দল ও পরিবারের বক্তব্যে ব্যাপক অমিল, অন্ধকারে পুলিশ

Print

গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যার ঘটনা নিয়ে রহস্যর সৃষ্টি হয়েছে। কয়জন হত্যা করতে এসেছিল, কয়টি মোটরসাইকেলে এসেছিল, তাদের পোষাক-পরিচ্ছদই বা কেমন ছিল তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়েও এই ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।

এরই মধ্যে লিটনের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম দাবি করেছেন, ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি হত্যাকাণ্ডের আগে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন এমপির নিরাপত্তাকর্মীদের ছুটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ এবং প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন কে ওই নিরাপত্তাকর্মীদের ছুটি দিয়েছিল। কেনইবা এই ছুটি দেওয়া হলো।
রবিবার বিকেলে বারডেম হাসপাতালে এমপি লিটনের মরদেহ আনা হলে সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে তিনি এমন প্রশ্ন তুলেন।
শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘তার (লিটন) শত্রুদের বিষয়ে আমার ধারণা নেই। তবে এলাকার লোক তাকে হত্যা করতে পারে না। আমার ভাইকে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কেন লিটন এই হত্যার পরিকল্পনা জানতে পারলো না সেটাই আমার অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।’
তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের আগে অজ্ঞাত কারণে লিটনের নিরাপত্তাকর্মীকে ছুটি দেওয়া হয়েছিল সেটা কেনো করা হয়েছিল এবং কারা করেছিল তা আমাদের এখনো বোধগম্য নয়।’
শহীদুল বলেন, ‘আমার ভাইয়ের সঙ্গে শুধু নেতাকর্মীরা নয় বিপুলসংখ্যক ক্যাডার সার্বক্ষণিক থাকতো। এরপরও কিভাবে লিটনকে হত্যা করা হলো?’
নিহত এমপি লিটনের বড় ভাই শহিদুল ইসলামের এমন বক্তব্যে সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, লিটনের বড় ভাইয়ের এমন বক্তব্যে লিটন হত্যাকাণ্ডের মোটিভ নতুন মোড় নিতে পারে।
এর ফলে লিটন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যে কোনো সময় নাটকীয় মোড় নিতে পারে। বিশেষ করে কিলিং মিশনের অল্প কিছুক্ষণ আগে লিটনের বাড়ি পুরোপুরি খালি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলেছে। হাইভোল্টেজ তদন্তের এমন জটিল প্লাটফরমে বাড়ির এক গৃহকর্মী ও দুই ব্যক্তিগত গাড়িচালকের ভূমিকা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এর আগে, ১ জানুয়ারি রবিবার সকাল ১০টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমপি লিটনের মরদেহ দেখতে এসে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, গাইবান্ধার সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যায় জামায়াত-শিবির জড়িত।
নানক অভিযোগ করে বলেন, জামায়াত-শিবির অনেক দিন থেকেই লিটনকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিল। অবশেষে তার শেষ রক্ষা হলো না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, হত্যাকারীরা কোনোভাবেই রেহাই পাবে না।
এমতাবস্থায় পরিবারের দেওয়া বক্তব্য এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের বক্তব্য ব্যাপক অমিল হওয়ায় অন্ধকারে রয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন রহস্যের ঘূর্ণিপাকে ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্ত।
এছাড়াও ঘটনার দিন দুপুরের পর থেকে বাড়িতে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং লিটনের সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ার বিষয়টিকে রহস্য উন্মোচনের অন্যতম প্রধান সূত্র হিসেবে মনে করছে পুলিশ।
এ পরিস্থিতিতে এমপির ৬ ঘনিষ্ঠভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডে ৭.৬৫ মডেলের পিস্তল ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণত টার্গেট কিলিংয়ের জন্য জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করে থাকে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে আমরা সর্বোচ্চ প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করছি। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা করা হচ্ছে। আশা করছি, স্বল্প সময়ের মধ্যেই খুনিদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
হত্যাকাণ্ডে ঘনিষ্ঠজনদের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গাইবান্ধা জেলার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বলেন, সব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এখনো নিশ্চিত করে কোনো কথা বলার সময় আসেনি।
উল্লেখ্য, গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় গাইবান্ধা-১ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে। তিন যুবক ঘরের ভেতর ঢুকে খুব কাছ থেকে এমপিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এর পরদিন রবিবার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। সোমবার ঢাকায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শেষে গাইবান্ধায় নেয়া হয় লিটনের লাশ। সেখানে তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 97 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ