দেশজুড়ে মাদকের ভয়াল আগ্রাসন, বেশি আসক্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা

Print

দেশজুড়ে মাদকের আগ্রাসন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাদকের ছোবলে বিষিয়ে উঠছে যুবসমাজ। খোদ সরকারি একাধিক সংস্থার পর্যবেক্ষণেই মাদক আগ্রাসনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন সবচেয়ে বেশি মাদকাসাক্ত হচ্ছে- এমন কথা বলছে মাদক নির্মূলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
অথচ এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠানটি অনেকটাই হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। ফলে তাদের মাদকবিরোধী অভিযানও ঝিমিয়ে পড়েছে। নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর মাদক উদ্ধারের পরিমাণ অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। তথ্যানুসন্ধানে দেশের মাদক পরিস্থিতির এ ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। অবশ্য মাদক উদ্ধার হ্রাসের পেছনে নানা সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি জনবল সংকটের কথা বলছে অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিরা।

আসক্তদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশে মাদক হিসেবে ইয়াবা ট্যাবলেট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে গাঁজা, ভারতীয় ফেনসিডিল, হেরোইন ও ফেথিডিনসহ নানা ধরনের ইনজেকশন। দেশের মোট মাদকসক্তদের মধ্যে ৭০ শতাংশই ইয়াবা আসক্ত। এদের বেশিরভাগেরই বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছর এবং বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, কোকেন ও ক্যাপটাগন (সাদা ইয়াবা) নামে দুটি ব্যয়বহুল মাদক সীমিত আকারে হলেও রাজধানীর অভিজাত পরিবারে ঢুকে পড়েছে। মুদি দোকানেও ইয়াবা : প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সারা দেশেই বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানেও ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। এতদিন শুধু মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চোরাচালানের কথা বলা হলেও এখন ভারত থেকেও ইয়াবা চোরাচালানের তথ্য পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম শিকদার বলেন, ইয়াবার মূল উপাদান এমফিটামিন উৎপাদনের দিক থেকে পৃথিবীতে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়। এ অবস্থায় অবৈধ পথে এমফিটামিন বাংলাদেশে ঢোকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ইয়াবার এমন সর্বগ্রাসী পরিস্থিতিতেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ইয়াবা উদ্ধার অভিযান আশংকাজনকভাবে কমে গেছে। অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৫ সালের নভেম্বরে ১ লাখ ৫১ হাজার ৯৩০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। অথচ চলতি বছর ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৪৭ হাজার ৬২৩ পিস। তবে শুধু ইয়াবা নয়, অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের চিত্রও হতাশাজনক। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এককভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর যথাক্রমে হেরোইন ১ দশমিক ৯৯ কেজি, গাঁজা ২১৬.২৫৮ কোজি, দেশী মদ ১.৭৫ লিটার, বিদেশী মদ ৫২৭ বোতল, বিয়ার ১ হাজার ৩৫১ ক্যান ও ২ হাজার ৬৮২ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। কিন্তু চলতি বছর উদ্ধার করা হয় যথাক্রমে হেরোইন দশমিক ০৬ কেজি, গাঁজা ১৮৫.৫৯ কোজি, দেশী মদ ৫.৫ লিটার, বিদেশী মদ ৩৭৯ বোতল, বিয়ার ৯৬ ক্যান ও ফেনসিডিল ১ হাজার ৫৬৯ বোতল।
রাজধানীর পরিস্থিতি ভয়াবহ : খোদ রাজধানীর পাড়া-মহল্লাতেই প্রকাশ্যে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক বিক্রি হয়। রাজধানীর কারওয়ানবাজারসহ বেশ কয়েকটি স্থানে রীতিমতো মাদকের হাট বসে। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে কারওয়ানবাজারের মাদক পরিস্থিতি নির্মূল করা যাচ্ছে না। তবে রাজধানীর মাদকপ্রবণ এলাকাগুলোয় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বানানীর অলিগলিতে ইয়াবার পাশাপাশি অবৈধ বিদেশী মদ-বিয়ারের ছড়াছড়ি। বনানী কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ এলাকায় শত শত কালোবাজারি রীতিমতো ফেরি করে বিদেশী মদ-বিয়ার বিক্রি করছে। গুলশান-বনানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও অবাধে বিদেশী মদ-বিয়ার বিক্রি হচ্ছে। আসন্ন খ্রিস্টীয় নববর্ষকে সামনে রেখে বিদেশী মদ-বিয়ারের চোরাকারবারিদের এখন দম ফেলারও ফুরসত নেই। মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানিকৃত এসব অবৈধ বিদেশী মদ-বিয়ার অবাধে বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন মদের বারেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনানী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বনানীর হোটেল সুইটড্রিম ও হোটেল সেরিনায় রীতিমতো বিদেশী মদের অবৈধ মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। এ দুটি হোটেলে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কথিত ‘লাইভ সং’-এর আড়ালে পাশ্চাত্য ধাঁচের মিউজিকের সঙ্গে বিদেশী মদ-বিয়ার পরিবেশন করা হয়। মোটা অংকের মাসোহারার বিনিময়ে দিনের পর দিন এ বেআইনি কর্মকাণ্ড চলতে দিচ্ছে স্থানীয় থানা পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা। রহস্যজনক কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট সার্কেলও অবৈধ বিদেশী মদ-বিয়ার উদ্ধারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে গুলশান সার্কেলের পরিদর্শক লায়েকুজ্জামান বলেন, লোকবল ও যানবাহন সংকটের কারণে ইচ্ছে থাকলেও যথাযথভাবে অভিযান চালানো যায় না। তারপরও কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অবৈধ বিদেশী মদ-বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে।
নতুন মাদকের আবির্ভাব : দেশে ভারতীয় ফেনসিডিলের নতুন কয়েকটি সংস্করণ ও নতুন ধরনের ইয়াবার সন্ধান পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে আইকন এক্সপি, কোডোকপ ও কোডেক্স নামে তিনটি নতুন ধরনের ফেনসিডিলের নমুনা দেশের বাজার থেকে জব্দ করা হয়। মূলত ভারতীয় ফেনসিডিলকেই নতুন এসব নামে বাংলাদেশে পাচার করা হচ্ছে। এছাড়া ক্যাপ্টাগন নামের একটি উচ্চমাত্রার এমফিটামিন-সমৃদ্ধ ইয়াবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ভয়ংকর মাদক হিসেবে পরিচিত। সূত্র জানায়, জর্মানিতে উৎপাদিত এ মাদক মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উচ্চমূল্যের কারণে এটি উচ্চবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া চট্টগ্রামসহ সম্প্রতি দেশের কয়েকটি স্থানে ভয়ংকর মাদক কোকেনের বড় বড় কয়েকটি চালান ধরা পড়ে। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, সীমিত আকারে হলেও দেশের অভ্যন্তরে মাদক হিসেবে কোকেন ব্যবহৃত হচ্ছে।
দেশে ভয়াবহ মাদকের আগ্রাসন বাড়লেও উল্লেখযোগ্য হারে মাদক উদ্ধার হ্রাসের পেছনে পেশাদারিত্বের অভাব ও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিকে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, গত এক বছরে নির্বিচারে বদলির কারণে অধিদফতরজুড়ে হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মাত্র ৯ মাসে ছোট এ অধিদফতরের ১ হাজার ১০০ জনবলের মধ্যে প্রায় ৭০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকেই বদলি করা হয়। এর ফলে মাদকবিরোধী কার্যক্রম এক প্রকার নেই বললেই চলে।
এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে একসঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করে কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেয়া হয়। এতে সাময়িকভাবে অভিযানিক কর্মকাণ্ড কিছুটা ব্যাহত হলেও নতুন বছর থেকে নতুন উদ্যোমে আমরা কাজ করতে পারব। একই সঙ্গে নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 351 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ