নিয়ম মেনে চুক্তি হয় না দামি লেখকদের সঙ্গেও

Print

বই প্রকাশের ক্ষেত্রে লেখক-প্রকাশকের মধ্যে চুক্তির নিয়ম থাকলেও তা অধিকাংশ লেখকই জানেন না। এছাড়া নামি-দামি প্রকাশনীগুলো ‘দামি লেখকদের’ বাইরের তেমন কারও সঙ্গে বই নিয়ে চুক্তি না। এমনকি জনপ্রিয় নামি লেখকদের সঙ্গে যে চুক্তি করা হয়, তাতেও যথাযথ নিয়ম মেনে চলা হয় না। এছাড়া চুক্তিপত্রে সাধারণত কত কপি বই ছাপা হবে, কত শতাংশ রয়্যালিটি লেখক পাবেন, কত দিন পর্যন্ত এই বই এই প্রকাশকের কাছে থাকবে, বইয়ের স্বত্ব কে পাবে এসবই উল্লেখ থাকে। পাশপাশি প্রথম মুদ্রণ শেষ হলে লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে পরবর্তী মুদ্রণ হতে হবে নাকি অন্যকোনও পদ্ধতিতে বই প্রকাশিত হবে তাও উল্লেখ থাকে। তবে এই আইন নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তারা বলছেন, অপরিচিত নতুন লেখকদের কথা দূরে থাক, নামি-দামি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের ক্ষেত্রেও চুক্তি করার সময় যথাযথ নিয়ম মেনে হয় না।
বই মেলা

২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বর্তমানে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মনজুরুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যারা লাখ লাখ টাকা রয়্যালটি পাচ্ছেন, তাদের সঙ্গেও চুক্তিপত্র ঠিক আইনি চুক্তির মতো করে সবসময় করা হয় না।’ হুযমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর সৃষ্ট পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার মতো সচেতন ও অতি জনপ্রিয় লেখকও মৌখিক চুক্তিতে কাজ করেছেন বলে অনেক হিসেবই পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, চুক্তির প্রচলন করতে শেখানো যে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সেগুলো তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে না। দুএকটি প্রকাশনী সংস্থা চুক্তিগুলো করে সিভিল আইনজীবীদের দিয়ে যারা আসলে কপিরাইট বা চুক্তি বিষয়ে আদৌ জানেন না।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, দু-একটি প্রকাশনা সংস্থা ছাড়া কেউই লেখকদের সাথে চুক্তি করে বই প্রকাশ করে না। এমনকি নতুন লেখক এবং নিজেরা টাকা দিয়ে যেনতেন বই প্রকাশে আগ্রহীরা চুক্তি বিষয়ে কিছু জানেও না। তাদের ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি অনানুষ্ঠানিক মৌখিকভাবে ঘটে বলে বই প্রকাশ বা রয়ালটির টাকা না-পাওয়া নিয়ে পরস্পরের প্রতি অভিযোগ আছে কিন্তু কোন প্রমাণ নেই।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া একটি কি দু’টি প্রতিষ্ঠান লেখকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে গেলেও বেশিরভাগ প্রকাশকের এতে আগ্রহ নেই বলে জানালেন দেশির কয়েকজন বিশিষ্ট লেখক। এ প্রসঙ্গে কবি ও প্রাবন্ধিক আবিদ আনোয়ার বলেন, ‘লেখক-প্রকাশকের মধ্যে সাধারণত লিখিত চুক্তিপত্র হয় না। আমার সঙ্গেও হয় না। তবে মৌখিক চুক্তি হয়। রয়্যালিটি সাধারণ প্রথম সংস্করণ শেষ হওয়ার পর প্রকাশকরা আমাকে রয়্যালটি দেন। তবে রয়্যালিটির পরিমাণ খুবই কম।’প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত চুক্তিপত্রের আগে যেন বই প্রকাশ না করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘লেখকদের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করে চুক্তি করে। বাকিরা করে না। সবারই চূড়ান্ত চুক্তি করা উচিত। লিখিত চুক্তিপত্র ছাড়া বই প্রকাশে লেখকদের রাজি হওয়া উচিত নয়। বিশিষ্ট লেখকদের সঙ্গেও চুক্তি হয় না, এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গবেষক শাকুর মজিদ বলেন, ‘আমার দু’টি বইয়ে চুক্তি হলেও বাকি সাতটির ক্ষেত্রে প্রকাশকের সঙ্গে কোনও চুক্তি হয়নি।’
চুক্তি না করার বিষয়টি প্রকাশক না লেখকের অবহেলা—এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘এটি উভয়েরই দায়িত্ব। যেকোনও যৌথকাজে একটি সাধারণ চুক্তিপত্র থাকা জরুরি।’
দুই-একজন প্রকাশক ছাড়া বই বিক্রি করে বেশির ভাগ প্রকাশখই খরচ তুলে আনতে পারেন না উল্লেখ করে সন্দেশ-এর স্বত্বাধিকারী লুৎফর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বইয়ের পাণ্ডুলিটি প্রকাশকের হাতে তুলে দেওয়ার আগে চুক্তি করাটা বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা। কিন্তু উভয়পক্ষেরই গড়িমসি আছে। কেবল প্রকাশককে দোষ দিলে চলবে না।’
এ প্রসঙ্গে প্রকাশনা সংস্থা সংহতির স্বত্বাধিকারী ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘বেশিরভাগ পাণ্ডুলিপি আসে নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে। তখন নিশ্বাস ফেলার সময় থাকে না। চুক্তির কাজটা আমরা করি সাধারণত বইমেলা শেষে, মার্চের পর। বিক্রি বাবদ লেখকদের পাওনা তখনই পরিশোধ করা হয়।’
লেখক ও ‘পাণ্ডুলিপি’ সম্পাদক রাখাল রাহা বলেন, ‘আমাদের লেখক-প্রকাশক উভয়েই এ বিষয়ে সচেতন কম। আমাদের প্রকাশকদের পেশা আছে, পেশাদারিত্ব কম। আমাদের লেখকেরা যেন বন্ধুর মতো, বড় ভাইয়ের মতো, ছোট ভাইয়ের মতো, অভিভাবকের মতো প্রকাশকের কাছে যান; তাই চুক্তি চাইতে লজ্জা পান। মতান্তর ঘটলে বন্ধুর দায়িত্ব, ভাইয়ের দায়িত্ব, অভিভাবকের দায়িত্ব ভুলে পথে-ঘাটে গালাগালি করতে থাকেন। বিষয়টা যে লেনদেনের, ব্যবসার সেটা শুরুতে লেখক-প্রকাশক সবাই এক রকম উপেক্ষা করে যান।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 96 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ