নিজামীর ক্ষমতাধর হয়ে উঠার নেপথ্যে

Print

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আল বদর প্রধান ও জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অদৃশ্য শক্তির বলে ব্যাপক ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা গ্রহনের পর মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন নিজামী যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল, কয়েকটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিশেষ একটি দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় একাত্তরের এই যুদ্ধাপরাধী দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ দাপুটে অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজামীর ক্ষমতাধর হয়ে উঠার পেছনে তাঁর একাত্তরের বিতর্কিত ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। মূলত একাত্তরে আল বদর বাহিনীর প্রধান হিসেবেই দেশি বিদেশি অপশক্তির দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হন নিজামী।

স্বাধীনতার সুফল থেকে জনগণকে বঞ্চিত করতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সেই অপশক্তিগুলোর যে এজেন্ডা তা বাস্তবায়নের জন্য নিজামীই ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে বিশ্বস্ত নাম। তাই গোলাম আজমের পর নিজামীর হাতেই জামায়াতের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয়। একাত্তরের আল বদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর রাজনীতিতে পুনঃবাসিত হওয়ার পেছনে সেনা সরকারগুলোর অবদান কম নয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলে গোলাম আজমের মতো নিজামীও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

১৯৭৫ সালের আগষ্টে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হওয়া শুরু করে। জেনারেল জিয়া সামরিক আইন জারি করে দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া ক্ষমতায় বসে দালাল আইন বাতিল করেন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন। তিনি জামায়াতে ইসলামের উপর থেকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন এবং গোলাম আজম, নিজামীসহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফিরে আসার সুযোগ দেন।

দেশে ফিরে ১৯৭৮ সালে নিজামী ইসলামী ছাত্র সংঘকে ছাত্র শিবির নাম দিয়ে পুনঃগঠিত করে স্বাধীন বাংলাদেশে রগকাটা রাজনীতির সূচনা করেন। ১৯৭৯ সালে এক কনভেনশনের মাধ্যমে “জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশ” নামে জামায়াত কার্যক্রম শুরু করলে নিজামী ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব পান। জিয়া এবং এরশাদের সামরিক শাসনের ছত্রছায়ার জামায়াতে ইসলাম একটি আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়। এ সময় সরকারি বেসরকারী সব সেক্টরে তাদের কর্মী সমর্থকরা অবস্থান গেঁড়ে নিতে শুরু করে। এর পেছনে অনুগঠক হিসেবে কাজ করেন নিজামী। তাঁর সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের সখ্যতা গড়ে উঠে।

জিয়া এবং এরশাদ সরকারও মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হন। পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে পাকিস্তান। মতিউর রহমান নিজামী ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে জামায়াতের সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং আমীর নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত  দায়িত্ব পালন করেন।  গোলাম আযম আমিরের পদ থেকে অবসরে গেলে ২০০০ সাল থেকে নিজামীর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় জামায়াতে ইসলামী। নব্বই পরবর্তী সময় থেকেই জামায়াতের ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন নিজামী।

পাবনা-১ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে নিজামীকে ২০০১ সালে মন্ত্রিত্ব দেন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া। প্রথমে দুই বছর কৃষি মন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে সরকারের পরের তিন বছর ছিলেন শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেন নিজামী। এই সময় প্রধানমন্ত্রী পুত্র তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় তাঁর। তাই একপর্যায়ে কৃষি মন্ত্রী থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালেই হাওয়া ভবনের যোগসাজেসে ভারতের উলফার জন্য পাকিস্তানি আইএসআই-এর দেয়া অস্ত্রের চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসেন তিনি যা পরবর্তিতে পুলিশের হাতে আটক হয় এবং এই মামলায় আদালতের রায়ে তাকে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করা হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ড পাওয়া নিজামীর জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামে। স্থানীয় বোয়ালমারি মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করা নিজামী কামিল পাস করেন ১৯৬৩ সালে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে। মাদ্রাসার ছাত্র থাকা অবস্থায় নিজামী ১৯৬১ সালে জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৬ থেকে তিন বছর পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালনের পর একাত্তরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন নিজামী।Nizami-

১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে মূলত ছাত্রসংঘের কর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় আলবদর বাহিনী। একাত্তরে এই বাহিনী হত্যা, ধর্ষন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও বুদ্ধিজীবী হত্যায় পাকিস্তান বাহিনীর সাথে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর নিজামীর বিচার শুরুর হলে ২০১৪ সালে ট্রাইব্যুনাল তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। পরবর্তিতে সুম্প্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রাখলে রিভিউ আবেদন করেন নিজামী। সর্বশেষ গত ৫মে বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন একটি বেঞ্চ নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 46 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ