নিশিকন্যাদের পারফিউমে উথাল-পাতাল রাতের ঢাকা

Print

দিনের বেলায় গাড়ি আর মানুষের জন্য পুরো ঢাকা শহরজুড়ে দম ফেলা দুষ্কর। একের পর এক গাড়ি যাচ্ছে আর আসছে। নিয়ম ভেঙে মানুষও যত্রতত্রভাবে রাস্তা পার হচ্ছে। গাড়ির হর্ন আর মানুষর চেঁচামেচিতে দিনের ঢাকা এক কথায় চিৎকারের নগরী।
কিন্তু রাতে! রাতের তো আর দিনের মতো এত গাড়ি আর মানুষ থাকে না। তবুও রাতের ঢাকা যেন অন্য এক রূপকথার ছবি আঁকে নগরীজুড়ে। বিদেশি সংস্কৃতির অনুকরণ, ড্রাগ, টাকার নেশায় অশ্লীল দৌড়ঝাপ, নিজের জন্য দখল করার উন্মত্ততা, আরও চাই-আরো চাই হাহাকার রব, মানবিকতা পাশ মার্কের নীচে নেমে যাবে অল্পদিন পর। এইডস এর ঝুকিঁর মাঝে আছে তরুন ও যুবক সম্প্রদায়।

সাধারণত ঢাকা শহরের রাত মানে কারওয়ান বাজার, সোয়ারিঘাট, সদরঘাট, সায়েদাবাদ, টিকাটুলির মোড়, গুলিস্তান, কমলাপুর, মতিঝিল, দৈনিকবাংলার মোড়, ফকিরেরপুল, শাহবাগ, মালিবাগ, মগবাজার মোড়, ফার্মগেট, মহাখালি, গাবতলী, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সহ সরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগের মতো কিছু স্পটে জীবিকা, জরুরি প্রয়োজনে আর ভাসমান মানুষেরা সারারাত জেগে থাকে।
শাহবাগ-দৈনিকবাংলা বা টিকাটুলির মোড়ে রাতের বেলা গরম ডিম-পরোটা খাননি এমন মানুষ কম পাওয়া যাবে। বাংলামোটরের কাছের সোহাগ কমিউনিউনিটি সেন্টারের মতো স্পটগুলোতে বিয়ের পার্টির অথবা উচ্ছিস্ট খাবারের বেচাবিক্রিকে কেন্দ্র করেও রিকশা চালকসহ রাতের ভ্রাম্যমান মানুষজনের খাবার বিকিকিনির বিশেষ হাট বসে যেন।
মতিঝিল সহ কয়েকটি স্পটে পত্রিকা গাড়ি রওয়ানাকে কেন্দ্র করেও রাতজাগা মানুষজনের ভিড়বাট্টা থাকে। জরুরি প্রয়োজনে অথবা কম পয়সায় এসব অকল্পনীয় দ্রুতগামী (!) গাড়িতে করে বাংলাদেশের যেকোন প্রান্তে ভোরের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়।
কমলাপুর, গাবতলী, সায়েদাবাদ এলাকায় চোখ-কান খোলা রাখলে প্রতারক মলম পার্টির পাল্লায় পড়া অজ্ঞান-বেসামাল লোকজনেরও সন্ধান মিলতে পারে। এমন অসহায় কাউকে বাড়ি পৌঁছে দেয়া নিয়েও সৃষ্টি হতে পারে মানবিক বিশেষ একটি রিপোর্ট।
রাতের ঢাকার আরেকটি জটলা চলে থানাকেন্দ্রিক। পুলিশ কাউকে ধরে এনেছে বা কোনও বিপদে পড়ে কেউ থানায় ছুটে এসেছেন, এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্য, পুলিশ, থানার দালাল কেন্দ্রিক হয়রানি-টানাহেঁচড়া, টাকা-পয়সা লেনলেন চলে। হাসপাতাল তথা সরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ, গাইনি ওয়ার্ড এসব স্পটকে কেন্দ্র করেও ভিন্ন ব্যস্ততা চলে রাতের ঢাকায়। স্বজন কেউ গুলি খেয়েছেন বা এক্সিডেন্ট করেছেন বা হার্টএ্যাটাক করেছে, এমন জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন স্বজনদের পেয়ে বসা দালাল শ্রেলির লোকজনের ব্যবসার দৌড়ঝাঁপ চলে।
জন্মমৃত্যু এসব রাতবিরাতেও থেমে থাকে না। গাইনি ওয়ার্ডে তেমন একজনের পর একজনকে নেয়া হচ্ছে লেবার রুমে, সেখানে প্রসূতির চিৎকার, বাইরে তসবিহ হাতে উদ্বিগ্ন স্বজনদের হাঁটাহাঁটি, একপর্যায়ে নবজাতকের চিৎকার কান্নায় পৃথিবীতে তার আগমন ঘোষণা, তোয়ালে পেঁচিয়ে স্বজনদের মুখ দেখাতে তাকে বাইরে নিয়ে আসা, এসবও রাতের ঢাকার দৃশ্য।
এমন অনেক ঘটনার সঙ্গে একপর্যায়ে অনুভব হবে রাতের ঢাকার রিপোর্টার পতিতা, পুলিশ, বেওয়ারিশ কুকুর ছাড়া আর বুঝি কেউ জাগে না! রাজধানী ঢাকা শহরের কত মানুষ যে নিরাশ্রয়, বছরের পর বছর কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট টার্মিনাল, স্টেডিয়াম এলাকা অথবা ফুটপাতে বছরের পর বছর ঘুমায়, তা রাতের ঢাকার রিপোর্টার-ফটোগ্রাফার ছাড়া এর চেয়ে ভালো আর কে জানে! দেশে সরকারের পর সরকার আসে যায়, অথচ নিরাশ্রয় এই মানুষজনের খোঁজ কেউ রাখে না!
রাত ১১টার পর থেকে ঢাকার শহরের বিভিন্ন জায়গায় নিশিকন্যা’রা জমায়েত হয়। ইচ্ছা করেই নিশিকন্যা বললাম- বেশ্যা বা পতিতা বলতে ইচ্ছা করে না। এদের সাথে থাকার জন্য ৫০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা খরচ হয়। আমি মনে করি প্রতিটা নিশি কন্যার একটা চোখের আলাদা ভাষা আছে। তারা তো আর চিৎকার করে ডাকবে না- আজ রাতের জন্য আমাকেনাও, আমি অনেক আদর করে দিবো, তার জন্য আমাকে কিছু টাকা দিলেই হবে। মজার ব্যাপার হলো- এই নিশি কন্যারা সমস্ত পুরুষের চোখের ভাষা এক নিমিশেষই বুঝে ফেলে।‘বড় হয়ে আমি একজন পতিতা হব’- এই বাসনা কি একজন মেয়েরও ছিল?
এই সব নিশিকন্যাদের কেউ চাকরি দেয় না। অন্য কোনো উপায় না থাকায় তারা এই পথ বেছে নেয়। তাদের কষ্টের টাকার ভাগ- বেশ কয়েকজনকে দিতে হয়।আমাদের সমাজ যাদেরকে পতিতা বলে। রবীন্দ্রনাথ তাদেরকে বারবনিতা বলেছেন,যাতে কথাটা শ্রুতি কটূ না লাগে।যারা নাইট ক্লাবে নেচে অর্থ উপার্যন করে তাদেরকে নর্তকি বা বাঈজি বলা হয়ে থাকে।অনেকে এই সব মেয়েদের খারাপ মেয়ে বলে থাকেন। আচ্ছা, এই মেয়ে গুলো যদি খারাপ হয়- তাহলে যে সমস্ত পুরুষ- তাদের কাছে যায় তারা কি? রাতের আঁধার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকার লালবাতির নিচে শুরু হয় এক অন্যরকম জীবন। এ যেন নগর জীবনের এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। রাত যত গভীর হয় ব্যস্ত ঢাকার কোলাহল থেমে নীরবতা বাড়তে থাকে। সভ্য মানুষের শহরকে গ্রাস করে নেয় নগ্নতা।
রাজধানী ঢাকা ১২-১৮ বছর বয়সী প্রচুর কিশোরী মেয়ে ভাসমান নিশিকন্যা। নগরীর বিশেষ কিছু স্পট যেমন- ফার্মগেট, হাইকোর্ট, রমনা পার্ক, শিশুপার্ক প্রভৃতি স্থানে ওদের বিচরণ। এছাড়াও বিভিন্ন সিনেমা হল, বিমানবন্দর, কমলাপুর রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং ফেরিঘাটে ওদের সবার উপস্থিতি দৃশ্যমান। পাশাপাশি ধামন্ডি, বনানী, গুলশান, বারিধারার মতো আবাসিক এলাকাতেও রাতের লালবাতির নিচে আলো-আঁধারীতে ওদের দেখা মেলে।একজন কিশোরী নিশিকন্যা প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জনের সঙ্গে মিলিত হয়। দেশে ১৫-২০ হাজারেরও বেশি কিশোরী নিশিকন্যা।পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে কিশোরী নিশিকন্যাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য তেমন কোন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই। রাজধানী ঢাকায় লালবাতির নিচে অপেক্ষমাণ এ কিশোরীদের অধিকার নিয়ে কারও যেন ভাবার সময় নেই।
রাজধানী ঢাকার ৪৯ থানার প্রায় পৌনে ১শ স্পটে ৪ শতাধিক হোটেল ও ২ সহস্রাধিক বাসা-বাড়ি ও ফ্ল্যাটে চলছে জমজমাট দেহ ব্যবসা। ঢাকার নয়াবাজারের ইংলিশ রোডের পতিতা পল্লী তুলে দেয়ার পর রাজধানী জুড়ে বিস্তার লাভ করে পতিতাবৃত্তির এই ব্যবসা।দেশে প্রতিদিন ৭ জন করে এইডস রোগী সনাক্ত হচ্ছে। বিশ্ব স্বা সংস্থার মতে আমাদের দেশে এইডস রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজার।বারিধারা বনানী ও গুলশান এলাকার দেড় শতাধিক গেষ্ট হাউজে রাতের বেলায় চলে মদ জুয়া ও দেহ ব্যবসা। কাজ হাসিলের জন্য এখানে প্রায় দেয়া হয় ওম্মা ওম্মা নাইট, থার্সডে নাইট ও ককটেল পার্টি। এসব পার্টিতে দেশী-বিদেশী কলগার্লরা অংশ নিয়ে আগত ভিআইপি অতিথিদের মন রাঙিয়ে তুলে।নগরীর ৮৫ ভাগ আবাসিক হোটেলে প্রতিদিন সাড়ে ৭ হাজার খদ্দেরের সমাগম ঘটে। আর এদের যৌনানন্দ দেয়ার জন্য সাড়ে ৫ হাজার ললনা নিজেদেরকে বিলীয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
যৌন ব্যবসায় লিপ্ত থাকা হোটেলগুলোর মাসিক আয় ৬ কোটি টাকা।সামান্য যৌনানন্দের জন্য প্রত্যেক খদ্দরকে ব্যয় করতে হয় ২৫০ টাকা।খদ্দরের দেয়া ২৫০ টাকা তিন ভাগ হয়, হোটেল ভাড়া বাবদ ১০০ টাকা, স্টাফ ফান্ডে জমা রাখা হয় ৫০ টাকা, পতিতা ও দালাল পায় যথাক্রমে ৮০ ও ২০ টাকা। দালাল বিহীন খদ্দর মিললে নিশিকন্যার ভাগ্যে জোটে আরো ২০ টাকা।১৩ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণীরা দেহ দান করে। তাদের ভোগ করতে ১৫ বছরের কিশোর হতে ৭০ বছরের বৃদ্ধ খদ্দর হিসেবে যাতায়াত করে।ঢাকার রাজপথে প্রতি রাতে প্রায় ৫ হাজার ভাসমান পতিতা শতাধিক স্পটে খদ্দর ধরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠে।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মক্ষিরাণীরা খদ্দের সংগ্রহ করে। মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলা নগর, পশ্চিমআগানগর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, আদাবর, শেখেরটেক, লালবাগ, চকবাজার, কোতোয়ালী, ওয়ারী, সুত্রাপুর, ধানমণ্ডি, জিগাতলা, কলাবাগান, শুক্রাবাদ, হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, রায়ের বাজার, মিরপুরের টোলারবাগ, পাইকপাড়া, প্রথম ও দ্বিতীয় কলোনী, ফার্মগেট, তেজকুণী পাড়া, নাখাল পাড়া, মুনিপুরী পাড়া, গ্রিনরোড, ইন্দিরারোড, রাজাবাজার, মগবাজার, মালিবাগ, মানিকনগর, সিদ্ধেশ্বরী, ইস্কাটন, শান্তিনগর, কাকরাইল, বেইলি রোড, পরিবাগ, শান্তিবাগ, মতিঝিল, আরামবাগ, শহীদবাগ, কমলাপুর, গোপীবাগ, শাহজাহানপুর, খিলগাও, বাসাবো, কদমতলা, গোড়ান, শনিরআখড়া, ধলপুর, গোলাপবাগ, ধনিয়া, শেওড়াপাড়া, কাজিপাড়া, ইব্রাহীমপুর, কচুক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, গুলশান, বারিধারা, বনানী, নিউডিএইচএস, উত্তরা, কামরাঙ্গীরচর, শহীদনগর, ইসলামবাগ ও হাজারীবাগ। উল্লেখিত স্পটগুলোর হোটেল, বাসাবাড়ী ও ফ্লাটে চলছে জমজমাট দেহব্যবসা।
গার্মেন্টস কর্মী, গ্রামের সহজ সরল মেয়ে, দরিদ্র ও অর্থ লোভী মেয়েদের টার্গেট করে দালালদের মাধ্যমে প্রতারণা করে তাদেরকে নিয়ে দেহব্যবসা চালানো হচ্ছে।নারী পতিতা হয় কেন?অর্থাভাবে বা দারিদ্র্যতাবশতঃ অনেক সময়ে মেয়েরা পতিতা বৃত্তি গ্রহণ করে।সংসারের অনাদর বা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিশিকন্যা বৃত্তি গ্রহণ করে।স্বামীর অনাদর অত্যাচারও এ পথে যাবার মস্ত বড় একটি কারণ।অতিরিক্ত বিলাসের প্রতি আকর্ষণ।কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য শিক্ষকদের শরণাপন্ন হন এবং তাদেরই পরামর্শে তাদের এ কাজে বাধ্য হয়। মিডিয়াতে জড়িয়ে পরা মেয়েরা এক সময় পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে এই পেশায় আসে।বিভিন্ন অফিসে পারসোনাল সেক্রেটারী নামে র্করপোরেট পতিতা রাখা হয়। এরা সোসাইটি র্গাল হিসেবে পরিচিত।
এত বেকারের দেশ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে কিন্তু কিছু গার্মেন্টস কারখানা ছাড়া রাতের শিফটে খুব বেশি এলাকায় বা ফ্যাক্টরিতে কাজ হয় না। বাদবাকি ঢাকা শহর রাত ১২টার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে! কারওয়ান বাজার, সোয়ারিঘাটের মতো এলাকার পাইকারি বিকিকিনির বাজারের কারণে সারারাত জেগে থাকে একদল পাইকার-দোকানি অথবা শ্রমিক মানুষ!
তবে রাতের ঢাকায় সবকিছুকে ছাপিয়ে একটাই দৃশ্য যেটা সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তা হচ্ছে নিশিকন্যাদের উদ্যাম পদচারণা। দেহ ব্যবসাও চলে যত্রতত্র। যেন একখানা পানের খিলি মুখে দেয়ার মতোই প্রতিটি রাত চিবিয়ে খায় এইসব ললনারা। পারফিউম মার্কা এইসব রমণীরা প্রতি রাতেই কারো না কারো শয্যায় হয়ে উঠেন উথাল-পাতাল। রাতের ঢাকার এই চিত্র যুগ যুগেরই বটে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 310 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ