ধর্ষণ কি শুধু শারীরিক চাহিদা মেটানো?

Print

প্রতিদিন সকালে দৈনিক পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টালে চোখ পড়লেই দেখা যায় দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ করা হয়েছে কিশোরী কিংবা ছাত্রীকে। কেন তারা কি দোষ করেছে? ধর্ষণ কি শুধু শারীরিক চাহিদা মেটানো? একজন স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হয়ে কি এটা বলার অধিকার নেই যে, আমরা কেন অন্যায়কে মেনে নিব। হোক ছেলে বা মেয়ে। অন্যায় তো আর আইনের উর্ধ্বে না?

আমরা আমাদের সন্তান, বোন, ভাই এমনকি নিজের স্বামী, স্ত্রীর প্রতি যদি একটু খেয়াল রাখি তারা কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে মিশছে। একটা ভুল সারা জীবনের দুঃখ। আমরা যদি নিজ নিজ যায়গা থেকে নিজের দায়িত্বটা পালন করতে পারি তাহলে আমাদের সমাজে আর কোন অপরাধীর জন্ম হবে না। আমাদের বিবেক এবং নৈতিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরাই পারি একটি সুশিল সমাজ গড়ে তুলতে।

ধর্ষণের কথা বলতে গেলে চলে আসে আমাদের মা-বোনদের ইজ্জতের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার এর দৃশ্য। সেই ৭১’র সময় পাক বাহিনীর হাতে আমাদের কত মা-বোন ইজ্জত দিয়েছেন তার কোন নির্দিষ্ট হিসাব নাই।

১৯৭১ গেছে, আজ ২০১৭। ধর্ষণ কিন্তু থেমে নেই। একাত্তরের যুদ্ধের সময় মা-বোনরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর আজও কেন ধর্ষণ করা হচ্ছে আমার বোনকে?

আমাদের চারপাশটা কেমন যেন এক বৈচিত্র্যে ছেয়ে গেছে। আর এই ধর্ষণ বা গভীর মেলামেশা যেন বেড়েই চলেছে। এর পিছনের কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট কোন কিছুর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছেনা।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) সারা দেশ থেকে গড়ে প্রতিদিন চার-পাঁচজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে। প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই শতাধিক ধর্ষিতার চিকিৎসা দিতে হচ্ছে সেখানে। এ তথ্য ওসিসি থেকে পাওয়া। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫৫৪টি অভিযোগ রুজু হয়েছে। এর মধ্যে রাস্তা থেকে অপহরণ করে গাড়ির মধ্যে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলাও রয়েছে বেশ কয়েকটি। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে সারা দেশে ৬২০ জন, ২০১২ সালে ৮৩৬ জন, ২০১৩ সালে ৭১৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়। তবে অপহরণ করে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বেড়েছে”।

সমিতির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, রাজধানীসহ সারা দেশেই নারী নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে।অপহরণের পর নারীদের ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। বিশেষজ্ঞদের এসব পরিসংখ্যান ও মন্তব্যের পাশাপাশি গত বেশ কিছুদিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণেও দেখা যায়, রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণপ্রবণতা মারাত্মক রূপ নিয়েছে।

একটু দেখে নেওয়া যাক বিগত সময়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার হওয়া ধর্ষণের শিরোনাম:

* দুলাভাইয়ের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে পঞ্চম শ্রেণীর এক শিশু। সোমবার সন্ধ্যায় মাদারীপুরের উত্তর মহিষের চরে এ ঘটনা ঘটে। শিশুটিকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেলে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

*ধর্ষণের শিকার ১৩ বছরের এক কিশোরী গৃহকর্মী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (১১ মার্চ) তার মৃত্যু হয়। ওই কিশোরী বানারীপাড়া উপজেলার বাকপুর এলাকার এক দিন মজুরের মেয়ে।

* সিলেটের জৈন্তাপুরে ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ (৩০) ও তাঁর মেয়েকে (১৬) উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) ভর্তি করেছে পুলিশ। আজ শনিবার দুপুরের দিকে দু’জনকে ভর্তি করা হয়। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সফিউল কবির।

*মুঠোফোনে সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের টানে সরাসরি সাক্ষাৎ। কিন্তু বখাটে যুবক বিশ্বাসের মর্যাদা রাখলেন না। সহযোগীদের নিয়ে মেয়েটি ও তার বোনকে ধর্ষণ করলেন। পালিয়ে রক্ষা পেয়েছে মেয়েটির ভাতিজি। গত রোববার রাতে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় এ ঘটনা ঘটেছে। মামলা হয়েছে তিন যুবকের নামে।

এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রতিদিন আমাদের আশপাশে ঘটছেই। এর শেষ কোথায়? কি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঠেকাতে? এইপ্রশ্নের উত্তর কে দিবে? আমরা যে সমাজে রয়েছি সেই সমাজে কি আমার বোন, আমার মেয়ে, আমার প্রতিবেশী নিরাপদে আছে? উত্তর যদি না হয়ে, তাহলে আমরা কেন বুক ফুলিয়ে বলি আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক?

আরেফিন সোহাগ,
লেখক ও সাংবাদিক

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 161 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ