫ জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরু করছি। সেতু বিভাগের অনুরোধে আমাদের আগের অপারেটরের রেটেই কাজটি করব।
জানা গেছে, দরপত্র আহ্বান না করে প্রাথমিকভাবে ৬ মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় সিএনএস (কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম) নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। এর আগে সর্বশেষ ৫ বছর টোল আদায় করেছে জিএসআইসি-সেল-ইউডিসি। ৩০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির চুক্তি শেষ হয়েছে। সে সময় সেতু বিভাগ থেকে জরুরি কারণে অন্তর্বর্তীকালীন অপারেটর হিসেবে (৬ মাসের জন্য) দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়া সরাসরি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিতে বলা হয়। বিষয়টির বৈধতা পেতে ২৬ এপ্রিল সরকারি অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে (সিসিইএ) পাঠানো হয়। এরপর ১৬ মে ‘জরুরি’ বিবেচনায় সরাসরি পদ্ধতির অনুমোদন পায় সেতু বিভাগ। কিন্তু কী কারণে এই পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটল এ নিয়েই আলোচনা চলছে সংশ্লিষ্ট মহলে। এর আগে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়েও দরপত্র আহ্বান করে সওজ। কিন্তু পরে তা বাতিল করে ৬ মাসের জন্য সিএনএসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নিয়ে দরপত্র ছাড়াই পরে সিএনএসকে ৫ বছরের জন্য নিয়োগ করা হয়।
দেশের সবচেয়ে বড় বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় ও রণাবেণে ঠিকাদারের পেছনে খরচ হতো মাসে ২৭ লাখ টাকা। একই সেবা দিয়ে সিএনএস চেয়েছিল আদায় করা টোলের সাড়ে ১২ শতাংশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, কোনো প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিতেই পারে। তবে এ নিয়ে গত কয়েক মাস একটি মহলের সায় এবং চাপ ছিল বিস্ময়কর। তবে আপাতত স্বস্তির দিক হচ্ছেÑ আগের প্রতিষ্ঠানের হারেই কাজটি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে দরপত্রের প্রক্রিয়া চলছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছেÑ গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে বড় ট্রাকের টোল আদায় চলছে এক্সেলের পরিবর্তে ওজনের ভিত্তিতে। এর ফলে বর্তমানে টোল আদায় হচ্ছে গড়ে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা; আগে ছিল তা ১ কোটি ২০ লাখে। সিএনএসের প্রস্তাবে রাজি হলে প্রতিমাসেই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে যেত বাড়তি চার থেকে সাড়ে চার কোটি টাকা।
সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, একক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া সরকারের ক্রয় আইনের পরিপন্থী। তবে আইনে এ-ও বলা হয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো বিকল্প না থাকলে দরপত্র ছাড়া কাজ দেওয়া যায়। আবার সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিকে নিরুৎসাহ করা আছে পিপিআরের বিধিতেই। পিপিআর ৭৪ (২)-এ বলা আছে, ‘সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে অবাধ প্রতিযোগিতার সুফল পাওয়া যায় না বা স্বচ্ছতার অভাব থাকে বা অগ্রহণযোগ্য এবং প্রতারণামূলক তৎপরতাকে উৎসাহিত করতে পারে বিধায় এই পদ্ধতির প্রয়োগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করিবেন’।
সেতু কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণ মেয়াদের টোল আদায়কারী নিয়োগে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলে প্রথমে আপত্তি এবং এরপর আরও জটিলতার কারণে দুই দফা দরপত্র বাতিল হয়ে যায়। অন্য অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করে যে দরপত্র দলিলে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তাতে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটে (সিপিটিইউ) এই অভিযোগ গেলে দরপত্র বাতিল করা হয়। এখন নতুন করে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব হবে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন দেখিয়ে ৬ মাসের জন্য অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৮ সালে চালুর পর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায়, সেতুর মেরামত ও রণাবেণ কাজে আন্তর্জাতিক ঠিকাদার নিয়োগ করে আসছে সেতু বিভাগ। বিভিন্ন সময় যন্ত্রপাতি কিনেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। এখন সাধারণ যন্ত্রপাতি ছাড়া টোল আদায়ে বড় বিনিয়োগ করতে হয় না। ইন্টারন্যাশনাল রোড ডায়নামিকের (আইআরডি) কানাডা স্ট্যান্ডার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে টোল আদায় হচ্ছে। আগের প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ এপ্রিলে শেষে এখন নিজেরাই টোল আদায় করছে সেতু কর্তৃপক্ষ।
সূত্র মতে, সেতু বিভাগ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি তথা ডিপিএমের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় মন্ত্রিসভা কমিটিকে জানিয়েছে, টোল অপারেটর নিয়োগের জন্য ১ম দফায় সার্ভিস বিবেচনায় ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইওআই (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট) আহ্বান করে। তবে ইওআই মূল্যায়নকালে মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, পরিকল্পনা কমিশনের সিপিটিইউ তথা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের মতামত এবং হোপের (হেড অব প্রকিউরিং এনটিটি-ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান) অনুমোদন অনুযায়ী ইওআই বাতিল করা হয়। এরপর গত বছরের ২৩ জুলাই ‘এক ধাপ দুই খাম’ পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু দরপত্র দাখিলকারী একটি প্রতিষ্ঠান সিপিটিইউ-এর রিভিউ প্যানেলে আপিল করে। এরপর কাজটিকে সার্ভিস বিবেচনায় ‘প্রসেস’ করার ব্যাপারে ‘অবজারভেশন’-এ উল্লেখ করে রিভিউ প্যানেল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাজটিকে সার্ভিসের আওতায় নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেয় সিপিটিইউ। তারপর টোল অপারেটর নিয়োগে স্ট্যান্ডার্ড ডকুমেন্ট সরবরাহের জন্য সিপিটিইউকে গত ৩০ নভেম্বর চিঠি দেয় সেতু বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ জানুয়ারি টোল অপারেটর নিয়োগে ইওআই নোটিশসহ আরএফপি ডকুমেন্ট পাঠানো হয়। এরও পর ১৬ মার্চ ইওআই আহ্বান করে ৪ মে তা গ্রহণ করে সেতু কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ইওআইয়ের পর শর্টলিস্ট চূড়ান্তকরণ, আরএফপি ইস্যু ও গ্রহণ, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৬ মাস লেগে যাবে। তাই জরুরি বিবেনায় ৬ মাসের জন্য অপারেটর নিয়োগের প্রস্তাব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬-এর ৬৮ (১) ধারা অনুযায়ী সিসিইএতে পাঠায় সেতু বিভাগ। এরপর অনুমোদন মেলে জরুরি বিবেচনায় অন্তর্বর্তীকালীন অপারেটর নিয়োগে।
এদিকে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল হার পুনর্নির্ধারণে প্রক্রিয়া শুরু করেছে সেতু বিভাগ। ১৯৯৭ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সেতুর টোল হার নির্ধারণ করা হয়। এরপর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ১৪ শতাংশ বাড়ে। এখন নতুন করে টোলের হার বৃদ্ধির পর্যালোচনা চলছে। এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। তবে কী পরিমাণ বাড়ানো হবে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 152 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ