নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরিতে মালিকদের ব্যর্থতা বাড়ছে

Print
নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরিতে মালিকদের ব্যর্থতা বাড়ছে
নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরিতে মালিকদের ব্যর্থতা বাড়ছে

সার্বিক নিরাপত্তা, পরিষেবা ব্যবহারে ব্যর্থতা রয়েছে। শ্রমের নিম্ন মজুরির ওপর ভর করে হ্রাসমান পণ্যমূল্যের বাজারে প্রতিযোগিতায় বড় হওয়ার সাফল্যও আছে। রফতানি আয়ের প্রধান খাত বস্ত্র ও পোশাক শিল্প নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রথম পর্ব

রাইসা ফ্যাশনস লিমিটেডের কারখানার প্রাথমিক পরিদর্শন সম্পন্ন হয় ২০১৫ সালে। ইউরোপীয় ক্রেতাজোট অ্যাকর্ডের পরিদর্শনে উঠে আসা ত্রুটি সংশোধনে একাধিকবার তাগাদাও দেয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। কিন্তু সময়মতো এসব ত্রুটি সংশোধনে ব্যর্থ হয়েছে নারায়ণগঞ্জের কারখানাটি। রাইসা ফ্যাশনে শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৩০০।

নির্ধারিত সময়ে ত্রুটি সংশোধন করতে পারেনি উত্তর আমেরিকার ক্রেতাজোট অ্যালায়েন্সের আওতাধীন পোশাক কারখানা ক্লিয়ার টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডও। এ কারণে চলতি মাসে অ্যালায়েন্সের ব্যর্থ কারখানা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের এ প্রতিষ্ঠান। অনিরাপদ কর্মক্ষেত্রেই কাজ করছেন ক্লিয়ার টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রায় ৬০০ শ্রমিক।

নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের এ দুটি কারখানাই শুধু নয়, মূল্যায়ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরিতে ব্যর্থ কারখানার সংখ্যা বাড়ছে। মূল্যায়ন কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যর্থ কারখানার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০০-এর কাছাকাছি। যদিও ২০১৬ সালে নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরিতে ব্যর্থ কারখানার সংখ্যা ছিল ১৪১। আর ২০১৫ সালে এ ধরনের কারখানা ছিল ২১টি।

ত্রুটি সংশোধনে ব্যর্থতার একাধিক কারণের কথা জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শেয়ার্ড ভবনে কারখানা হওয়ায় ত্রুটি সংশোধনের দায় গ্রহণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের সদস্য ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারী না হওয়ার কারণেও সংশোধনে গুরুত্ব দিচ্ছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য না হওয়ার কথাও বলছেন কোনো কোনো কারখানা মালিক।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ত্রুটি সংশোধনে কারখানাগুলোকে সময় দেয়ার পরও সে অনুযায়ী সংশোধন করতে না পারলে সতর্কতা জারি হয়। এর পরের ধাপে কারখানাগুলোর ওপর স্থগিতাদেশ আসে। মোট কারখানার বিবেচনায় এ ধরনের কারখানার সংখ্যা বেশি নয়। এরই মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান কারখানা স্থানান্তর করে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। অনেকে সংশ্লিষ্ট ক্রেতাদের সঙ্গে আর কাজ করছে না। এসব কারখানার বিষয়ে দুই ক্রেতাজোটের সঙ্গে আমাদের আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। এদের ব্যর্থ ঘোষণার পেছনে কী ধরনের উদ্দেশ্য আছে, তা জানতে চাওয়া হবে সেখানে।

২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন ও ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন শিল্প মালিকরা। ২০১৪ সালে শুরু হয় মূল্যায়ন কার্যক্রম। ২০১৪ সালে নিরাপত্তা পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ কারখানা ছিল মাত্র একটি। পরবর্তীতে মূল্যায়ন কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মালিকদের নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার চিত্রও বড় হতে থাকে। শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ কারখানার সংখ্যা এখন ২০০ ছুঁই ছুঁই।

নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের নিশ্চয়তা দিতে না পারায় চলতি মাসেই ব্যর্থ কারখানার তালিকায় নাম লিখিয়েছে রূপা ফ্যাব্রিকস লিমিটেড। যোগাযোগ করা হলে রূপা ফ্যাব্রিকস লিমিটেড ও রূপা নিটওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম বলেন, ক্রেতাজোটের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার ঘোষণা পুরোপুরি উদ্দেশ্যমূলক। কারণ আমাদের নিরাপত্তা পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বনির্ধারিত সময়সীমা এখনো অতিক্রম হয়নি। আর আমাদের হিসাবে আমরা ৬০ শতাংশের বেশি ত্রুটি সংশোধন করে ফেলেছি। আমাদের বড় ক্রেতাদের মধ্যে একটি ওয়ালমার্ট। আমরা চেষ্টা করছি ব্যর্থতার তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে।

ত্রুটি সংশোধনে অবহেলার পাশাপাশি আরো বেশকিছু কারণে ব্যর্থতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে পোশাক কারখানা। এর মধ্যে রয়েছে ত্রুটি সত্ত্বেও কারখানা খালি না করা, পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরিতে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন, সংস্কারের প্রমাণ না থাকা, মূল্যায়ন কর্মসূচিতে অসহযোগিতা ও কারখানার নকশায় ত্রুটি। এসব কারণে চলতি বছরই ব্যর্থ কারখানার তালিকায় স্থান পেয়েছে রাইসা ফ্যাশনস, ক্লিয়ার টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং রূপা ফ্যাব্রিকস ও রূপা নিটওয়্যার ছাড়াও ডিএসএল সোয়েটার, সমরোজ গার্মেন্টস, আইএফসিও গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইলস লিমিটেড, লিংক ওয়্যার লিমিটেড, মেরিডিয়ান ফ্যাশনস, ফারইস্ট ড্রেসেস, ডিফায়েন, জিহান নিট কম্পোজিট লিমিটেড, সান সিড অ্যাপারেল, কিমিয়া গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, কিমিয়া অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ইডেন অ্যাপারেলস, ওয়েস্টার্ন ড্রেস ইউনিট ২, জান কম্পোজিট মিলস, জিসাস ফ্যাশন লিমিটেড ও ক্ল্যাক্সটন অ্যাপারেলস অ্যান্ড টেক্সটাইলস লিমিটেড।

ক্লিয়ার টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ বলেন, আমাদের কারখানা ভবনটি ২০০৫ সালে নির্মিত। ক্রেতাজোট থেকে যেসব ত্রুটি সংশোধন করতে বলা হয়েছে, তা করতে ন্যূনতম দেড় কোটি টাকা প্রয়োজন। তাই দ্রুত এগুলো সংশোধন করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত বছর ব্যর্থ কারখানার তালিকায় স্থান পাওয়া পোশাক কারখানার মধ্যে রয়েছে তুসুকা প্রসেসিং, ক্রিয়েটিভ শার্টস (ইউনিট-২), আমিন ফ্যাব্রিকস, আর্টিস্টিক অ্যাপারেলস, ইন্ডিগো ওয়াশিং, সামিয়া গার্মেন্টস, সো নাইস গার্মেস্টস, ভ্যালিয়েন্ট গার্মেন্টস, এএমসি সোয়েটার, দারদা নিট ওয়্যারস, ম্যাগি অ্যান্ড লিজ করপোরেশন (পিভিটি), মাকস ফ্যাশন, মনটেক্স অ্যাপারেলস, আশিয়ানা গার্মেন্টস ও আশুলিয়া অ্যাপারেলস।

জানতে চাইলে আশুলিয়া অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোফতাহুস সাত্তার হিল্লোল বলেন, অনেক ধরনের ত্রুটি সংশোধন করলেও অগ্নিনিরাপত্তাজনিত ব্যয়বহুল কিছু পদক্ষেপ এখনো গ্রহণ করতে পারিনি। কারণ কারখানা ভবনের মালিক আমি নই। এ পরিস্থিতিতে আমাদের তৈরি পণ্যের মূল ক্রেতা কটন অন কটনের কাজ আমরা এখন করতে পারছি না। তবে অ্যাকর্ডের সদস্য নয়, এমন ক্রেতার কাজ চলছে। কিন্তু তা পরিমাণে খুবই কম। আর কত দিন এত কম কাজ নিয়ে কারখানা চালু রাখতে পারব, বুঝতে পারছি না।

কারখানার ত্রুটি সংশোধনে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক মো. সামছুজ্জামান ভূইয়া বলেন, অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের ক্ষেত্রে এসব কারখানার ভবিষ্যত্ নিয়ে বলতে পারছি না। তবে জাতীয় উদ্যোগের আওতায় যেসব কারখানার ত্রুটি রয়েছে, সেগুলো হয় সংশোধন করতে হবে, নয়তো অন্যত্র কারখানা সরিয়ে নিতে হবে। এসব পদক্ষেপ ছাড়া কারখানা চালু রাখা যাবে না।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 112 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ